দেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ ওষুধ কিনতেই খরচ হয়। সেই ব্যয়ের সিংহভাগ বহন করতে হয় রোগী বা তার স্বজনকে। এই পরিস্থিতিতে ওষুধের মূল্যনীতি নিছক বাজারব্যবস্থার নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে পরিণত হয়।
গত শনিবার ‘ওষুধের দাম : কী যুক্তি? কার যুক্তি? সমাধান কী?’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে বলা হয়, দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬০ শতাংশের বেশি খরচ হয় ওষুধের পেছনে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত অনলাইন আলোচনার তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবায় রোগীর নিজস্ব ব্যয়ের অংশ প্রায় ৮০ শতাংশ। ওষুধের দাম বাড়লে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের চিকিৎসা নেওয়ার সক্ষমতা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চলতি মাসে মন্ত্রিসভায় ২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে। সরকারের যুক্তি, নতুন তালিকা প্রণয়নে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। এ নিয়ে আদালতে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। যে কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১৯৯৪ সালের আদেশে প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং সেসব ওষুধের সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা আগের মতো বহাল করা হয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৯৪ সালের নীতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। তাদের যুক্তি, কোনো নীতির প্রক্রিয়াগত ত্রুটি থাকলে তার সমাধান সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, পুনর্বিবেচনা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে করা যায়। সেটা না করে তিন দশকের বেশি পুরোনো একটি নীতিতে ফিরে যাওয়া কতটা বাস্তবসম্মত সেই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ ১৯৯৪ সালের তালিকায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ছিল ১১৭টি। ২০২৫ সালে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ২৯৫টিতে উন্নীত হয়েছে।
অবশ্য ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও একতরফা সিদ্ধান্ত কাম্য নয়। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে নির্ধারিত ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম প্রায় তিন দশক নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়নি। এর ফলে একদিকে উৎপাদক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, অন্যদিকে বাজারে কিছু ওষুধের সরবরাহও সংকুচিত হয়েছে। কোনো কোনো কোম্পানি সেসব ওষুধ উৎপাদন বন্ধ করেছে বলে শিল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগীর ক্রয়ক্ষমতা ও উৎপাদকের ন্যায্য ব্যয় বিবেচনায় রেখে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করা দরকার। এ জন্য উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামাল আমদানি, বিনিময় হার, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের মার্জিনসহ পুরো সরবরাহব্যবস্থার তথ্য পর্যালোচনার একটি স্বচ্ছ কাঠামো প্রয়োজন। দক্ষ ও স্বাধীন একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামোর হাতে মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। নিয়ন্ত্রক কাঠামো যেন রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে কাজ করতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাকে স্থির কোনো তালিকা হিসেবে গণ্য করা চলে না। চিকিৎসাবিজ্ঞান, রোগের ধরন, নতুন ওষুধের আবির্ভাব এবং উৎপাদন প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তার মডেল তালিকা নিয়মিত পর্যালোচনা করে।
ওষুধশিল্প দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। ১৯৮২ সালের ওষুধনীতির পর এ শিল্পের উৎপাদন ও রফতানি বেড়েছে। এই শিল্পের বিকাশ যাতে ব্যাহত না হয় সে বিষয়েও সজাগ থাকতে হবে। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থও রক্ষা করতে হবে। মূল্য নির্ধারণে সরকার, ওষুধশিল্প, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, আইনজ্ঞ এবং ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে একটি অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ওষুধের দামের প্রশ্নে পদক্ষেপ নিতে হবে ভেবেচিন্তে। মানসম্মত ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দাম যেন রোগীর নাগালের মধ্যে থাকে সেই চেষ্টা থাকতে হবে। উৎপাদককে ন্যায্য মুনাফা করার সুযোগ দিতে হবে। ওষুধ আর দশটা সাধারণ ভোগ্যপণ্যের মতো নয়। মানুষের জীবন ও সুস্থতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই পণ্যের বাজারে রাষ্ট্রের ভূমিকা হতে হবে দায়িত্বশীল।
সময়ের আলো/এসএকে