বিশ্ব অর্থনীতির মোড়বদল, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস

নুসরাত জাহান স্মরনীকা

মতামত

শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ হয়তো একটি যুদ্ধের নাম হিসেবেই ইতিহাসে থাকবে, কিন্তু এর প্রকৃত উত্তরাধিকার হবে আরও গভীর একটি পুরোনো

2026-08-23T06:07:22+00:00
2026-08-23T06:07:22+00:00
 
  রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬,
৮ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
মতামত
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ
বিশ্ব অর্থনীতির মোড়বদল, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস
নুসরাত জাহান স্মরনীকা
প্রকাশ: রোববার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ৬:০৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ হয়তো একটি যুদ্ধের নাম হিসেবেই ইতিহাসে থাকবে, কিন্তু এর প্রকৃত উত্তরাধিকার হবে আরও গভীর একটি পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার ভাঙন এবং নতুন ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্ম। সেই নতুন বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ শুধু সে-ই হবে না যার সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী আছে বরং শক্তিশালী হবে সে দেশ, যে খাদ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির আগামী দিনের লড়াই তাই শুধু বাজার দখলের লড়াই নয় এটি হবে নির্ভরশীলতা থেকে স্বাধীনতার লড়াই।

বিশ্ব অর্থনীতি অনেকটা নদীর মতো। নদীর গতিপথ বাইরে থেকে শান্ত মনে হলেও তার তলদেশে প্রতিনিয়ত স্রোত বদলায়। কখনো একটি বাঁধ, কখনো একটি ঝড়, আবার কখনো দূরের কোনো পাহাড়ি ঢল সেই গতিপথ পাল্টে দেয়। 

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধও তেমনই একটি ভূরাজনৈতিক ঝড়, যার অভিঘাত শুধু ইউক্রেন কিংবা রাশিয়ার সীমান্তে আটকে নেই; এটি বদলে দিয়েছে জ্বালানি, খাদ্য, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সামরিক ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ক্ষমতার কাঠামো। 

২০২২ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের পর বিশ্ব বুঝতে পেরেছে অর্থনীতি আর রাজনীতি থেকে আলাদা কোনো বিষয় নয় বরং অর্থনীতিই এখন পরাশক্তির অন্যতম প্রধান অস্ত্র।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের আগে বিশ্বায়নের মূল ধারণা ছিল পারস্পরিক নির্ভরশীলতা। ইউরোপ রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভর করবে, রাশিয়া ইউরোপীয় বাজারে জ্বালানি বিক্রি করবে, চীন পশ্চিমা বাজারে পণ্য সরবরাহ করবে সব পক্ষই বাণিজ্যের মাধ্যমে লাভবান হবে। কিন্তু যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কখনো কখনো অর্থনৈতিক দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।

রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, রুশ জ্বালানি থেকে ইউরোপের দূরে সরে যাওয়া এবং ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রফতানিতে বাধা সব মিলিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। ইউরোপ রাশিয়ার ওপর জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়েছে, আবার রাশিয়া পশ্চিমা বাজারের পরিবর্তে এশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতি আগের মতো একক বাজারকেন্দ্রিক না থেকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক বলয়ে বিভক্ত হচ্ছে। এই পরিবর্তনকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও ভূঅর্থনীতি এর উত্থান হিসেবে দেখছে। অর্থাৎ এখন জাতীয় নিরাপত্তা, বাণিজ্যনীতি, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাতের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ জ্বালানি ও খাদ্যবাজার। রাশিয়া ও ইউক্রেন মিলে বিশ্বের গম রফতানির প্রায় এক-চতুর্থাংশের জোগান দেয়। কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর ও রফতানি অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত থাকায় ২০২৬ সালেও বৈশ্বিক খাদ্যবাজার নতুন চাপের মুখে পড়ছে। অন্যদিকে রাশিয়ার ওপর ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞা ক্রমেই কঠোর হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিরুদ্ধে ২১তম নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ গ্রহণ করেছে। 

যেখানে জ্বালানি, আর্থিক সেবা, বাণিজ্য ও সামরিক শিল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি বরং রাশিয়া চীন, ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়িয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক রাশিয়ায় জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ার পর ভারত থেকে পেট্রোল আমদানির ঘটনাও সামনে এসেছে। অর্থাৎ যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে থামিয়ে দেয়নি বরং তার পথ পরিবর্তন করেছে।

এসব পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ। প্রথমত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। কোনো দেশ আর শুধু সস্তা পণ্য বা জ্বালানি পাওয়ার কথা ভাবছে না, তারা ভাবছে সংকটের সময় সেই সরবরাহ থাকবে কি না। 

দ্বিতীয়ত ডলার ও পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা বাড়ছে। রাশিয়ার বৈদেশিক সম্পদ জব্দ হওয়া অন্য দেশগুলোকেও ভাবতে বাধ্য করেছে নিজেদের রিজার্ভ ও আন্তর্জাতিক লেনদেন কতটা নিরাপদ। এর ফলে বিকল্প মুদ্রা, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। 

তৃতীয়ত চীনের অবস্থান বদলেছে। চীন সরাসরি রাশিয়ার যুদ্ধে অংশ না নিলেও পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার বাইরে নিজের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ দেখছে। রাশিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। 

চতুর্থত ইউরোপও নিজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ছাতার ওপর নির্ভরশীল ইউরোপ এখন প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা তৈরির দিকে এগোচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করেছে, অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতিকে চাঙা করলেও দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক খাতে ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

যুদ্ধোত্তর বিশ্বে পরাশক্তিগুলোর নতুন অবস্থান নিয়ে একটি নতুন সমীকরণ দেখা যায়। যুদ্ধ শেষ হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে কে জিতল, তার চেয়ে কে কীভাবে নতুন বিশ্বব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে। যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত তার নেতৃত্ব ধরে রাখবে, কিন্তু আগের মতো একচ্ছত্রভাবে নয়। সামরিক শক্তির পাশাপাশি প্রযুক্তি, ডলার, চিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এসবই তার ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে থাকবে। চীন আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক মেরুকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হবে।

রাশিয়া হয়তো আগের অর্থনৈতিক অবস্থানে ফিরতে পারবে না কিন্তু জ্বালানি, সামরিক শক্তি ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাকে উপেক্ষা করাও সম্ভব হবে না। রাশিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে সে কি স্বাধীন শক্তিকেন্দ্র হিসেবে থাকবে, নাকি ক্রমশ চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে? অন্যদিকে ভারত ও অন্যান্য মধ্যম শক্তির গুরুত্ব বাড়বে। কারণ ভবিষ্যতের বিশ্ব সম্ভবত শুধু যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীন এই দুই মেরুর গল্প হবে না। ভারত, তুরস্ক, সৌদি আরব, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশ নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে। তারা কোনো একটি শিবিরে পুরোপুরি না গিয়েtrategic autonomy-এর পথ বেছে নিতে পারে।

 যুদ্ধোত্তর বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হবে নির্ভরশীলতার বদলে বৈচিত্র্য। একটি দেশ বা একটি অঞ্চলের ওপর খাদ্য, জ্বালানি কিংবা প্রযুক্তির অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে পুরোপুরি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেন পুনর্গঠনকে শুধু মানবিক সহায়তা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পুনর্গঠনের অংশ করতে হবে। তৃতীয়ত জাতিসংঘ, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার প্রয়োজন। কারণ বিশ্ব যখন বহুমেরুকেন্দ্রিক হচ্ছে, তখন পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো দিয়ে নতুন বাস্তবতা সামলানো কঠিন।

আপাত দৃষ্টিতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো বিশ্ব আর আগের জায়গায় ফিরবে না। যুদ্ধ শেষ হলেও তার তৈরি অর্থনৈতিক বিভাজন, অবিশ্বাস এবং নতুন জোটগুলো রাতারাতি অদৃশ্য হবে না। বিশ্বায়ন হয়তো শেষ হবে না, কিন্তু তার চরিত্র বদলে যাবে। ‘সবার সঙ্গে বাণিজ্য’ নীতির জায়গায় আসবে ‘বিশ্বাসযোগ্য অংশীদারের সঙ্গে বাণিজ্য’। 

তবে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব মানেই সংঘাতের বিশ্ব হতে হবে এমন নয়। প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি প্রযুক্তি, উৎপাদন, বাণিজ্য ও উদ্ভাবনে সীমাবদ্ধ থাকে, তা হলে তা মানবসভ্যতার জন্য ইতিবাচকও হতে পারে। বিপদ তখনই, যখন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি, খাদ্য কিংবা প্রযুক্তিকে যুদ্ধের অস্ত্র বানানো হবে। 

শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ হয়তো একটি যুদ্ধের নাম হিসেবেই ইতিহাসে থাকবে, কিন্তু এর প্রকৃত উত্তরাধিকার হবে আরও গভীর একটি পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার ভাঙন এবং নতুন ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্ম। সেই নতুন বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ শুধু সে-ই হবে না যার সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী আছে বরং শক্তিশালী হবে সে দেশ, যে খাদ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির আগামী দিনের লড়াই তাই শুধু বাজার দখলের লড়াই নয় এটি হবে নির্ভরশীলতা থেকে স্বাধীনতার লড়াই।

লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   বিশ্ব অর্থনীতি  ক্ষমতা  পুনর্বিন্যাস  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: