গ্যাস সংকট মানে শুধু বিদ্যুৎ সংকট নয়, দেখতে হবে জাতীয় সংকট হিসেবে
গ্যাস বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান জ্বালানি। গ্যাসের ঘাটতি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। সার কারখানা বন্ধ হতে পারে। রফতানি কমতে পারে। কর্মসংস্থানে চাপ পড়ে।
অর্থাৎ, গ্যাস সংকট-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প উৎপাদন কমে, রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি হয়, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।
সে কারণে জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এটি জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়। সেজন্য এই বিভাগটির মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি তদারকি দরকার। দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা—দুটোই অতি গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানির সবচেয়ে বড় অপূর্ণ সম্ভাবনা বঙ্গোপসাগর
বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত বঙ্গোপসাগর। ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশাল সমুদ্রাঞ্চলের ওপর অধিকার নিশ্চিত করলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকার সমুদ্রভিত্তিক অনুসন্ধান করেনি।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ ২৪টি সমুদ্রভিত্তিক ব্লক আন্তর্জাতিক কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করে। দীর্ঘ সময়েও কোনো কোম্পানি আনুষ্ঠানিক দরপত্র জমা দেয়নি। সেই ব্যর্থতা থেকে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিএনপি সরকার, ইনশাআল্লাহ, ২০২৬ সালের মে মাসে নতুন করে বঙ্গোপসাগরের ২৬টি সমুদ্রভিত্তিক ব্লক—১১টি অগভীর পানির এবং ১৫টি গভীর পানির—আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করেছে। সংশোধিত উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তিতে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমাতে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, ব্যয় পুনরুদ্ধার, পাইপলাইন বিনিয়োগ এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। এবার দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৩০ নভেম্বর ২০২৬।
এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু দরপত্র আহ্বান কোনো আবিষ্কার নয়। সাফল্য মাপতে হবে অন্যভাবে—কতটি কোম্পানি দরপত্র জমা দিল, কতটি ব্লক বরাদ্দ হলো, কবে ভূকম্পন জরিপ শুরু হলো, কবে প্রথম অনুসন্ধান কূপ খনন হলো এবং শেষ পর্যন্ত কতটি বাণিজ্যিক আবিষ্কার হলো? গ্যাস উত্তোলন শুরু হওয়ার মধ্য দিয়েই সাফল্য মাপতে হবে।
ভোলায় গ্যাস পর্যাপ্ত আছে অথচ আমরা এলএনজি কিনছি
বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার একটি বড় বৈপরীত্য হচ্ছে ভোলা। ভোলার তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে মোট সম্ভাব্য মজুত প্রায় ১ হাজার ৪৩২ বিলিয়ন ঘনফুট হতে পারে বলে পেট্রোবাংলার সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। অথচ সেখান থেকে এখন পর্যন্ত ২০০ বিলিয়ন ঘনফুটেরও কম গ্যাস উত্তোলন হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে যখন গ্যাসের ঘাটতি, তখন ভোলার গ্যাস কীভাবে দ্রুত ও অর্থনৈতিকভাবে জাতীয় গ্রিডে আনা যায়, সেটি অগ্রাধিকার পাওয়া দরকার নয় কি?
দেশের ভেতরে ব্যবহারযোগ্য গ্যাস থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন প্রথমে বিদেশ থেকে গ্যাস কিনব?
ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য পাইপলাইন, প্রক্রিয়াকরণ ও সঞ্চালন অবকাঠামোর প্রয়োজন—একথা ঠিক। কিন্তু সেই বিনিয়োগের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এলএনজি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে করা দরকার নয় কি?
এলএনজি হয়তো আমাদের সাময়িক বাঁচিয়েছে কিন্তু নিরাপদ করেনি
দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি প্রয়োজনীয় করে তুলেছিল আওয়ামী লীগ সরকার, সঙ্গে ছিল তাদের লাগামহীন অর্থনৈতিক লুটপাট। তখন বিদ্যুৎ ও শিল্পের কিছু চাহিদা পূরণ সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এলএনজি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার বিকল্প নয়। কারণ এর সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, তরলীকরণ ব্যয়, জাহাজে পরিবহন, পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর, বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি।
সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটেও দেখা গেছে, আমদানিকৃত এলএনজি খালাসে সমস্যা হলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। আগস্টে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এলএনজি খালাসে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যার কারণে সংকট তৈরি হয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যে তা স্বাভাবিক হবে।
এই ঘটনাই দেখিয়ে দেয়—একটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা যদি আমদানিকৃত এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থার একটি ছোট বিঘ্নও বড় জাতীয় সংকট তৈরি করতে পারে। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ বাংলাদেশে বর্তমানে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট। এর থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর দৃশ্যমান পদক্ষেপ যেমন দরকার, তেমনি স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি স্পষ্ট পরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরা দরকার। এতে জনগণের মধ্যে প্রস্তুতি ও স্বস্তি থাকবে।
লেখক : সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী