বায়ুদূষণ ও গণপরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন

তানজিম হোসেন

মতামত

ঢাকা শহরের সকাল শুরু হয় হর্নের শব্দে, আর দিনের বড় একটি অংশ কেটে যায় যানজটে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেক

2026-09-04T06:55:26+00:00
2026-09-04T06:55:26+00:00
 
  শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
বায়ুদূষণ ও গণপরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন
তানজিম হোসেন
প্রকাশ: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৫ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ঢাকা শহরের সকাল শুরু হয় হর্নের শব্দে, আর দিনের বড় একটি অংশ কেটে যায় যানজটে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেক নীরব বিপদ— বায়ুদূষণ। রাজধানীর আকাশে ধূলো, ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণার উপস্থিতি এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয় বরং এটি নগরবাসীর স্বাস্থ্য, কর্ম ক্ষমতা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় এই যে বায়ুদূষণ ও গণপরিবহনকে আমরা এখনও দুটি আলাদা সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করি। বাস্তবে এ দুটি সমস্যা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস হলো যানবাহনের ধোঁয়া। রাস্তায় বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ি, পুরোনো বাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেলের পাশাপাশি যানজটে দীর্ঘ সময় ইঞ্জিন চালু থাকার কারণে বায়ুতে ক্ষতিকর দূষক বাড়ছে। অন্যদিকে গণপরিবহন ব্যবস্থা যদি আরামদায়ক, নিরাপদ, সময়সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য না হয়, তা হলে মানুষ বাধ্য হয় ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে। ফলে সড়কে গাড়ির সংখ্যা বাড়ে, যানজট বাড়ে, জ্বালানি পোড়ে এবং বায়ুদূষণও তীব্র হয়। অর্থাৎ একটি সমস্যাকে অন্যটি আরও গভীর করে তুলছে।

Advertisement
বাংলাদেশে বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় ঢাকা ও সিলেটের বিভিন্ন দূষণপ্রবণ এলাকার ১২,২৫০ মানুষের মধ্যে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ঢাকার ক্ষেত্রে গবেষণাটি বিশেষভাবে স্থায়ী যানজট, নির্মাণকাজ ও যানবাহনের চাপ রয়েছে এমন এলাকাগুলোকে বিবেচনায় নেয়।

সমীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঢাকার নির্মাণ ও যানবাহনপ্রবণ এলাকাগুলোতে পিএস-২.৫-এর মাত্রা হুর নির্দেশিত মাত্রার তুলনায় গড়ে প্রায় ১৫০ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়। একই গবেষণায় এসব এলাকায় বসবাসকারী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে বায়ুদূষণের একটি সুস্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

বিশ্বব্যাংকের ওই গবেষণা অনুযায়ী, হু-এর নির্দেশিত মাত্রার ওপরে চগ ২.৫-এর সংস্পর্শ ১ শতাংশ বাড়লে শ্বাসকষ্টের আশঙ্কা ১২.৮ শতাংশ এবং ভেজা কাশির আশঙ্কা ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে। গবেষণায় দূষণের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্কেরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয় বরং সমন্বিত নগর পরিবহন পরিকল্পনা। প্রথমেই ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে মানুষের কাছে সত্যিকারের আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। শুধু নতুন বাস নামালেই হবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত বাস নেটওয়ার্ক, নির্দিষ্ট রুট, নির্ধারিত সময়সূচি, যাত্রী ওঠানামার জন্য নির্দিষ্ট স্টপেজ এবং আধুনিক টিকেটিং ব্যবস্থার। বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় থাকলে একজন যাত্রী সহজেই বাস, মেট্রোরেল কিংবা অন্য গণপরিবহন ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন।

মেট্রোরেল ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে। কিন্তু মেট্রোরেলকে একক সমাধান হিসেবে দেখলে চলবে না। মেট্রো স্টেশন থেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের জন্য কার্যকর ফিডার বাস, হাঁটার উপযোগী ফুটপাথ এবং নিরাপদ সংযোগব্যবস্থা প্রয়োজন। একটি স্টেশন তৈরি করলেই গণপরিবহন ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ হয় না। স্টেশনে পৌঁছানো এবং স্টেশন থেকে গন্তব্যে যাওয়ার ব্যবস্থাটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বায়ুদূষণ কমানোর জন্য পুরোনো ও অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা শুধু কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব বাস, বৈদ্যুতিক যান এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ানো যেতে পারে। তবে নতুন প্রযুক্তির যানবাহন আনার পাশাপাশি সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, চার্জিং অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়টিও পরিকল্পনায় রাখতে হবে।

শুধু যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করলেই বায়ুদূষণ পুরোপুরি কমবে না। ঢাকার নির্মাণকাজ, রাস্তার ধুলা, অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি এবং উন্মুক্তভাবে নির্মাণসামগ্রী পরিবহনও দূষণের বড় উৎস। তাই পরিবহন পরিকল্পনার সঙ্গে নির্মাণ ও নগর ব্যবস্থাপনাকেও যুক্ত করতে হবে। নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে পরিবহন, রাস্তা পরিষ্কার রাখা এবং খোঁড়াখুঁড়ির পর দ্রুত সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি।

এখানে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রশাসনিক সমন্বয়। ঢাকার পরিবহন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে একাধিক সরকারি সংস্থা জড়িত। কিন্তু প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান যদি নিজ নিজ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় না থাকে, তা হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। তাই একটি সমন্বিত নগর পরিবহন ও বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে পরিবহন, পরিবেশ, সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নগর পরিকল্পনার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেবে।

এর পাশাপাশি প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। কোথায় সবচেয়ে বেশি যানজট হচ্ছে, কোন এলাকায় বায়ুদূষণ বেশি, কোন রুটে গণপরিবহনের চাহিদা বেশি— এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে বাস রুট, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত পদক্ষেপ নির্ধারণ করা উচিত।

ঢাকার বায়ুদূষণ ও গণপরিবহন সংকট কোনো এক দিনে তৈরি হয়নি। তাই একক কোনো প্রকল্প দিয়েও এর সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবভিত্তিক এবং সমন্বিত পরিকল্পনা। এমন একটি ঢাকা আমাদের প্রয়োজন, যেখানে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করেও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারবে এবং যেখানে উন্নত গণপরিবহন পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু আমরা কীভাবে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাব, তা নয়; প্রশ্ন হলো আমরা কেমন শহরে বাঁচতে চাই। পরিচ্ছন্ন বাতাস, নিরাপদ সড়ক এবং কার্যকর গণপরিবহন কোনো বিলাসিতা নয় বরং একটি বাসযোগ্য শহরের মৌলিক অধিকার। তাই ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনাকে যদি সত্যিই টেকসই করতে হয়, তবে সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি মানুষের চলাচল ও নির্মল বাতাসের অধিকারকেও পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে পরিবহন ও পরিবেশকে আলাদা করে নয়, একই পরিকল্পনার দুই অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   বায়ুদূষণ  গণপরিবহন  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: