রাজধানীতে বেড়েই চলছে ছিনতাইকারীর দৌরাত্ম্য

আজহার মাহমুদ

মতামত

ঢাকার কোনো একটি ব্যস্ত সড়কে সন্ধ্যার পর দাঁড়িয়ে চারপাশটা একটু গভীরভাবে খেয়াল করলেই বোঝা যায়, শহরটি শুধু যানজটে আটকে নেই।

2026-08-31T04:38:28+00:00
2026-08-31T04:38:28+00:00
 
  সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬,
১৬ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
মতামত
রাজধানীতে বেড়েই চলছে ছিনতাইকারীর দৌরাত্ম্য
আজহার মাহমুদ
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৮ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ঢাকার কোনো একটি ব্যস্ত সড়কে সন্ধ্যার পর দাঁড়িয়ে চারপাশটা একটু গভীরভাবে খেয়াল করলেই বোঝা যায়, শহরটি শুধু যানজটে আটকে নেই। এ শহরের মানুষ যানজটের যন্ত্রণার পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতা, ভয় ও আতঙ্ককেও সঙ্গী হিসেবে মানিয়ে নিয়েছে। অফিস শেষে ঘরে ফেরার সময়, কিংবা ঘর থেকে অফিসে যাওয়ার পথে এখন যুক্ত হয়েছে অদৃশ্য এক শঙ্কা। হাতে মোবাইল ফোন, কাঁধে ব্যাগ কিংবা পকেটে কষ্টের উপার্জনের টাকা, সড়কে নামলে এসব এখন যেন আপনার গলার কাঁটা হয়ে থাকে।

ঢাকার কোনো একটি ব্যস্ত সড়কে সন্ধ্যার পর দাঁড়িয়ে চারপাশটা একটু গভীরভাবে খেয়াল করলেই বোঝা যায়, শহরটি শুধু যানজটে আটকে নেই। এ শহরের মানুষ যানজটের যন্ত্রণার পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতা, ভয় ও আতঙ্ককেও সঙ্গী হিসেবে মানিয়ে নিয়েছে। অফিস শেষে ঘরে ফেরার সময়, কিংবা ঘর থেকে অফিসে যাওয়ার পথে এখন যুক্ত হয়েছে অদৃশ্য এক শঙ্কা। 

হাতে মোবাইল ফোন, কাঁধে ব্যাগ কিংবা পকেটে কষ্টের উপার্জনের টাকা, সড়কে নামলে এসব এখন যেন আপনার গলার কাঁটা হয়ে থাকে। আপনার হাতের মোবাইল, পকেটের টাকা কিংবা গলায় থাকা গহনা- এগুলো আপনার মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

তার সবচেয়ে বড় উদাহারণ গত ২৯ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার ছিনতাইয়ের ঘটনাটি। বগুড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মোসা. রনজিনা পারভীন ঢাকায় এসেছিলেন চিকিৎসা নিতে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তার রিকশা সংসদ ভবন এলাকা হয়ে যাচ্ছে। এমন সময় মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী রনজিনার হাতে থাকা ব্যাগ টান দিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। পরে হাসপাতালে নিলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

আপনি হয়তো এটাকে নিছক একটি ঘটনা কিংবা জনমনের আতঙ্ক বলে উড়িয়ে দিতে পারেন। তবে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ে পুলিশের পরিসংখ্যান যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ধরন আরও বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে। ছিনতাই এখন অনেক ক্ষেত্রে রাতের অন্ধকার কিংবা নির্জন গলির অপরাধে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যস্ত সড়কেও ঘটছে ঘটনা। আর বাধা দিলে ব্যবহার করা হচ্ছে ছুরি, চাপাতি থেকে শুরু করে আগ্নেয়াস্ত্র পর্যন্ত। অর্থাৎ অপরাধের ধরন যেমন বদলেছে, তেমনি বেড়েছে এর সহিংসতাও।

ডিএমপির হিসাবে, ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত রাজধানীর ৫০টি থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৪১৮টি মামলা হয়েছে। মাসভিত্তিক হিসাবে আগস্টে সর্বোচ্চ ৫৪টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল। বিভাগভিত্তিক হিসাবে তেজগাঁওয়ে ১০৬টি, ওয়ারীতে ৯১টি এবং মতিঝিলে ৭৩টি মামলা হয়েছে।

কিন্তু এই ৪১৮ সংখ্যাটিকে রাজধানীর প্রকৃত ছিনতাইয়ের সংখ্যা মনে করলে ভুল হবে। কারণ থানায় মামলা হওয়া আর ছিনতাইয়ের প্রকৃত ঘটনা, দুটো এক বিষয় নয়। ছিনতাইয়ের শিকার অনেকে থানায় যান না। কেউ হারানো মোবাইল বা সামান্য অর্থের জন্য মামলা করতে চান না, কেউ পুলিশের কাছে গিয়ে হয়রানির আশঙ্কা করেন, আবার কেউ মনে করেন মামলা করেও লাভ হবে না। 

এমনকি বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ছিনতাইয়ের শিকার হয়েও অনেক নাগরিক মামলা করেন না। এ কারণেই শুধু মামলার সংখ্যা দিয়ে ঢাকার ছিনতাই পরিস্থিতি বিচার করা বিপজ্জনকভাবে অসম্পূর্ণ। সবচেয়ে উদ্বেগের তথ্যটি সম্ভবত অন্য জায়গায়। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে সক্রিয় ছিনতাইকারীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৮৭ জন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ছিনতাইকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। এই একটি তথ্যই আমাদের শহরের বাস্তবচিত্র দেখিয়ে দেয়।

ছিনতাইয়ের সঙ্গে মাদক, পুনরাবৃত্ত অপরাধ, কিশোর গ্যাং, সংঘবদ্ধ চক্র এবং দ্রুত অর্থ পাওয়ার প্রবণতার যোগসূত্র রয়েছে। রাজধানীতে সক্রিয় অপরাধীদের একটি অংশ মাদকাসক্ত, আবার কেউ কেউ পেশাদারভাবে এই অপরাধকে জীবিকার বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। ফলে একজনকে আটক করলেই আরেকজন তার জায়গা পূরণ করছে। এই জায়গাতেই প্রচলিত ‘ধরো আর মামলা দাও’ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে ছিনতাইয়ের কৌশলে। আগে সাধারণত নির্জন রাস্তা, রাত কিংবা একা পথচারী ছিল প্রধান লক্ষ্য। এখন মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে দ্রুত আক্রমণ ও পালিয়ে যাওয়ার কৌশল দেখা যাচ্ছে। অস্ত্রের ব্যবহারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও দেখাচ্ছে, ছিনতাইকারীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এমনকি আগস্টের শেষ সপ্তাহেও যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাইয়ের সময় পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে ডিএমপির সিটি-ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস বিভাগ। অর্থাৎ অভিযান আছে, গোয়েন্দা তৎপরতা আছে, গ্রেফতারও আছে। তারপরও অপরাধ আছে।

একজন অপরাধীকে গ্রেফতার করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংখ্যা প্রকাশ করা প্রশাসনিক সাফল্যের সূচক হতে পারে। কিন্তু সেই অপরাধী যদি কিছু দিন পর আবার একই অপরাধে ফিরে আসে, তা হলে নগরবাসীর নিরাপত্তার কোনো উন্নতি 
হয় না। তাই আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সাফল্য মাপতে হবে অন্যভাবে। একই এলাকায় ছিনতাই কতটা কমেছে, পুনরাবৃত্ত অপরাধী কতজন অপরাধ থেকে বেরিয়ে এসেছে, অভিযোগের পর কত দ্রুত তদন্ত হয়েছে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর হয়েছে।

এখানে বিচারব্যবস্থার দ্রুততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রেফতার যদি অপরাধীর কাছে ভয় তৈরি না করে, তা হলে আইন তার প্রতিরোধ ক্ষমতা হারায়। তদন্ত দ্রুত শেষ করা, সঠিক প্রমাণ সংগ্রহ, অপরাধীর ভূমিকা নির্ধারণ, বিচার দ্রুত শেষ করা, সবকিছু একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু পুলিশের ওপর দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

প্রযুক্তিও এখানে বড় অস্ত্র হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে কার্যকর সিসি ক্যামেরা, নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা ছিনতাইকারীদের গতিবিধি শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু ক্যামেরা বসিয়ে ছবি তোলাই যথেষ্ট নয়; সেই ফুটেজ দ্রুত বিশ্লেষণ করে অপরাধীর পরিচয় শনাক্ত এবং গ্রেফতারের সক্ষমতাও থাকতে হবে।

আরেকটি বিষয় হলো আলোর ব্যবস্থা। অপরাধপ্রবণ এলাকার সড়কবাতি সচল রাখা, ফুটপাথ ও গলির অন্ধকার দূর করা, বাসস্ট্যান্ড ও গণপরিবহন স্টপেজে পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা। এসবকে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। কারণ অপরাধ শুধু অপরাধীর কারণে হয় না, অপরাধের সুযোগও তাকে উৎসাহিত করে।

একই সঙ্গে মোবাইল ফোন ও চুরি যাওয়া মালামালের অবৈধ বাজার বন্ধ করা জরুরি। একজন ছিনতাইকারী জানে, ছিনতাই করা ফোন দ্রুত বিক্রি করা সম্ভব বলেই তার ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ বাড়ে। তাই শুধু ছিনতাইকারী ধরলে হবে না; চুরি বা ছিনতাই করা ফোন, স্বর্ণালংকার কিংবা অন্য মালামাল যারা কিনে ও বিক্রি করে, সেই বাজারের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে শুধু কঠোরতা দিয়ে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে না। অপরাধে জড়িয়ে পড়া তরুণদের একটি অংশকে সমাজে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও দরকার। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, মাদক, বেকারত্ব, অপরাধী চক্রের প্রভাব এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাক্সক্ষাসহ কারণ চিহ্নিত করে পুনর্বাসন, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। পেশাদার অপরাধীর ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং ঝুঁকিতে থাকা তরুণের ক্ষেত্রে পুনর্বাসন- দুই নীতি একসঙ্গে চালাতে হবে।

ঢাকার মানুষ নিরাপত্তার জন্য পুলিশের কাছে শুধু টহল চায় না, তারা চায় দৃশ্যমান ফলাফল। তারা জানতে চায়, যে ব্যক্তি গত বছর ছিনতাই করেছিল সে এবারও কেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে? তারা জানতে চায়, যে এলাকায় নিয়মিত ছিনতাই হচ্ছে সেখানে পর্যাপ্ত আলো নেই কেন? তারা জানতে চায়, একটি ঘটনা ঘটার পর সিসি ক্যামেরার ফুটেজ উদ্ধার করতে এত সময় লাগে কেন? আর তারা সবচেয়ে বেশি জানতে চায় অপরাধী গ্রেফতারের পর তার বিরুদ্ধে বিচার কতদূর এগোল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত শুধু গ্রেফতারের সংখ্যা দিয়ে রাজধানীকে নিরাপদ বলা যাবে না।

ঢাকার ছিনতাই সমস্যা তাই আইনশৃঙ্খলার একটি উপসর্গ মাত্র। এর ভেতরে আছে মাদক, বেকারত্ব, নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অন্ধকার ও অপরিকল্পিত রাস্তা, অপরাধী নেটওয়ার্ক, অবৈধ বাজার, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের সমন্বয়হীনতা।

অভিযান চলবে, গ্রেফতার হবে, কিন্তু তার সঙ্গে অপরাধের মূল নেটওয়ার্ক ভাঙতে হবে। পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের নজরদারিতে রাখতে হবে। ছিনতাই করা পণ্যের বাজার বন্ধ করতে হবে। মাদক ও অস্ত্রের সরবরাহ কমাতে হবে। 

অপরাধপ্রবণ স্থানগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে। দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে নাগরিকের অনীহা দূর করতে হবে।

বর্তমান সরকার এই বিষয়ে আন্তরিক দৃষ্টি দেবে সেই বিশ্বাস দেশের নাগরিকরা করে। আর কোনো ব্যক্তি যেন বগুড়ার শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনের মতো লাশ না হয়।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   রাজধানী  ছিনতাইকারী  দৌরাত্ম্য  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: