খাদ্যই হতে পারে সর্বোত্তম ওষুধ

ড. শহীদুল ইসলাম

মতামত

মানবসভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশের অনেক আগেই মানুষ বুঝতে শুরু করেছিল যে সুস্থ থাকার সঙ্গে খাদ্যের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গত

2026-08-29T16:11:28+00:00
2026-08-29T16:11:28+00:00
 
  শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬,
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
মতামত
খাদ্যই হতে পারে সর্বোত্তম ওষুধ
ড. শহীদুল ইসলাম
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৪:১১ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানবসভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশের অনেক আগেই মানুষ বুঝতে শুরু করেছিল যে সুস্থ থাকার সঙ্গে খাদ্যের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে এক নতুন ধরনের স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে। সংক্রামক রোগের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বেশি মানুষ ভুগছেন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, স্থূলতা, ফ্যাটি লিভার, কিডনি রোগ এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে। এসব রোগের একটি বড় অংশের সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে সৃষ্ট অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। শুধু ওষুধ দিয়ে এসব রোগ দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কারণ একজন মানুষ যদি প্রতিদিন অতিরিক্ত চিনি, লবণ, ট্রান্স ফ্যাট এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যগ্রহণ করেন তা হলে ওষুধ সাময়িকভাবে উপকার দিলেও রোগের মূল কারণ থেকে যায়। এই বাস্তবতা থেকেই ‘ফুড ইজ মেডিসিন’ ধারণার জন্ম হয়েছে।

অনেকেই মনে করেন এটি একটি নতুন ধারণা। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। তবে অতীতে খাদ্য এবং চিকিৎসা ছিল দুটি আলাদা ক্ষেত্র। একজন চিকিৎসক ওষুধ লিখে দিতেন, আর একজন পুষ্টিবিদ খাদ্যতালিকা তৈরি করতেন। বর্তমানে এই বিভাজন ধীরে ধীরে কমছে। এখন চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে শুধু ওষুধ নয়, নির্দিষ্ট খাদ্য পরিকল্পনাও যুক্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশেষ ধরনের খাবার, শাকসবজি, ফল, সম্পূর্ণ শস্য, মাছ কিংবা চিকিৎসাগতভাবে পরিকল্পিত খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। অর্থাৎ খাদ্য আর শুধু পেট ভরানোর উপায় নয়, এটি চিকিৎসার একটি কার্যকর উপাদান।

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, কিডনি রোগ, ফ্যাটি লিভার এবং হৃদরোগের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে এখনও শিশুর অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা এবং মাতৃপুষ্টির সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। অর্থাৎ বাংলাদেশ একদিকে অপুষ্টি, অন্যদিকে অতিপুষ্টিজনিত রোগ- এই দুই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই পরিস্থিতিতে শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। খাদ্যকে অবশ্যই চিকিৎসার মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশে ‘ফুড ইজ মেডিসিন’ ধারণা বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়। বর্তমানে অনেক হাসপাতালেই ডায়েটিশিয়ান রয়েছেন, কিন্তু তাদের সম্পৃক্ততা আরও বাড়ানো দরকার। ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, হৃদরোগ, ক্যানসার কিংবা গর্ভাবস্থার রোগীদের জন্য ওষুধের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক খাদ্য পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে পুষ্টি পরামর্শ সেবা আরও শক্তিশালী করা গেলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীও এর সুফল পাবে।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের সামনেও একটি বিশাল সুযোগ রয়েছে। দেশের কৃষিজ পণ্য ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিকভাবে উন্নত ফাংশনাল ফুড, উচ্চ-প্রোটিন খাদ্য, ডায়াবেটিসবান্ধব খাদ্য, প্রবীণদের জন্য বিশেষ খাদ্য, চিকিৎসাগত উদ্দেশ্যে তৈরি পুষ্টিকর খাদ্য এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুষ্টি পণ্য তৈরি করা সম্ভব। মসুর ডাল, ছোলা, মুগ ডাল, সয়াবিন, মাছ, দুধ, দই, কাঁঠাল, কলা, পেয়ারা, আম, হলুদ, আদা এবং বিভিন্ন দেশীয় ফল ও শাকসবজির ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যকর খাদ্য তৈরি করা গেলে শুধু দেশের মানুষের স্বাস্থ্যই উন্নত হবে না, রফতানিরও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যবিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং কৃষিবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের যৌথ গবেষণা বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং খাদ্যশিল্প একসঙ্গে কাজ করলে দেশীয় কাঁচামালের কার্যকারিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে নতুন শিল্প গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে সরকারের নীতিগত সহায়তা, কর সুবিধা, গবেষণা অনুদান এবং জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি এই আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।


আগামী দিনের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু রোগ নিরাময়ের ওপর নির্ভর করবে না, বরং রোগ প্রতিরোধের ওপর বেশি গুরুত্ব দেবে। সে কারণে ‘ফুড ইজ মেডিসিন’ কোনো সাময়িক প্রচার নয়, বরং এটি বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুষ্টি, জিনভিত্তিক খাদ্য পরিকল্পনা, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম গবেষণা এবং ফাংশনাল ফুড প্রযুক্তির সঙ্গে এই ধারণা আরও শক্তিশালী হবে। ভবিষ্যতে হয়তো চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে ওষুধের পাশাপাশি নির্দিষ্ট খাদ্য, নির্দিষ্ট পুষ্টি পরিকল্পনা এবং জীবনযাত্রার নির্দেশনাও সমান গুরুত্ব পাবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। দেশটি খাদ্য উৎপাদনে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এখন সময় এসেছে শুধু মানুষের পেট ভরানোর খাদ্য নয়, মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখার খাদ্য উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। যদি চিকিৎসাব্যবস্থা, কৃষি, খাদ্যশিল্প, বিশ্ববিদ্যালয় এবং নীতিনির্ধারকরা সমন্বিতভাবে কাজ করেন, তা হলে ‘ফুড ইজ মেডিসিন’ ধারণা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। কারণ ভবিষ্যতের সবচেয়ে সফল স্বাস্থ্যনীতি হবে সেই নীতি, যেখানে হাসপাতালের শয্যা কমবে, মানুষের সুস্থ জীবন বাড়বে, আর চিকিৎসার প্রথম ধাপ শুরু হবে প্রতিদিনের খাবারের প্লেট থেকেই।

খাদ্যবিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য
মতামত লেখকের নিজস্ব 

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   খাদ্য  সর্বোত্তম  ওষুধ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: