সরকারি হাসপাতাল : কিছু দেখা কিছু কথা

শায়রুল কবির খান

মতামত

আমার একমাত্র ছোট বোন গত ১৫ আগস্ট নেত্রকোনায় ব্রেন স্ট্রোক করে। তাকে দ্রুত জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে

2026-08-26T05:36:51+00:00
2026-08-26T05:36:51+00:00
 
  বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬,
১১ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
মতামত
সরকারি হাসপাতাল : কিছু দেখা কিছু কথা
শায়রুল কবির খান
প্রকাশ: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আমার একমাত্র ছোট বোন গত ১৫ আগস্ট নেত্রকোনায় ব্রেন স্ট্রোক করে। তাকে দ্রুত জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে পাঠানো হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। রাতে সেখানকার নিউরোসায়েন্স বিভাগে ভর্তি করা হয়। আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয় পরদিন সকালে। আইসিইউতে নেওয়ার মিনিটকয়েক পর তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। ১৯ আগস্ট, ২০২৬ বেলা ১১টায় আমাদের ছেড়ে সে চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছে। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না লিল্লাইহি রাজিউন)।

আমার একমাত্র বোনের অসুস্থতার সেই কদিন তার পাশে থেকে আমি হাসপাতালের কিছু চিত্র নিজের চোখে দেখেছি। সে সময় দেশের সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আমার কিছু উপলব্ধি হয়েছে। 

দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর অন্যতম প্রধান সমস্যা অতিরিক্ত রোগীর চাপ ও স্থান সংকট। হাসপাতালের ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি রোগী সেবা নিতে আসেন। অনন্যোপায় রোগীদের অনেককে মেঝে বা বারান্দায় গাদাগাদি করে থাকতে হয়। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ওষুধ ও সরঞ্জামের সংকট। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়ার সুযোগ সীমিত। রোগীদের বেশিরভাগ দামি ওষুধ কিনতে হয় বাইরে থেকে।

তৃতীয় সমস্যা হচ্ছে, হাসপাতালের চিকিৎসাসামগ্রীর অকার্যকারিতা। অনেক মূল্যবান ও জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি টেকনিশিয়ানের অভাব বা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মাসের পর মাস নিষ্ক্রিয় থাকে। চতুর্থত দালাল ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সিটের জন্য রোগীদের হাপিত্যেশ করতে হয়। এই সুযোগটি নেয় দালাল চক্র। সুযোগ বুঝে দালাল চক্র রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠায়।

পঞ্চমত পরিচ্ছন্নতা ও জনবলের ঘাটতি রয়েছে হাসপাতালে। ওয়ার্ড ও শৌচাগারগুলোর পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর। চিকিৎসক, নার্স ও ওয়ার্ডবয়দের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ সেবা ব্যাহত করছে। সবশেষে, রোগী ভর্তি ও পরবর্তী সময়ে তাদের দেখতে আসা নিয়ে বিড়ম্বনা তৈরি হয়। রোগী ভর্তির সময় জরুরি বিভাগে দর্শনার্থীর চাপ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে রোগীর স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে আসা দর্শনার্থীর সঙ্গে শিশু, কিশোর ও বয়স্কদের আসা-যাওয়ায় চিকিৎসক ও চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত সবাই অনেক বিড়ম্বনার মধ্যে পড়েন।

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলো মূলত দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার প্রধান নির্ভরতার কেন্দ্র। সীমিত আর্থিক সামর্থ্যরে মানুষদের জন্য এসব হাসপাতালই একমাত্র ভরসা। অথচ সরকারি হাসপাতালের সেবা নিয়ে দুর্ভোগের অন্ত নেই। প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী আসেন সরকারি হাসপাতালের আঙিনায়। 

সেবাপ্রত্যাশীদের দীর্ঘ লাইন, সীমিত শয্যা, চিকিৎসকের স্বল্পতা, নার্সদের অতিরিক্ত কাজের চাপ- সব মিলিয়ে এক অলঙ্ঘ্য বিশৃঙ্খলা যেন প্রতিনিয়ত সেখানে কাজ করে। অনেক সময় রোগীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা পায় না, জরুরি সেবা পেতে বিলম্ব ঘটে। আর চিকিৎসা প্রাপ্তিতে এই বিলম্বই রোগীর কাল হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসার বিলম্বে অনেক রোগীর প্রাণ সংশয় হয়, ভোগান্তি বাড়ে। এমনকি সেটা রোগীর মৃত্যুরও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ যেন এক দুর্ভেদ্য অন্ধকার। কেবল ‘হাতের টাকাই’ এখানে সবকিছুকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। বিশেষ কারও ফোন ছাড়া সাধারণ একজন রোগীর জন্য নূন্যতম স্বাস্থ্যসেবা পাওয়াও অনেক ক্ষেত্রে কঠিন। কিন্তু কেন? এর উত্তরে বিস্তর আলাপ আসতে পারে।
 
সাদা চোখে যা দেখি সেটা হচ্ছে- হাসপাতালের কাঠামোর সঙ্গে বাস্তবতা ও উন্নয়নের পরিসংখ্যান এক অদ্ভুত বৈপরীত্য হয়ে আছে। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের সময় দেশে সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংখ্যা বেড়েছে। তার সময় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবি প্রতিষ্ঠিত হয়। আমার স্পষ্ট মনে আছে, স্কুল যাওয়ার আগে সকালে থানা সদর হাসপাতালে টিকেট কেটে দাদুর জন্য ওষুধ নিয়েছি।

পরবর্তী সময়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর উন্নয়ন হয়। তার সময় দেশে প্রথম বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল অনুমোদন দেওয়া হয়। আজ উচ্চবিত্তের জন্য বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পড়াশোনা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার তাদের ১৫-১৬ বছরে চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়নের চেয়ে ভবন তৈরিতেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল লাগামহীন লুটপাট।

এমনিতেই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট রয়েছে। তা ছাড়া তাদের কাজ করতে হয় নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের মধ্যে। হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজনীয় অনেক সুযোগ-সুবিধারই অভাব রয়েছে। কর্মপরিবেশের চাপ এবং কখনো কখনো নিরাপত্তাহীনতা তাদের কাজের মান ও মনোবলকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। সব মিলিয়ে জটিল এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে যেমন সেবাপ্রার্থী, তেমন সেবাদাতাও অসহায় হয়ে পড়েন।

এই বাস্তবতার সম্মুখীন হয়ে প্রশ্ন জাগে- আমরা কি সত্যিই উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি, নাকি উন্নয়নের বাহ্যিক রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর অব্যবস্থা? সরকারি হাসপাতালের সেবা কি সত্যিই মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারছে, নাকি দিন দিন সেই আস্থা ক্ষয়ে যাচ্ছে?

এর থেকে উত্তরণের জন্য প্রথম ও প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে রোগী ভর্তির সময় ও পরবর্তী সময়ে দর্শনার্থী সীমিত করা এবং একটা শৃঙ্খলায় নিয়ে আসা। অতি সহজেই কাজটা করা সম্ভব। চিকিৎসাসেবা নেওয়ার প্রয়োজন ছাড়া হাসপাতালে শিশু, কিশোর ও সত্তরোর্ধ্ব কেউ দর্শনার্থী হতে পারবে না।

সে জন্য দরকার পেশাগত প্রতিশ্রুতি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি মমত্ববোধ। প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের জায়গা থেকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও সততা থাকলেই সেটা সম্ভব হবে।

সরকারি হাসপাতালের সেবার বাস্তব চিত্র দেখলে প্রথমেই চোখে পড়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের এক দৃশ্য। দেশে বহু নতুন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালের সংখ্যা ও শয্যা বেড়েছে। হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে। তবে এসব অপরিকল্পিত উন্নয়ন ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবার সুযোগ আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত হলেও পরিকল্পিত কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। অনেক হাসপাতালেই আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নেই। কখনো যন্ত্র নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে মাসের পর মাস। আবার কখনো অপারেটর না থাকায় সেগুলো ব্যবহারই করা যায় না। ফলে উন্নয়নের এই আয়োজন অনেক ক্ষেত্রে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে।


স্বাস্থ্য খাতে ‘ন্যাশনাল ই-হেলথ প্ল্যাটফর্ম’, রোগীর স্বাস্থ্যতথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ, চিকিৎসকদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজলভ্য করা এবং চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে প্রশ্নটি প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এটি এখন কি আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত?

এই মুহূর্তে দেশের স্বাস্থ্য খাতে একটি বিশাল জাতীয় ডিজিটাল মেডিকেল রেকর্ড ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেয়ে মানুষের মৌলিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই অনেক বেশি জরুরি। ২০ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য-তথ্যকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা কোনো সাধারণ আইটি প্রকল্প নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিপুল পরিমাণ ডেটা সংগ্রহ, যাচাই, সংরক্ষণ, ব্যাকআপ, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা সেন্টার, নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ, ইন্টারঅপারেবিলিটি, প্রশিক্ষিত জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়। 

শুধু একটি সফটওয়্যার তৈরি করলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দেশের প্রত্যন্ত উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ, কম্পিউটিং সুবিধা এবং প্রশিক্ষিত জনবলের আওতায় আনা। ডেটার অভাব আজ আর বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বড় কোনো সমস্যা নয়। বরং সেবা দেওয়ার সক্ষমতার অভাবই বড় সমস্যা।

আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত : প্রথমে মানুষ, তারপর অবকাঠামো, তারপর সেবা এবং তারও পরে ডিজিটাল প্রযুক্তি। ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটি ভালো ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে, কিন্তু ভুল সময়ে, ভুল পরিসরে এবং বাস্তব স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক ঘাটতি উপেক্ষা করে এটি বাস্তবায়ন করলে তা জনগণের জন্য কাক্সিক্ষত সমাধানের পরিবর্তে আরেকটি ব্যয়বহুল সরকারি আইটি প্রকল্পে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই, এখন বাস্তবতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
শুধু কাঠামো উন্নয়ন আর উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নাগরিকদের প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারবে না। সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় দেশের মানুষের মুখে নিশ্চিন্তের হাসি ফিরিয়ে আনা দরকার। এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার যেখানে সেবাপ্রত্যাশী মানুষের জন্য থাকবে ভরসা, নিরাপত্তা আর জীবন বাঁচানোর এক দৃঢ় প্রতিশ্রুতি।

সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি


  বিষয়:   সরকারি হাসপাতাল  শায়রুল কবির খান  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: