ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমদানি-রফতানি একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। সেই প্রেক্ষাপটে সরকার আমদানি নীতি ঘোষণা করেছে। এই নীতিতে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা, নীতিগত স্বচ্ছতা বাড়ানো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা নেওয়া এবং শিল্প ও রফতানি খাতকে সহায়তা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আমদানিকারকরা কোনো মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতে পারবেন। আগে এলসি ছাড়া এভাবে আমদানির ক্ষেত্রে বছরে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ মার্কিন ডলারের সীমা ছিল।
আমদানি প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা থাকবে না সেটাই কাম্য। ব্যবসায়ীদের জন্য নিয়মকানুন সহজ হলে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের পরিকল্পনা করাও সহজ হবে। নতুন নীতিতে পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, আমদানির শর্ত, প্রয়োজনীয় সনদপত্র এবং পণ্যের উৎপত্তি দেশ নির্ধারণের বিষয়গুলো আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এইচএস কোড ও পণ্যের বর্ণনার মধ্যে অসামঞ্জস্যজনিত জটিলতা কমানোর কথাও বলা হয়েছে। ফলে আমদানিকারকদের হয়রানি ও বিলম্ব কমার পাশাপাশি ব্যবসার সময় ও খরচ কমতে পারে।
শিল্প ও রফতানি খাতের জন্যও নীতিটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক রয়েছে। রফতানি বহুমুখীকরণ ও উচ্চমূল্য সংযোজনসম্পন্ন পণ্যের রফতানি বাড়াতে রফতানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিনামূল্যে বা এফওসি ভিত্তিতে কাঁচামাল আমদানির সুবিধাও সম্প্রসারিত হয়েছে। মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ও সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এসব সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়াও সময়োপযোগী। এফটিএ, সিইপিএ, ইপিএসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির আওতায় শুল্ক সুবিধা ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। এ জন্য পণ্যের ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ বা উৎপত্তি দেশসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের বিষয়টি নতুন নীতিতে গুরুত্ব পেয়েছে। টেকনিক্যাল ব্যারিয়ার্স টু ট্রেড, কোডেক্স অ্যালিমেন্টেরিয়াস এবং বিএসটিআইর মানদণ্ড অনুসরণের বিধান থাকায় মানসম্পন্ন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে আমদানি সহজ করার সঙ্গে সঙ্গে এর সম্ভাব্য ঝুঁকির দিকটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এলসি ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির ক্ষেত্রে পাঁচ লাখ ডলারের সীমা তুলে দেওয়া ব্যবসার জন্য সুবিধাজনক হলেও এর অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, তা নজরে রাখা জরুরি। আমদানি বাড়লে শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় পণ্য আসবে। এটি ইতিবাচক। তবে অপ্রয়োজনীয় বা বিলাসপণ্যের আমদানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। আমদানির আড়ালে পণ্যের মূল্য অতিরঞ্জিত বা কম দেখানো, বাণিজ্যিক লেনদেনে অনিয়ম কিংবা অর্থপাচারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নতুন নীতিতে ২৮ শ্রেণির পণ্য আমদানিনিষিদ্ধ এবং কিছু পণ্য নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আমদানি উদারীকরণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও দেশীয় স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করা হয়েছে।
নতুন আমদানি নীতিতে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা যায়। তবে আমদানি নীতির অপব্যবহার যেন না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বৈধ ব্যবসা ও উৎপাদনকে সর্বোচ্চ সহায়তা দিতে হবে। আমদানি সহজ হোক, তবে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ যেন দুর্বল না হয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা