ডিজিটাল খাঁচায় আধুনিক দাসত্ব

আমানুর রহমান

মতামত

জর্জ অরওয়েলের কালজয়ী উপন্যাস ‘১৯৮৪’-এর পাতা উল্টালে যে কয়েকটি ভয়ংকর বাক্য পাঠকের মস্তিষ্কে গেঁথে যায়, তার মধ্যে অন্যতম হলো—‘যুদ্ধই শান্তি,

2026-09-04T06:51:36+00:00
2026-09-04T06:51:36+00:00
 
  শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
ডিজিটাল খাঁচায় আধুনিক দাসত্ব
আমানুর রহমান
প্রকাশ: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫১ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
জর্জ অরওয়েলের কালজয়ী উপন্যাস ‘১৯৮৪’-এর পাতা উল্টালে যে কয়েকটি ভয়ংকর বাক্য পাঠকের মস্তিষ্কে গেঁথে যায়, তার মধ্যে অন্যতম হলো—‘যুদ্ধই শান্তি, দাসত্বই স্বাধীনতা, অজ্ঞতাই শক্তি।’ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন চারপাশের বাস্তবতার দিকে তাকাই, তখন মনে হয় অরওয়েল কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করেননি; বরং আমাদের বর্তমানকেই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নথিভুক্ত করে গেছেন।

প্রাত্যহিক জীবনে আমরা নিজেদের অত্যন্ত স্বাধীন ও আধুনিক মনে করলেও বাস্তবে ধীরে ধীরে অথচ সুনিশ্চিতভাবে এক অদৃশ্য দাসত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ হচ্ছি। ফ্রাঞ্জ কাফকার গল্পের চরিত্রের মতোই আমরা এক রাতে হঠাৎ পোকায়

Advertisement
পরিণত হইনি বরং প্রতি দিনের অভ্যাসে নিজেদের অস্তিত্বকে একটু একটু করে বিলীন করে দিচ্ছি।

অতীতে দাসপ্রথা যখন প্রচলিত ছিল, তখন দাসরা অন্তত এই কঠোর সত্যটি জানত যে তারা পরাধীন। কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে ভয়ের দিকটি হলো, আমরা দাসত্বের নিগড়ে বন্দি থেকেও নিজেদের সম্পূর্ণ স্বাধীন মনে করি। হাতের স্মার্টফোন বা প্রযুক্তিপণ্যগুলোকে আমরা সুবিধার হাতিয়ার ভাবি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এগুলোই হলো আধুনিক যুগের ‘বিগ ব্রাদার’ বা সর্বদ্রষ্টা শাসকের প্রতীক। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬ ঘণ্টা ৫১ মিনিট স্ক্রিনের সামনে কাটান। ঘুমের ৮ ঘণ্টা বাদ দিলে যা আমাদের জাগ্রত জীবনের প্রায় ৪২ শতাংশ সময়ের সমান। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কিছু দেশে এই সময় বেড়ে ৯ ঘণ্টা ২৪ মিনিট পর্যন্ত গড়ায়। এই পরিসংখ্যান কেবল কোনো সংখ্যা নয় বরং আমাদের ডিজিটাল বন্দিদশার চূড়ান্ত প্রমাণ।

ডিজিটাল এই খাঁচার পেছনে যে অদৃশ্য অর্থনীতি কাজ করে তা মূলত আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য বা ডেটার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। বিশাল প্রযুক্তি কোম্পানি ও ধনকুবেররা আমাদের পছন্দ, অপছন্দ, অবস্থান ও আচরণের প্রতিটি মুহূর্ত নজরদারিতে রেখে সেগুলোকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরিত করছে। এই ব্যবস্থায় আমরা কেবল গ্রাহক নই, আমরাই তাদের পণ্য। তথ্যের এমন অবাধ আহরণের ফলে গোপনীয়তার ধারণাটি আজ সম্পূর্ণ বিলুপ্তির পথে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেটা চুরি বা সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের যে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই এক বছরে প্রায় ৩৫ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ডেটা লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন।

এ ছাড়া কিছু বড় ডেটা চুরির ঘটনায় প্রায় ২৯০ কোটি রেকর্ড বা তথ্য হ্যাকারদের দখলে চলে গেছে; যার মধ্যে কোটি কোটি মানুষের ই-মেইল ও ব্যক্তিগত পরিচয়পত্রের তথ্য রয়েছে।

কেবল তথ্য চুরিই নয়, এই অ্যালগরিদমগুলো আমাদের মনস্তত্ত্বকেও গভীরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। কারণ আমাদের হাতে প্রযুক্তি তুলে দেওয়া হয়েছে ঠিকই কিন্তু এর সঠিক ও সচেতন ব্যবহার শেখানো হয়নি। ফলে আমরা এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতায় ভুগছি, যেখানে সত্য ও মিথ্যার সীমানা সহজেই মুছে যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যেন আমরা ক্রমাগত স্ক্রল করতে থাকি এবং নিজেদের সমালোচনামূলক চিন্তার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। নিয়ন্ত্রণের এই অন্ধকার দিকটি আরও স্পষ্ট হয় সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতার দিকে তাকালে। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪২ কোটি ৯০ লাখ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে, যা ভুক্তভোগীদের বিপুল আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হয়েছে। এর মানে হলো যে ডিজিটাল দুনিয়া আমাদের এত আনন্দ দেয়, তার ভিত্তি অত্যন্ত নাজুক। আমরা কি ধীরে ধীরে এমন কোনো বিজ্ঞান কল্পকাহিনির দিকে এগোচ্ছি, যেখানে মানুষের মাথায় প্রযুক্তির যন্ত্র জুড়ে দিয়ে তাকে কেবল ভোগবাদী পশুতে পরিণত করা হচ্ছে।

জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে নায়ক উইনস্টন স্মিথকে ‘বিগ ব্রাদার’-এর প্রতি ভালোবাসা অনুভব করতে বাধ্য করা হয়, যা ছিল মানবিক স্বাধীনতার চূড়ান্ত পরাজয়। আজকের প্রজন্মের জন্যও কি এই পরিণতি অনিবার্য? একেবারেই না— যদি আমরা এখনই এই ডিজিটাল মোহনিদ্রা থেকে জেগে ওঠার সিদ্ধান্ত নিই। এই সংকট সমাধানের প্রথম ধাপ হলো— আমরা যে একটি অদৃশ্য নজরদারির যুগে বাস করছি, তা স্বীকার করে নেওয়া। তবে আমাদের লক্ষ্য প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ বর্জন করা নয় বরং এর সঙ্গে একটি সচেতন ও পরিমিত সম্পর্ক গড়ে তোলা।

স্ক্রিন টাইম কমানো, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বাস্তব জগতে মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমেই আমরা এই ডিজিটাল দাসত্ব থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পেতে পারি। মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা কারও দেওয়া উপহার নয়; এটি প্রতি দিনের সচেতন সংগ্রামের ফসল। আসুন, আমরা আমাদের মন ও মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় নিজেদের হাতে তুলে নিই। কারণ প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে মানুষের সেবা করার জন্য, মানুষকে প্রযুক্তির দাস বানানোর জন্য নয়।

শিক্ষার্থী, স্নাতক
হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজ, ঢাকা
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   ডিজিটাল খাঁচা  আধুনিক দাসত্ব  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: