ঋণ দিলেই কি ফিরবে বন্ধ কারখানা?

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

মতামত

একটি ঋণের ফাইল অনুমোদনের আগে কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয়। শাখায় যাচাই, প্রধান কার্যালয়ে ঝুঁকি মূল্যায়ন, এরপর অনুমোদন কমিটির সিদ্ধান্ত। বন্ধ

2026-09-03T05:13:58+00:00
2026-09-03T05:13:58+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৯ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
ঋণ দিলেই কি ফিরবে বন্ধ কারখানা?
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:১৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
একটি ঋণের ফাইল অনুমোদনের আগে কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয়। শাখায় যাচাই, প্রধান কার্যালয়ে ঝুঁকি মূল্যায়ন, এরপর অনুমোদন কমিটির সিদ্ধান্ত। বন্ধ কারখানার জন্য নতুন করে ৪১ হাজার কোটি টাকা বিতরণের ক্ষেত্রে এই ধাপগুলো কতটা দ্রুত ও যথাযথভাবে সম্পন্ন হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। কারণ ঋণ দেওয়া সহজ, কিন্তু সেই অর্থে উৎপাদন শুরু করে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি করা কঠিন। তহবিলটির সাফল্য শেষ পর্যন্ত সেখানেই নির্ভর করবে। 

একসময় দুই হাজারের বেশি কারখানা ছিল, এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে আটশর ঘরে। এই পতন শুধু শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমার ঘটনা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের নানা সংকট ও অনিশ্চয়তা। কোনো কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে সাধারণত একটা কারণ থাকে না, একসঙ্গে কয়েকটা কারণ জমা হতে হতে একদিন তালা পড়ে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, ক্রেতার কার্যাদেশ বাতিল হওয়া, ব্যাংকের পুরোনো ঋণ শোধ করতে না পারা— এই সবকিছু একসঙ্গে চলে। ফলে নতুন ঋণ পেলেই কারখানাটি টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

Advertisement
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার এই প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা আসছে ১৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে, বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে। এই ১৭টি ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ব্যাংক একাই ২০ হাজার কোটি টাকা জোগানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা এই তহবিলের সবচেয়ে বড় একক অবদান। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে সোনালীর শাখা নেটওয়ার্ক আর মূলধন সক্ষমতা তুলনামূলক বড়, তাই এই দায়িত্ব নেওয়াটা স্বাভাবিক একটা জায়গা থেকেই এসেছে বলা যায়। তবে ব্যাংকিং খাতের মানুষ হিসেবে আমার কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, তা হলো এত বড় অঙ্কের দায়িত্ব সামলাতে হলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের সক্ষমতাও সেই অনুপাতে বাড়ানো দরকার। এত বড় অঙ্কের অর্থায়নে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি যাচাই ও তদারকি ব্যবস্থাকেও যথেষ্ট শক্তিশালী করতে হবে।

এখন দেখতে হবে, কোন কারখানার আবার উৎপাদনে ফেরার বাস্তব সুযোগ আছে। এ ক্ষেত্রে একটি-দুটি তথ্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। শাখার ঋণ কর্মকর্তারা সাধারণত কারখানার সাম্প্রতিক ব্যাংক লেনদেন, ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ এবং যন্ত্রপাতির অবস্থা দেখে ধারণা করেন। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকা কারখানায় এসব সূচকই দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্রেতার যোগাযোগ কমে, শ্রমিকরা অন্যত্র চলে যান, যন্ত্রপাতিও নষ্ট হতে থাকে। তাই দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা আর সদ্য বন্ধ হওয়া কারখানার ঝুঁকি এক নয়। ঋণ যাচাইয়ের সময় এই পার্থক্যটি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি।

দ্বিতীয় প্রশ্ন, পুরোনো ঋণের কী হবে? এই তহবিলের আলোচনায় এই অংশটা সবচেয়ে কম আসে, অথচ এটাই আসল জটিলতার জায়গা। যেসব কারখানা এর মধ্যেই খেলাপি ঋণের তালিকায় আছে, তাদের নতুন ঋণ দেওয়ার আগে পুরোনো দায় কীভাবে পুনর্গঠন হবে, সেই কাঠামো স্পষ্ট না হলে নতুন টাকাও পুরোনো হিসাবের মধ্যেই আটকে যাবে। একটা কারখানা যদি আগের ঋণের সুদই শোধ করতে না পারে, তা হলে নতুন করে যন্ত্রপাতি সচল করার টাকা কীভাবে সে ফেরত দেবে? পুরোনো ঋণের সমাধান না করে শুধু সুদ কমালে নতুন অর্থেরও বড় অংশ আগের দায় মেটাতেই চলে যেতে পারে। এখানে একটা বাস্তব পথ হতে পারে পুরোনো দায়ের একটা অংশ পুনঃতফসিলিকরণ করে নতুন ঋণের সঙ্গে যুক্ত করা, যাতে কারখানার মাসিক পরিশোধের বোঝা একসঙ্গে দুই দিক থেকে না আসে। পুরোনো দায়ের সঙ্গে নতুন ঋণের হিসাব না মেলালে এই অর্থায়ন থেকে স্থায়ী ফল পাওয়া কঠিন হবে। 

গ্যাস আর বিদ্যুতের প্রশ্নটাও এখানে সরাসরি ঋণঝুঁকির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। একটা কারখানা নতুন ঋণ নিয়ে যন্ত্রপাতি চালু করলেও যদি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি না পায়, তা হলে উৎপাদন শুরু হবে না, নগদ প্রবাহও তৈরি হবে না। নগদ প্রবাহ ছাড়া ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও থাকে না। এভাবে আজকের নতুন ঋণ কয়েক মাসের মধ্যে আবার খেলাপি ঋণের তালিকায় যোগ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। জ্বালানি সরবরাহের একটা স্পষ্ট সময়সূচি প্রকাশ না হলে এই ঝুঁকি এড়ানো কঠিন। ব্যাংকের হিসাবেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারখানা যদি নিয়মিত উৎপাদনই করতে না পারে, তা হলে ঋণ পরিশোধের টাকা আসবে কোথা থেকে? এটা না থাকলে যতই কাগজে জামানত রাখা হোক, ঋণের প্রকৃত নিরাপত্তা তৈরি হয় না।


আমার মতে, এই তহবিলের আসল পরীক্ষা হবে বিতরণের প্রথম ছয় মাসে। কারণ শুরুতে যদি যাচাই শিথিল হয়ে যায়, সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ বিতরণ হয়, তা হলে বাকি সময়টাও একই পথে চলবে। উল্টোদিকে শুরুতে যদি যাচাই খুব কঠোর হয়ে যায়, তা হলে প্রকৃত সম্ভাবনাময় কারখানাগুলোও ভয়ে আবেদন করা থেকে পিছিয়ে যেতে পারে। এই দুইয়ের মাঝে একটা ভারসাম্য খুঁজে বের করাই এখন অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় কাজ। এই ভারসাম্য ধরে রাখতে নিয়মিত স্বাধীন নিরীক্ষা ও অগ্রগতি প্রকাশের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে বোঝা যাবে, অর্থ পাওয়া কারখানাগুলোর কতগুলো বাস্তবে উৎপাদনে ফিরেছে। এই ধরনের নিয়মিত প্রতিবেদন ছাড়া মাঝপথে সংশোধনের সুযোগ থাকবে না।

স্থানীয় উদাহরণ থেকে একটা কথা বলা যায়— আদমজী ইপিজেডে একটা প্রতিষ্ঠান লিড গোল্ড সনদ ধরে রেখে বছরে প্রায় ৯৮ মিলিয়ন ডলারের রফতানি চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়নি, কারণ তারা ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক আর সনদ দুটোই ধরে রেখেছিল। অর্থাৎ কারখানা চালু রাখার জন্য শুধু যন্ত্রপাতি ও অর্থ থাকলেই হয় না, বাজার এবং ক্রেতার আস্থাও ধরে রাখতে হয়। যে কারখানা এই যোগাযোগ হারিয়েছে, তার জন্য শুধু টাকা যথেষ্ট নয়। তাকে নতুন করে ক্রেতা খুঁজতে হবে, নতুন করে সনদ নবায়ন করতে হবে, নতুন করে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে হবে। এই প্রক্রিয়াটা কোনো ঋণের কিস্তির সঙ্গে মিলিয়ে চলে না, এর নিজস্ব একটা সময়রেখা আছে।

বাইরের প্রতিযোগিতার চাপও কম নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি সাম্প্রতিক চাপে পড়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ভারতসহ কয়েকটি দেশ দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেশি প্রবৃদ্ধি করছে। সময় যত যাবে, হারানো বাজার ফিরে পাওয়া তত কঠিন হবে। তাই তহবিল বিতরণের গতিও গুরুত্বপূর্ণ। ধীরে চললে ঝুঁকি কমবে, কিন্তু বাজার হারানোর আশঙ্কা বাড়বে। আবার দ্রুত ঋণ দিলে বাজার ধরে রাখা সহজ হবে, তবে ঝুঁকিও বাড়বে। তাই ব্যাংকগুলোকে দ্রুত ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকির জায়গাগুলোও এড়িয়ে চলতে হবে।

শেষ কথা হলো, এই তহবিল ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী পদক্ষেপ। তবে এর সাফল্য তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে— ঝুঁকি যাচাই কতটা ঠিকভাবে করা যায়, পুরোনো ঋণ কতটা বাস্তবসম্মতভাবে পুনর্গঠন করা যায় এবং জ্বালানি সরবরাহ কতটা সময়মতো নিশ্চিত করা যায়। এর যেকোনো একটিতে সমস্যা হলে পুরো উদ্যোগই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। ৬০ হাজার কোটি টাকার এই উদ্যোগের আসল সাফল্য নির্ভর করবে কতগুলো কারখানা টেকসইভাবে উৎপাদনে ফিরতে পারল, তার ওপর।


লেখক : অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   ঋণ  বন্ধ  কারখানা 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: