আছে অপার সম্ভাবনা, দরকার দায়িত্বশীল পর্যটন

মো. হাসিবুর রহমান

মতামত

ভ্রমণ করতে গিয়ে একটা জিনিস আমি খুব ভালোভাবে বুঝেছি, একটা দেশকে চিনতে হলে শুধু তার রাজধানী বা বিখ্যাত জায়গাগুলো দেখলেই

2026-08-30T20:52:44+00:00
2026-08-30T21:24:34+00:00
 
  রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬,
১৫ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
মতামত
আছে অপার সম্ভাবনা, দরকার দায়িত্বশীল পর্যটন
মো. হাসিবুর রহমান
প্রকাশ: রোববার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৫২ পিএম  আপডেট: ৩০.০৮.২০২৬ ৯:২৪ পিএম
মো. হাসিবুর রহমান। গ্রাফিক : সময়ের আলো
ভ্রমণ করতে গিয়ে একটা জিনিস আমি খুব ভালোভাবে বুঝেছি, একটা দেশকে চিনতে হলে শুধু তার রাজধানী বা বিখ্যাত জায়গাগুলো দেখলেই হয় না। সেই দেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়, তাদের জীবন দেখতে হয়, স্থানীয় খাবার খেতে হয়, কখনো কখনো পথ হারাতেও হয়।

আমি নিজে ভারতের ২২টি রাজ্যের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চল ঘুরেছি। নেপালেরও বেশ কিছু জায়গায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। প্রতিটি ভ্রমণ আমাকে নতুন কিছু শিখিয়েছে। তবে, সবচেয়ে বেশি শিখেছি নিজের দেশকে নতুন চোখে দেখতে। কারণ, বাইরে ঘুরে যখন দেখি অন্য দেশগুলো তাদের ছোট ছোট জায়গাগুলোকেও কীভাবে পর্যটনের অংশ বানিয়েছে, তখন বারবার মনে হয় আমাদের বাংলাদেশে তো এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু আছে। তাহলে আমরা কোথায় পিছিয়ে আছি? এই প্রশ্নটা এখন আমাকে প্রায়ই ভাবায়।

আমি বর্তমানে ঢাকা এফএম ৯০.৪-এর ‘লেটস গো উইথ আরজে হাসিব’ নামের একটি ট্রাভেল শো উপস্থাপনা করি। এই অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিশ্বের নানা দেশ ঘুরে আসা অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। আমাদের অনুষ্ঠানে কাজী আসমা আজমেরী, নাজমুন নাহার, এলিজা বিনতে এলাহী, ইকরামুল হাসান শাকিল, তাহের আহমেদ খান, আশফাক আহমেদসহ অনেক ভ্রমণপ্রেমী মানুষ এসেছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একটা বিষয় বারবার শুনেছি, বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে আমাদের প্রত্যেকেরই অনেক স্বপ্ন আছে, কিন্তু বাস্তব চিত্র দেখলে অনেক সময় হতাশ হতে হয়।


আমিও হই। তবে সেই হতাশার পাশাপাশি একটা বিশ্বাসও আছে, আমরা চাইলে অনেক কিছুই পরিবর্তন করতে পারি। আমাদের দেশের সৌন্দর্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। বাংলাদেশ ছোট একটি দেশ, কিন্তু এই ছোট দেশের মধ্যে প্রকৃতির কত বৈচিত্র্য! সমুদ্র আছে, পাহাড় আছে, নদী আছে, হাওর আছে, সুন্দরবন আছে, চা-বাগান আছে। আছে পুরনো স্থাপনা, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, গ্রামবাংলার জীবন, স্থানীয় খাবার ও অসাধারণ আতিথেয়তা। কখনো কখনো মনে হয়, আমরা নিজেরাই আমাদের সম্পদের গুরুত্ব বুঝি না।

একজন বিদেশি পর্যটককে যদি বাংলাদেশের কোনো গ্রামের নদীর পাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়, হয়ত তার কাছে সেটিও একটি নতুন অভিজ্ঞতা। কিন্তু আমরা সেটাকে খুব সাধারণ বলে মনে করি। আমাদের কাছে সাধারণ, অন্য কারও কাছে সেটাই হতে পারে অসাধারণ। এটাই পর্যটনের সৌন্দর্য।

বাইরে গিয়ে একটা পার্থক্য খুব চোখে পড়েছে। ভারতের ২২টি রাজ্য ঘুরে আমি দেখেছি, অনেক জায়গায় তারা পর্যটনকে শুধু একটা দর্শনীয় স্থান হিসেবে দেখেনি। একটা জায়গায় গেলে কী খাবেন, কোথায় থাকবেন, কী কিনবেন, কীভাবে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে পরিচিত হবেন- সবকিছুর একটা ব্যবস্থা থাকে। নেপালেও দেখেছি, পাহাড়কে কেন্দ্র করে তারা শুধু পাহাড় দেখাচ্ছেন না। ট্রেকিং, স্থানীয় সংস্কৃতি, খাবার, গাইড, থাকার ব্যবস্থা, সব মিলিয়ে একটা অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। আমাদেরও সুন্দর পাহাড় আছে। কিন্তু একজন পর্যটক সেখানে গিয়ে কিছুদিন মতো কতগুলো অভিজ্ঞতা আমরা তৈরি করতে পেরেছি? এই জায়গাটাতেই আমাদের আরও কাজ করা দরকার।


কক্সবাজার নিয়ে একটু অন্যভাবে ভাবতে হবে। কক্সবাজারে অনেক মানুষ যায়, কিন্তু কক্সবাজারকে আমরা কি শুধু সমুদ্র দেখার জায়গা হিসেবেই রেখে দেব? আমার মনে হয় না। কক্সবাজারের আশপাশে আরও অনেক কিছু আছে। মহেশখালী আছে, ইনানী আছে, হিমছড়ি আছে। স্থানীয় খাবার আছে, স্থানীয় মানুষের জীবন আছে। একজন পর্যটক যদি সেখানে গিয়ে শুধু সৈকতে হাঁটেন, তারপর হোটেলে ফিরে আসেন, তাহলে তার অভিজ্ঞতা যতটা হতে পারত, তার অনেকটাই বাদ পড়ে যায়। আমাদের উচিত এমন ব্যবস্থা করা, যাতে একজন পর্যটক কক্সবাজারে গিয়ে কয়েক দিন থেকেও প্রতিদিন নতুন কিছু করার সুযোগ পান।

আর একটা বিষয় অবশ্যই দরকার, পরিচ্ছন্নতা। আমরা যদি নিজেরাই আমাদের পর্যটনকেন্দ্র নোংরা করি, তাহলে বিদেশি পর্যটক তো দূরের কথা, নিজের দেশের মানুষকেও ভালো অভিজ্ঞতা দিতে পারব না।

অন্যদিকে, সুন্দরবনকে শুধু ‘বাঘ দেখার জায়গা’ বানাব না। সুন্দরবন নিয়ে আমাদের গর্ব করার অনেক কারণ আছে। সুন্দরবনে গেলে শুধু বাঘ দেখার চেষ্টা করলেই হবে না। সুন্দরবনের মানুষ, তাদের জীবন, নদী, বন, প্রকৃতি- সবকিছুকে বুঝতে হবে। আমি মনে করি, সুন্দরবনের পর্যটন এমন হওয়া উচিত যেখানে প্রকৃতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। পর্যটক আসবে, স্থানীয় মানুষ আয় করবে, কিন্তু সুন্দরবনের ক্ষতি হবে না- এটা সম্ভব। শুধু আমাদের একটু দায়িত্বশীল হতে হবে।


আমার নিজের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে একটা জিনিস আমি খুব বিশ্বাস করি- বাংলাদেশের প্রতিটি জেলারই কোনো না কোনো গল্প আছে। কোথাও খাবার, কোথাও ইতিহাস, কোথাও নদী, কোথাও পাহাড়, কোথাও হাওর, কোথাও কোনো পুরনো স্থাপনা। আমরা যদি এই গল্পগুলো ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারি, তাহলে শুধু কক্সবাজার, সিলেট বা বান্দরবানের ওপর পর্যটনের চাপ থাকবে না। মানুষ অন্য জেলাগুলোতেও যাবে। আমার ট্রাভেল শোতে আমি এই বিষয়টাই করার চেষ্টা করি। একটি জায়গা সম্পর্কে শুধু তথ্য না দিয়ে তার গল্পটা মানুষের কাছে তুলে ধরতে চাই। কারণ আমার মনে হয়, গল্প মানুষকে ভ্রমণে যেতে উৎসাহিত করে।

পর্যটন মানে শুধু ব্যবসা নয়। আমরা যখন পর্যটনের কথা বলি, তখন হোটেল, রিসোর্ট, ট্যুর প্যাকেজ-এসব নিয়ে কথা বলি। কিন্তু এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করার বিষয়টিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন স্থানীয় তরুণ ভালো গাইড হতে পারেন। কেউ ভালো রান্না করতে পারেন। কেউ নৌকা চালাতে পারেন। কেউ স্থানীয় হস্তশিল্প তৈরি করেন। কেউ হয়ত গ্রামের একটি সুন্দর বাড়িকে হোমস্টেতে পরিণত করতে পারেন। এসব ছোট ছোট উদ্যোগই একসময় বড় পর্যটন অর্থনীতির অংশ হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য পর্যটন খাতে অনেক কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। 

আমাদের শুধু নতুন জায়গা খুঁজলে হবে না, পুরনো জায়গাগুলোও বাঁচাতে হবে, পর্যটনের উন্নয়ন করতে গিয়ে আমরা যেন আবার আমাদের প্রকৃতিকে নষ্ট না করি। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি জায়গায় পর্যটক বাড়লেই যদি সেখানে প্লাস্টিক বাড়ে, নদী দূষিত হয়, পাহাড় কাটা হয়, বন নষ্ট হয়, তাহলে সেটা উন্নয়ন নয়। আমাদের এমন পর্যটন চাই, যেখানে আজ মানুষ ভ্রমণ করবে এবং আগামী প্রজন্মও একই জায়গায় গিয়ে সেই সৌন্দর্য দেখতে পারবে।


আমি কী পরিবর্তন দেখতে চাই? আমি খুব বড় কোনো কথা বলতে চাই না। একজন ভ্রমণকারী হিসেবে আমার কিছু সাধারণ প্রত্যাশা আছে। আমি চাই, পর্যটনকেন্দ্রগুলো পরিষ্কার থাকুক, মানুষ নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারুক, যাতায়াতব্যবস্থা সহজ হোক, ভালো প্রশিক্ষিত গাইড থাকুক, স্থানীয় মানুষ পর্যটন থেকে আয় করুক, স্থানীয় খাবার ও সংস্কৃতির মূল্য দেওয়া হোক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- একটি জায়গাকে নষ্ট না করে তার সৌন্দর্য ধরে রেখে পর্যটন গড়ে তোলা হোক।

আমি এখনো আশাবাদী, আমার ট্রাভেল শোতে অনেক ভ্রমণকারীর সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের অভিজ্ঞতা শুনেছি। অনেক সময় নিজের দেশের পর্যটন নিয়ে হতাশ হয়েছি। কিন্তু একই সঙ্গে আমি একটা বড় পরিবর্তনও দেখছি। বাংলাদেশের মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ভ্রমণ করতে চায়। বিশেষ করে তরুণরা দেশের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখতে চায়। তারা নতুন জায়গা খুঁজছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় জায়গাগুলোর ছবি ও ভিডিও শেয়ার করছে। এই আগ্রহটাকে আমরা যদি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের ডমেস্টিক ট্যুরিজম অনেক দূর যেতে পারে। আমার মনে হয়, এখান থেকেই শুরু হতে পারে বড় পরিবর্তন।

শেষ কথাটা নিজের দেশকে নিয়েই, ভারতের ২২টি রাজ্য ঘুরেছি। নেপালের বিভিন্ন জায়গা ঘুরেছি। অনেক দেশের মানুষের ভ্রমণগল্প শুনেছি। কিন্তু যত বেশি বাইরে ঘুরেছি, তত বেশি নিজের দেশের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। কারণ আমি বুঝেছি, আমাদের অনেক কিছুই আছে। হয়ত সবকিছু নিখুঁত নয়, হয়ত আমাদের অনেক সমস্যা আছে, হয়ত পর্যটন ব্যবস্থাপনায় এখনো অনেক ঘাটতি আছে, তাই বলে আমাদের স্বপ্ন দেখা বন্ধ করা যাবে না।

আমি এমন একটা বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে একজন বিদেশি পর্যটক শুধু কক্সবাজার বা সুন্দরবন দেখতে এসে ফিরে যাবেন না। তিনি বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন, গ্রামের পথে হাঁটবেন, স্থানীয় খাবার খাবেন, নদীতে নৌকা ভ্রমণ করবেন, পাহাড় দেখবেন, হাওরে যাবেন, ইতিহাস জানবেন। আর ফিরে গিয়ে বলবেন, ‘বাংলাদেশকে শুধু দেখা যায় না, বাংলাদেশকে অনুভব করতে হয়।’

আমার কাছে বাংলাদেশের পর্যটনের ভবিষ্যৎ এখানেই। আমাদের নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে নিজের দেশকে। হয়ত একদিন আমরা এমন একটা বাংলাদেশ তৈরি করতে পারব, যেখানে একজন বাংলাদেশি বিদেশে গিয়ে বলবেন, ‘তুমি বাংলাদেশে গিয়েছ? তাহলে তুমি এখনো বাংলাদেশের অনেক কিছুই দেখোনি।’ সেই বাংলাদেশ দেখার অপেক্ষায় আছি।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   ভ্রমণ  পর্যটন  বাংলাদেশ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: