বর্তমান সমাজে শিশুরা যে বৈচিত্র্যময় ও বিপজ্জনক সামাজিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে, সেখানে কেবল চিরাচরিত পুঁথিগত বিদ্যা তাদের সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়। ঘর থেকে বের হয়ে স্কুলে যাওয়া কিংবা খেলার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার প্রতিটি পদে পদে শৈশব আজ নানাবিধ নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অথচ সভ্য সমাজের প্রকৃত পরিচয় তার নারী, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের নিরাপত্তার মধ্যেই নিহিত। তাই শারীরিক নিপীড়ন, বুলিং এবং আচমকা ঘটে যাওয়া সহিংসতার হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করতে প্রয়োজন শৈশব থেকেই শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে মার্শাল আর্টকে বাধ্যতামূলক সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি কেবল একটি সময়োপযোগী প্রস্তাব নয় বরং এক স্বনির্ভর ও আত্মবিশ্বাসী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার মৌলিক শর্ত। আত্মরক্ষার পাঠ শুধু বিপদের মুহূর্তে নিজেকে রক্ষা করার কৌশল নয় বরং এটি আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা, মানসিক দৃঢ়তা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং আত্মসম্মানবোধ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনদক্ষতা।
প্রাথমিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো একটি শিশুর শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সুষম বিকাশ নিশ্চিত করা। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় বইয়ের ভারী বোঝা ও শ্রেণিকক্ষকেন্দ্রিক পড়ার চাপে শিশুদের শারীরিক সক্রিয়তা বা কায়িক ব্যায়াম অনেকাংশেই অবহেলিত। শৈশবে খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়ায় স্থূলতা, শারীরিক দুর্বলতা এবং মানসিক অবসাদের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। প্রাথমিক স্তরেই ক্যারাতে, তায়কোয়ানদো বা জুডোর মতো শারীরিক আত্মরক্ষা কৌশল পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হলে শিশুরা নিয়মিত অনুশাসন এবং কায়িক চর্চার মধ্যে আসার সুযোগ পাবে।
দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্রীড়া ও শারীরিক শিক্ষা এবং শিক্ষকদের কার্যকারিতা তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতায় পরিপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার পাঠ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বাধ্যতামূলকভাবে চালু করা হলে ক্রীড়া শিক্ষায় যে স্থবিরতা সেটা কাটিয়ে ওঠা যাবে। মার্শাল আর্ট কেবল কিছু এলোপাতাড়ি মারামারির কৌশল নয়, এটি গভীর শৃঙ্খলা ও মনোযোগের বিজ্ঞান। একটি শিশু যখন মার্শাল আর্টের মাধ্যমে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে তখন তার মনের ওপর এক ধরনের গভীর প্রশান্তি ও একাগ্রতা তৈরি হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই প্রশিক্ষণ চালু হলে শিশুদের মধ্যে ইভটিজিং, বুলিং বা অন্যকে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করার প্রবণতা বহুলাংশে কমে আসবে। কারণ একজন মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষিত শিশু শেখে কীভাবে নিজের শক্তিকে কেবল আত্মরক্ষায় ব্যবহার করতে হয়, অন্যায্য আভিজাত্য বা সহিংসতা প্রকাশের জন্য নয়।
বর্তমানে দেশের বহু কিন্ডারগার্টেন বা বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত ক্যারাতে ও অন্যান্য মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই আত্মরক্ষার মৌলিক কৌশল, শারীরিক সক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে একটি শিশুর নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার অধিকার কখনো সীমাবদ্ধ হতে পারে না। যে শিক্ষাজীবন রক্ষা করতে পারে তা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য সমানভাবে পাওয়া উচিত। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্শাল আর্ট বা আত্মরক্ষার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি আজ আর বিলাসিতা নয় বরং সময়ের দাবি।
বিশেষ করে দেশের কন্যাসন্তানদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে এটি এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। প্রাথমিক স্তরে যখন ছেলে ও মেয়েশিশু উভয়কেই সমানভাবে আত্মরক্ষার কৌশল শেখানো হবে তখন বাল্যকাল থেকেই মেয়েদের মনস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যাবে। তারা নিজেদের অসহায় বা দুর্বল মনে করার কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসবে। সমাজে অপরাধীরা সাধারণত অসহায় ও দুর্বলদের লক্ষ্যবস্তু বানায়; কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আত্মরক্ষার মৌলিক কৌশল শিখে আসা একটি শিশু যেকোনো প্রতিকূল বা আচমকা হামলায় নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ন্যূনতম প্রাথমিক কৌশল ধারণ করতে সক্ষম হবে। এটি নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা হতে পারে।
শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি বৈজ্ঞানিক পাঠক্রম তৈরি করা সম্ভব। সপ্তাহে এক বা দুই দিন নিয়মিত ক্যারাতে ক্লাস, প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষক নিয়োগ, শারীরিক শিক্ষার সঙ্গে আত্মরক্ষার পাঠ সংযুক্ত করা এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর দক্ষতার মূল্যায়ন— এই কয়েকটি পদক্ষেপের মাধ্যমেই একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। ক্যারাতে শেখার সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো আত্মবিশ্বাসের বিকাশ। একজন শিক্ষার্থী যখন জানে যে, প্রয়োজনে সে নিজেকে রক্ষা করার মৌলিক দক্ষতা অর্জন করেছে তখন তার মধ্যে অকারণ ভয় কমে যায়। সে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে শেখে।
গবেষণায়ও দেখা গেছে, নিয়মিত মার্শাল আর্ট অনুশীলন মনোযোগ বৃদ্ধি, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলাবোধ এবং ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। ফলে এর সুফল কেবল নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না— শিক্ষাজীবন ও ব্যক্তিজীবনেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। মার্শাল আর্টের শিক্ষায় অন্যতম গুরুত্ব পায় আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানসিক স্থিরতা। বিপদের মুখে আতঙ্কিত না হয়ে মাথা ঠান্ডা রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চর্চা শৈশব থেকে গড়ে উঠলে শিশুরা যেকোনো জীবনঘনিষ্ঠ সংকটে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। দুর্যোগ মোকাবিলা, ছিনতাই কিংবা কোনো অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনায় শিশুরা শারীরিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে এবং আশপাশের মানুষকে রক্ষা করতে পারবে। এটি শিশুদের মধ্যে সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের বীজ বুনে দেয়। তাই এটিকে একটি প্রতিরোধমূলক ও জীবনদক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা হিসেবে দেখা উচিত।
বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থায় মার্শাল আর্টস বা ক্যারাতে বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে জাপান হলো সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০১২ সালে জাপানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ‘জুডো’ বা ঐতিহ্যবাহী মার্শাল আর্টস শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমের একটি বাধ্যতামূলক অংশ হিসেবে যুক্ত করেছে। এর অধীনে জুডো ও কেন্ডোর পাশাপাশি ক্যারাতে শেখার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জাপানের ওকিনাওয়া প্রদেশ, যেখান থেকে ক্যারাতের উৎস, সেখানে ১৯০৫ সাল থেকেই স্কুলগুলোতে ক্যারাতে শিক্ষার এক সুদীর্ঘ ও ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস রয়েছে।
জাপানের স্কুলগুলোতে ক্যারাতে বাধ্যতামূলক করার মূল উদ্দেশ্য শুধু শারীরিক শক্তি বাড়ানো নয় এর পেছনে গভীর শিক্ষামূলক দর্শন রয়েছে। শারীরিক সুস্থতার দিক থেকে এটি শিক্ষার্থীদের স্ট্যামিনা, ফ্লেক্সিবিলিটি এবং রিফ্লেক্স উন্নত করে। পাশাপাশি ক্যারাতে সব সময় সম্মান বা শিষ্টাচার প্রদর্শন দিয়ে শুরু এবং শেষ হয়। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, বিনয় এবং কঠোর নিয়মানুবর্তিতা তৈরি করে, যা তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে। জাতীয় পর্যায়ে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব নয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের বিদ্যালয়গুলোতে ধাপে ধাপে দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিতে পারে। প্রতি উপজেলায় শারীরিক শিক্ষা শিক্ষকদের জন্য বিশেষ মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আয়োজন করা যেতে পারে যারা পরবর্তীতে স্থানীয় স্কুলে গিয়ে শিশুদের নিয়মিত অনুশীলন করাবেন। এর জন্য বড় কোনো ব্যয়বহুল অবকাঠামোরও প্রয়োজন নেই; স্কুলের খোলা মাঠ বা পিটি অনুশীলনের জায়গাতেই এর প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা সম্ভব। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দুই বা এক দিন শারীরিক শিক্ষা ঘণ্টার সঙ্গে এই কৌশল যুক্ত করা যেতে পারে। পড়াশোনা বা পারিপার্শ্বিক কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, ক্যারাতে তার একটি চমৎকার উপশম হিসেবে কাজ করে। অনুশীলনের সময় শারীরিক পরিশ্রমের ফলে শরীরে এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসৃত হয় যা প্রাকৃতিকভাবে উদ্বেগ কমায়।
একটি মেধাভিত্তিক, সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী জাতি গঠনের জন্য কেবল তথ্য মুখস্থকরণের ওপর জোর না দিয়ে শিশুর স্বাবলম্বী হওয়ার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। শৈশব থেকেই নিজেদের সুরক্ষা নিজেরা দিতে পারে এই মানসিকতা শিশুদের ভেতর গেঁথে দিতে পারলে তারা আত্মমর্যাদা নিয়ে বড় হতে পারবে। ‘প্রাথমিকেই আত্মরক্ষা পাঠ, গড়ে উঠুক আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম’এই ধারণাকে জাতীয় শিক্ষানীতিতে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের এখনই সঠিক সময়। সবশেষে প্রত্যাশা রইল নিরাপদ ও সবল শৈশবের ওপর দাঁড়িয়েই একটি সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
শিক্ষক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা