বেকারত্ব এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। কর্মহীনতা কেবল মানুষের জীবনযাত্রাকেই ব্যাহত করছে না, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তাকেও বিঘ্নিত করছে। গত কয়েক বছরে অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়েছে। শিল্পোৎপাদন কমেছে। বিনিয়োগে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই পরিস্থিতি সমাজে অভাব বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধপ্রবণতার ক্ষেত্রও তৈরি করছে।
কর্মসংস্থান পরিস্থিতির অবনতির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। সময়ের আলোয় প্রকাশিত ‘বাড়ছে বেকার বাড়ছে অপরাধ’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে এক বছরের মধ্যে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন শিল্পাঞ্চলে আরও ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর ফলে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র গ্যাসসংকট। যার প্রভাবে বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোনো কোনো কারখানা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এমন বাস্তবতায় শিল্প টিকিয়ে রাখা এবং নতুন বিনিয়োগ আনা অত্যন্ত জরুরি। কারণ নতুন বিনিয়োগ ছাড়া নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, আর বিদ্যমান শিল্প বন্ধ হলে বেকারত্ব আরও বাড়বে।
দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকলে কোনো কোনো মানুষের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বেকারত্বের কারণে সমাজে কিছু অপরাধ সংঘটিত হয়। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত আড়াই বছরে ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, অপহরণ ও চুরির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে এটা ভাবাও সংগত নয় যে, কেবল বেকারত্বের কারণেই অপরাধ বাড়ছে। অপরাধ বাড়ার আরও অনেক কারণই রয়েছে। মাদকাসক্তির কারণেও অনেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। তবে বেকারত্বের প্রকৃত চিত্র নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে মাত্র ১ ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করার সুযোগ পেলেও একজনকে বেকার হিসেবে গণ্য করা হয় না। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় সপ্তাহে ১ ঘণ্টা কাজ করে জীবনধারণ সম্ভব কি না। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, শুধু প্রচলিত বেকারত্বের হার দিয়ে কর্মহীনতার প্রকৃত সংকট বোঝা কঠিন।
শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব আরেকটি সংকট। দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়াস যুব বেকারদের প্রায় ২৯ শতাংশ স্নাতক। অর্থাৎ দেশের বড় একটি অংশের তরুণ শিক্ষা শেষ করেও শ্রমবাজারে নিজেদের উপযুক্ত কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না।
বেকারত্বের অন্যতম প্রধান কারণ বিনিয়োগের স্থবিরতা। অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা, শ্রমিক অসন্তোষ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের ঘাটতি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমাচ্ছে এবং ঋণসুবিধা সংকুচিত করছে। দেশের শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের যে দক্ষতা প্রয়োজন, শিক্ষাব্যবস্থা সবসময় সে দক্ষতা তৈরি করতে পারছে না। কম্পিউটার ও তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারিক দক্ষতার ঘাটতি, ভাষাগত দুর্বলতা এবং প্রয়োজনীয় কর্মদক্ষতার অভাব অনেক কর্মপ্রত্যাশীকে শ্রমবাজারের বাইরে রাখছে।
বেকারত্ব কমাতে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প পুনরুজ্জীবিত করা দরকার। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের টেকসই সমাধান করতে হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যেন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে বিনিয়োগ করতে পারেন সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ, বাজার সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা বাড়ানো দরকার। দীর্ঘমেয়াদে শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় একটি সমন্বিত জনশক্তি পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি