নদীর সবচেয়ে বড় ক্ষতি অপরিকল্পিত বাঁধ

ড. কামরুজ্জামান

মতামত

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীগুলো কঠিন সময় পার করছে। নদী ও জীবন বাংলাদেশে একে অপরের পরিপূরক। নদীকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে চিন্তা করা

2026-08-29T16:07:14+00:00
2026-08-29T16:07:14+00:00
 
  শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬,
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
মতামত
নদীর সবচেয়ে বড় ক্ষতি অপরিকল্পিত বাঁধ
ড. কামরুজ্জামান
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৪:০৭ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীগুলো কঠিন সময় পার করছে। নদী ও জীবন বাংলাদেশে একে অপরের পরিপূরক। নদীকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে চিন্তা করা যায় না। নদীর জলে বিধৌত হয়ে যে ভূমির জন্ম তারই নাম বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ দেশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা ও কুশিয়ারা প্রভৃতি নদ-নদী হিমালয়ের পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক দিয়ে বাংলাদেশকে ভাটির দেশও বলা হয়।

নদী চলার পথে তিন ধরনের কাজ করে। নদী ভূমি ক্ষয় করে, ক্ষয়ের ফলে সৃষ্ট পলি-বালু-কাদা বহন করে এবং নদীতে সঞ্চয় করে। এই তিন প্রকার কাজের মাধ্যমে নদী নতুন ভূমি তৈরি করে। হিমালয় পর্বত থেকে সৃষ্ট নদীগুলোর প্রবাহিত পলি-বালু-কাদা সঞ্চিত হয়েই মূলত বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের সৃষ্টি। ভূতাত্ত্বিক গঠন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আজকের যেখানে বাংলাদেশ সেটা একসময় সমুদ্রের তলদেশে নিমজ্জিত ছিল। এমনকি হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলও ছিল একসময় টেথিস সাগরের অন্তর্ভুক্ত।

বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা কমেছে। একসময় বাংলাদেশকে বলা হতো তেরোশ নদীর দেশ। পাঠ্যপুস্তকে আমরা ছোট সময় পড়েছি সাতশটি নদীর কথা। এরপর জেনেছি বাংলাদেশে প্রবাহিত নদ-নদী সংখ্যা ২৩০টি। তবে ২০২৫ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এবং যৌথ নদী কমিশন সম্পর্কিত খসড়া প্রতিবেদন ১,৪১৫টি নদ-নদীর কথা বলেছে। বর্তমানে নদীর সংখ্যা যাই থাকুক, দেশের নদীগুলোর স্বাস্থ্য ভালো নেই- এটাই সত্যি।

গত কয়েকদিন আগে পরিবার নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম নাটোর জেলার উত্তরা গণভবনে। যমুনা সেতু পার হওয়ার সময় আমার মেয়ে নুজহাত জামান রূপকথা বারবার বলছিল বাবা নদীর পানি কোথায়? এত বড় সেতু নদীতে, পানি নেই কেন? প্রশ্নটি খুব সহজ হলেও উত্তরের ভেতরে লুকিয়ে ছিল করুণ আর্তনাদ। নদীগুলো কেন শুকিয়ে যাচ্ছে, নদী কেন নাব্য সংকটে ভুগছে এবং নদীর প্রতি কেনই বা এত অবহেলা- এসবের কারণ খোঁজা দরকার।

জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের নদ-নদীর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়ছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক কার্যক্রম অনেক আগে থেকেই ব্যাহত হচ্ছে। আমাদের দেশেও এর প্রভাব পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়া, বৃষ্টিপাত কম হওয়া ইত্যাদি ঘটনা ঘটছে। বিগত দুই দশক ধরে দেখা যাচ্ছে প্রতি বছরই বৃষ্টিপাত কমছে। বৃষ্টিপাত কমার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। নদী নাব্য হারিয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধান নদী এবং ছোট-বড় সব নদীতেই এই চিত্র এখন দৃশ্যমান। 

অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের ফলে সবচেয়ে ক্ষতি হচ্ছে আমাদের নদীগুলো। নদ-নদীর নাব্য সংকটের এটি একটি অন্যতম কারণ। পলি জমে নদী ভরাট হয়ে পড়ছে। ফারাক্কা বাঁধের অন্যতম উদাহরণ। তিস্তা বাঁধ নির্মাণের ফলেও উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোর ওপর প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ নদী অতিরিক্ত পলি জমে, দখল ও দূষণের কারণে নাব্য সংকটে ভুগছে। শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় ব্রহ্মপুত্রসহ অনেক নদ-নদী প্রায় মৃত। এতে নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, কৃষিসেচ ব্যাহত হচ্ছে এবং মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়ছে।


উজান থেকে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর পানি দ্রুত কমছে। পলি জমে নাব্যতা হ্রাস, অপরিকল্পিত সেচ ও নদী ভরাটও নদী শুকিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ। এ ছাড়া ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে নদীগুলোতে পানির প্রবাহ কমছে আশঙ্কাজনকভাবে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীগুলোর প্রতি যত্ন নেওয়া খুব বেশি প্রয়োজন। এর জন্য রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা রাখতে হবে। রাজনৈতিক মঞ্চ, সেমিনার ও জনসভায় নদী নিয়ে প্রতিশ্রুতি রাখা প্রয়োজন। খাল ও নদ-নদী খনন কর্মসূচি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। নদ-নদী দূষণ ও দখল রোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন। নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। নদীর বাঁধ, শিল্প-কারখানাসহ যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প শুরু হওয়ার আগে পরিবেশ ও প্রতিবেশ সুরক্ষা জরিপ থাকা জরুরি।

আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা জরুরি। শুষ্ক মৌসুমে নদ-নদীর পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য ফারাক্কা বাঁধ ও তিস্তা বাঁধের আমাদের অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে নদ-নদী রক্ষায় সবার সচেতনতা প্রয়োজন। কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

শিক্ষক, কলামিস্ট ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব 

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   নদী  ক্ষতি  অপরিকল্পিত  বাঁধ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: