ছুটির দিনে ঘুরে আসুন পুরান ঢাকার ১০ ঐতিহাসিক স্থান

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও শহরের পুরোনো অংশের ইতিহাস-ঐতিহ্য অনেকেরই অজানা। অথচ একদিনের পরিকল্পনা করলেই পুরান ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বেশ

2026-08-28T10:00:45+00:00
2026-08-28T10:00:45+00:00
 
  শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬,
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
ফিচার
ছুটির দিনে ঘুরে আসুন পুরান ঢাকার ১০ ঐতিহাসিক স্থান
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০০ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও শহরের পুরোনো অংশের ইতিহাস-ঐতিহ্য অনেকেরই অজানা। অথচ একদিনের পরিকল্পনা করলেই পুরান ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা ঘুরে দেখা সম্ভব। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় ভাগ করে নিলে একই দিনে দেখা যাবে প্রাচীন উদ্যান, মসজিদ, মন্দির, প্রাসাদ, কবরস্থান, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন। ভ্রমণ শুরু করা যেতে পারে ওয়ারীর বলধা গার্ডেন দিয়ে।

বলধা গার্ডেন

১৯০৬ সালে জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী ওয়ারীতে বলধা গার্ডেন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। দীর্ঘ ২৮ বছরে বিশ্বের ৫২টি দেশ থেকে বিভিন্ন দুর্লভ উদ্ভিদের চারা সংগ্রহ করা হয়। ১৯৩৬ সালে বাগানটির কাজ সম্পন্ন হয়।

৩ দশমিক ৩৮ একর আয়তনের এই বাগানে রয়েছে প্রায় ৮০০ প্রজাতির ১৮ হাজার গাছ ও লতাগুল্ম। দুটি অংশে বিভক্ত বাগানটির এক অংশে রয়েছে শঙ্খনাদ পুকুর, ক্যামেলিয়াসহ নানা উদ্ভিদ। অন্য অংশে দেখা যাবে আমাজন লিলি, শাপলা, ক্যাকটাস ও ভূর্জপত্রসহ বিভিন্ন দুর্লভ উদ্ভিদ।

বলধা গার্ডেনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। কথিত আছে, এখানকার জয় হাউজে বসে তিনি ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতাটি লিখেছিলেন। যদিও এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।

কলম্বো সাহেবের সমাধি ও বিনত বিবির মসজিদ 

বলধা গার্ডেন থেকে বেরিয়ে নারিন্দার দিকে যাওয়া যায়। পথে খ্রিষ্টান কবরস্থানে রয়েছে কথিত কলম্বো সাহেবের সমাধি। মোগল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত বর্গাকার এই সমাধির দেয়ালে রয়েছে বিভিন্ন নকশা ও শিলালিপি। তবে কলম্বো সাহেবের পরিচয় নিয়ে এখনো রহস্য রয়েছে।

কবরস্থান থেকে অল্প দূরেই বিনত বিবির মসজিদ। মসজিদের গায়ে থাকা শিলালিপি অনুযায়ী, ৮৬১ হিজরি বা ১৪৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনামলে তাঁর কন্যা মুসাম্মাত বখত বিনত বিবি এটি নির্মাণ করেন। ঢাকার প্রাচীন স্থাপনাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

জয়কালী মন্দির

এরপর যাওয়া যেতে পারে জয়কালী মন্দিরে। ওয়ারী ও ঠাটারিবাজারের মধ্যবর্তী জয়কালী মন্দির স্ট্রিটে অবস্থিত এই মন্দিরটি নির্মিত হয় ১৫৯৩ সালে। তুলসীনারায়ণ ঘোষ ও নবনারায়ণ ঘোষ মন্দিরটি নির্মাণ করেন।

মন্দির ঘুরে কাছাকাছি কোনো খাবারের দোকানে সকালের নাশতা সেরে নেওয়া যায়। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নেওয়ারও সুযোগ মিলবে সেখানে।

রোজ গার্ডেন 

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে যাওয়া যেতে পারে টিকাটুলির কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে। ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হৃষিকেশ দাস ১৯৩০ সালের দিকে প্রাসাদটি নির্মাণ শুরু করেন। পরে ১৯৩৭ সালে খানবাহাদুর আবদুর রশীদ এটি কিনে ‘রশীদ মঞ্জিল’ নাম দেন। ২০১৮ সালে সরকার প্রাসাদটি অধিগ্রহণ করে।

করিন্থীয় ও গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত সাদা রঙের দোতলা এই ভবনে রয়েছে মার্বেল পাথরের মেঝে, কারুকার্যময় ছাদ, খিলানযুক্ত দরজা, ঝাড়বাতি, প্রশস্ত সিঁড়ি ও নাচঘর। প্রাসাদের চারপাশের বাগান, গোলাপ, ভাস্কর্য ও পুকুর এর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে।

বিউটি বোর্ডিং 

রোজ গার্ডেন থেকে রিকশায় যাওয়া যায় শ্রীশ দাস লেনের বিউটি বোর্ডিংয়ে। জমিদার সুধীরচন্দ্র দাসের বাড়িতে ১৯৪৯ সালে দুই ভাই প্রহ্লাদচন্দ্র সাহা ও নলিনীমোহন সাহা এটি প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিউটি বোর্ডিং হয়ে ওঠে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মীদের আড্ডাস্থল। সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, জহির রায়হান ও খান আতাসহ বহু বিশিষ্টজনের পদচারণা ছিল এখানে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিউটি বোর্ডিংয়ে হামলা চালায়। ওই ঘটনায় প্রহ্লাদ সাহাসহ ১৭ জন নিহত হন।

নর্থব্রুক হল, ঢাকা কেন্দ্র ও বুলবুল ললিতকলা একাডেমি 

দুপুরে যাওয়া যেতে পারে ওয়াইজঘাটে। ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুকের ঢাকা সফর উপলক্ষে ১৮৭৪ সালে বুড়িগঙ্গার তীরে নির্মিত হয় নর্থব্রুক হল। লাল রঙের এই ঐতিহাসিক ভবনে রয়েছে একটি নাট্যালয়। ১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছিল।

ওয়াইজঘাটের ওয়াইজ হাউজে একসময় ছিল বুলবুল ললিতকলা একাডেমি। আফরোজা বুলবুল ১৯৫৫ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে ভবনটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং সরকার এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে।

এরপর যাওয়া যায় ফরাশগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রে। মাওলা বখশ সরদার মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রে রয়েছে ঢাকাবিষয়ক দুর্লভ বই, পত্রপত্রিকা, পুরোনো তৈজসপত্র, আসবাব ও অলংকারের সংগ্রহ। ঢাকার ইতিহাস নিয়ে আগ্রহীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান।

শাঁখারীবাজার 

পুরান ঢাকার ঐতিহ্য অনুভব করতে এরপর হাঁটা যেতে পারে শাঁখারীবাজারের অলিগলিতে। শাঁখের তৈরি চুড়ি, বালা, টিপ ও বাদ্যযন্ত্রের দোকানগুলো এখানকার পুরোনো পেশা ও সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে।

গলির ভেতরের কারিগরদের কাছে শঙ্খ থেকে কীভাবে চুড়ি তৈরি করা হয়, সেই প্রক্রিয়াও কাছ থেকে দেখা যায়।

লালবাগ কেল্লা 

দুপুরের খাবার সেরে গন্তব্য হতে পারে লালবাগ কেল্লা। মোগল আমলের এই স্থাপনাটি ‘কেল্লা আওরঙ্গবাদ’ নামেও পরিচিত। ১৬৭৮ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদ আজম শাহ বাংলার সুবেদার থাকাকালে এর নির্মাণকাজ শুরু করেন।


পরবর্তী সময়ে সুবেদার শায়েস্তা খাঁ নির্মাণকাজ আবার শুরু করলেও তাঁর কন্যা পরী বিবির মৃত্যুর পর কেল্লাটিকে অপয়া মনে করা হয়। ফলে এর নির্মাণ আর শেষ হয়নি। এখানেই রয়েছে পরী বিবির সমাধি। রয়েছে তিন গম্বুজের শাহী মসজিদ, দুর্গপ্রাচীর, জলাধার, সুড়ঙ্গ ও ফোয়ারা।

আর্মেনিয়ান চার্চ ও কবরস্থান 

লালবাগ থেকে রিকশায় যাওয়া যায় আরমানিটোলায়। সপ্তদশ শতক থেকে আর্মেনীয় বণিকেরা ঢাকায় বসতি গড়তে শুরু করেন। তাঁদের বসতির কারণেই এলাকাটির নাম হয় আরমানিটোলা।

আর্মেনিয়ান স্ট্রিটে ১৭৮১ সালে গির্জাটির নির্মাণ শুরু হয়। এর পাশেই রয়েছে আর্মেনীয় কবরস্থান। পুরোনো সমাধিগুলোর এপিটাফ ও স্থাপত্য এখানকার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।

আহসান মঞ্জিল

পুরান ঢাকা ভ্রমণের শেষ গন্তব্য হতে পারে বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত আহসান মঞ্জিল। নওয়াব আবদুল গণি এর নির্মাণকাজ শুরু করেন ১৮৫৯ সালে। ১৮৭২ সালে নির্মাণ শেষ হওয়ার পর তাঁর ছেলে খাজা আহসানউল্লাহর নামে ভবনটির নাম রাখা হয় আহসান মঞ্জিল।

একসময় এর গম্বুজের চূড়া ছিল ঢাকা শহরের সবচেয়ে উঁচু স্থান। এখানেই ঢাকার প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো হয়েছিল বলে জানা যায়।

বর্তমানে আহসান মঞ্জিল জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভবনের বিভিন্ন অংশে নবাবি আমলের আবাসিক ও আনুষ্ঠানিক কক্ষের পাশাপাশি রয়েছে চার হাজারের বেশি নিদর্শনের সংগ্রহ। ৩২টি কক্ষের মধ্যে নয়টি নবাবি আমলের আদলে সাজানো হয়েছে।

ইমরান হেরিটেজে দিন শেষ

ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ঘোরার পর দিনটি শেষ করা যেতে পারে বেচারাম দেউড়ির ইমরান হেরিটেজে। দেড় শতাব্দীর বেশি পুরোনো আর্মেনীয় স্থাপত্যরীতির একটি বাড়ির অংশে গড়ে উঠেছে এই রেস্তোরাঁ।

স্থানীয়ভাবে ‘সাহেব বাড়ি’ নামে পরিচিত বাড়িটি উনিশ শতকের মাঝামাঝি ছয় বিঘা জমির ওপর নির্মাণ করেছিলেন তৎকালীন জমিদার মৌলভি আবুল খায়রাত মোহাম্মদ। কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পী এস এম সুলতানসহ অবিভক্ত ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের আতিথেয়তা পেয়েছে এই বাড়ি।

পঞ্চাশের দশকে যুক্তফ্রন্টের কয়েকটি বৈঠকও এখানে হয়েছিল। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁকে এই বাড়িতেই সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

অর্থাৎ সকাল থেকে সন্ধ্যা— একটি দিনের পরিকল্পনাতেই পুরান ঢাকার স্থাপত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, খাবার ও ঐতিহ্যের বড় একটি অংশ ঘুরে দেখা সম্ভব। তবে প্রতিটি স্থানের খোলার সময় ও প্রবেশের নিয়ম আগে জেনে নিয়ে ভ্রমণ পরিকল্পনা করাই ভালো।

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   ছুটির দিন  পুরান ঢাকা  ঐতিহাসিক স্থান 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: