আমাদের দেশে ঋণখেলাপি কারা। নিশ্চয়ই সাধারণ মানুষ না। হিসাব অনুযায়ী অধিকাংশ খেলাপি ঋণের হোতা মূলত ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যবসায়ী, অসাধু সিন্ডিকেট। হাসিনা সরকারের আমলে এটা বেশি সক্রিয় ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের মানুষ যে প্রত্যাশা করেছিল তা আপাতত শঙ্কার মুখে রয়েছে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়। এই পরিমাণ অর্থ দেশের অর্থনীতির জন্য এক ভয়ংকর সংকেত, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে হুমকির মুখে ফেলছে। সে কারণে বিষয়টি দেশের মানুষের জন্য শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়— মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে। মার্চের শেষে যেখানে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, সেখানে জুনের শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকায়। এর ফলে মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২.৭৮ শতাংশে। অর্থাৎ দেশের প্রতিটি তিন টাকার ঋণের মধ্যে এক টাকারও খেলাপি বা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু ব্যাংকের জন্য নয়, পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে ঋণের অনাদায়ী অবস্থায় ঝুলে থাকা ঋণগুলোকে নতুন করে শ্রেণিকরণ, রাজনৈতিক স্বার্থের আধিক্য, বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও সুশাসনের অভাব এই সংকটের মূল কারণ। এ ছাড়া দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক মন্দা ও আয় কমে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী সময়মতো কিস্তি দিতে পারছেন না। এসব মিলিয়ে এক ভয়ংকর শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর মূলধন, সঞ্চিতি ও লিকুইডিটির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রধান সমস্যা হলো, মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশ বা প্রতি তিন টাকার মধ্যে এক টাকা এখন খেলাপি বা ঝুঁকির মুখে। এর ফলে ব্যাংকগুলো তাদের পরিচালন খরচ, ঋণ বিতরণ ও মূলধন সংরক্ষণে বাধা পেয়ে যাচ্ছে। প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির জন্য বড় অঙ্কের অর্থ আলাদা করতে হয়, যা ব্যাংকের নিট মুনাফা কমিয়ে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারে, যা দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই খেলাপি ঋণের দুষ্টচক্র থেকে বের হতে হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা, ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত ও শাস্তি দেওয়া, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। পাশাপাশি ঋণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করলে এই সংকটের সমাধান সম্ভব।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এই খেলাপি ঋণের মহামারি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বড় বাধা। এর মোকাবিলায় আন্তঃশাসন, আইনি ব্যবস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। না হয় দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি অস্থিতিশীলতার মুখে পড়তে পারে। তাই এখনই সময় সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। ব্যাংকি খাতের মূল এ সমস্যা নিরসনে বর্তমান সরকার শিগগির কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই সময়। আমাদের অর্থনৈতিক অস্থিরতার জন্য বৈশ্বিক যুদ্ধগুলো অনেকাংশেই দায়ী। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি অনেক দিন ধরেই দেশে সক্রিয় রয়েছে মুনাফালোভী একাধিক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। তবে আশার কথা এই যে, সরকার এসব বিষয় আমলে নিয়েছে। সেই সঙ্গে সংকট উত্তরণে সম্প্রতি ত্বরিত কিছু ব্যবস্থাও নিয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বর্তমান সংকট ধীরে ধীরে কেটে যাবে এবং দেশের অর্থনীতিতে ফের বইতে শুরু করবে সুবাতাস।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা