যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ইসরাইল ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এ পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর মাধ্যমে ইরানকে সতর্ক করে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধরিরতি চুক্তি ঠেকাতে না পেরে ইসরাইল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অসহযোগিতা করাসহ বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতি দেওয়া শুরু করে।
ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের ওপর যৌথ আগ্রাসনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ ৩০ জন কর্মকর্তাকে হত্যা করার পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে ইরানের আইআরজিসি, ইরাকের আইআরআই, ইয়ামেনের হুথি বিদ্রোহীগোষ্ঠী, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও বিভিন্ন দেশের শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তীব্র প্রাণনাশের হুমকি ও প্রতিশোধের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। আর ইসরাইলের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চাপ।
‘ইরানের ভয়ে খাবারের কার্টে লুকিয়ে সামরিক বিমানে উঠে তুরস্ক ছাড়েন ট্রাম্প’— শিরোনামে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্ট ১১ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ৭-৮ জুলাই, ২০২৬ তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলন শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গোপনে দেশটি থেকে সরিয়ে নেয় হোয়াইট হাউস।
পরবর্তী সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন— ‘আমেরিকার অনেক শত্রু তাকে টার্গেট বানিয়েছে। এসব হুমকি মোকাবিলায় আমরা আমাদের হাতে থাকা সব ধরনের উপায় ব্যবহার করি’। তা হলে প্রশ্ন থেকেই যায় যে, ইরানের সঙ্গে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ থেকে চলা যুদ্ধ ৮ এপ্রিল, ২০২৬ দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি হলেও ট্রাম্প এ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করল কেন?
ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘ ৬ মাস ধরে যুদ্ধ থেমে থেমে চালিয়ে যাওয়ার কারণ কি তা হলে ইরানের মৃত্যুর হুমকি, নাকি ইসরাইলের ক্রমাগত চাপ; নাকি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় অস্ত্র ফুরিয়ে গেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মজুদের একটা বড় অংশ ইতিমধ্যে ব্যবহার করা হয়ে গেছে।
ইরানের কাছে বর্তমান কী পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ আছে তার কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই বলে জানিয়েছে চ্যাথাম হাউস নামক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলার পরও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার ৭৫ শতাংশের বেশি অক্ষত আছে বলে দাবি করছে ইরান। ইরানের ড্রোন ব্যবস্থা যেন শত্রুর জন্য দিন দিন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়ে উঠছে।
ইরানের রেজিম চেঞ্জ করার লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলা ও রেজা শাহ পাহলভির সমর্থন কোনোটাই কাজে আসেনি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু- পরবর্তী রাষ্ট্রীয় জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠান যার বাস্তব প্রমাণ। ইরানিদের আত্মত্যাগ ও শহিদ নেতাদের আদর্শের প্রতি আনুগত্য স্বীকারকারী জনগণ প্রতিশোধের স্লোগান ও ঐক্যের বার্তা নিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ মিছিলসংলিত তেহরানের রাজপথকে লাখ লাখ শোকার্তদের জনসমুদ্রে পরিণত করে ইরানের সবাইকে এক কাতারে শামিল করেছে।
বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কুরআনের আয়াত তেলাওয়াতের বাণী শোনানো যেন তাদের মুখে চপেটাঘাতের মতো কাজ করেছে। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কফিন তেহরান, কোম, মাশহাদসহ ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় শোকযাত্রার জন্য নেওয়া হয়। দীর্ঘ ৬ দিনের শোকানুষ্ঠানে ইরান ও ইরাকের লাখ লাখ শিয়া জনগোষ্ঠীকে এক কাতারে শামিল করেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ ৩০ শীর্ষ নেতার মৃত্যু, ২০২০ সালে বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানি ও ইরাকি কমান্ডার আবু মাহদি আল-মুহাদ্দিস নিহতের প্রতিশোধ হিসেবে ইরাকের ইরানপন্থি সশস্ত্রগোষ্ঠী ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক (আইআরআই) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যা করতে পারলে ১ কোটি মার্কিন ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাদের হত্যার দায় প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে। ইরান তাদের নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও কাসেম সোলেইমানি হত্যার প্রতিশোধ নিতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খোমেনি ও বিভিন্ন দেশের শিয়া-মিলিশিয়া গোষ্ঠী ট্রাম্পকে তাদের ‘হিট লিস্টে’ এক নম্বরে রেখে হত্যার জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা দিয়েছে। তেহরানের ইনকিলাব চত্বরে বিশাল মার্কিনবিরোধী বিলবোর্ডে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একটি কফিনে শোয়ানো অবস্থায় দেখানো হয়েছে এবং ফারসি ভাষার লেখা হয়েছে— আমরা ট্রাম্পকে হত্যা করব।
ইরান ও ইরাক আলাদাভাবে ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি দিলেও কার্যত এখন পর্যন্ত তারা সফল হতে পারেনি। তারা হত্যার কোনো চেষ্টা করেছে বলে মনে হচ্ছে না। ‘ইরানের ভয়ে খাবারের কার্টে লুকিয়ে সামরিক বিমানে তুরস্ক ছাড়েন ট্রাম্প’ খবরের শিরোনাম হলেও ইরানের ট্রাম্প হত্যার পরিকল্পনার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের হত্যার অভিজ্ঞতা ইসরাইলের রয়েছে বলে অনেকে অভিযোগ করেন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরাইল কোনোভাবেই মেনে নেয়নি। যুদ্ধে আসক্ত ইসরাইল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভাঙতে সর্বদা বদ্ধপরিকর।
যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ইসরাইল ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এ পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর মাধ্যমে ইরানকে সতর্ক করে। পরে এ হত্যা পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধরিরতি চুক্তি ঠেকাতে না পেরে ইসরাইল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অসহযোগিতা করাসহ বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতি দেওয়া শুরু করে। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। এমনকি হত্যার হুমকিও দিয়েছে বলে বিভিন্ন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দ্বন্দ্ব শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে জন এফ কেনেডির ২০ জানুয়ারি, ১৯৬১ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে। ইসরাইলের দক্ষিণে নেগেভ মরুভূমির মধ্যখানে ডিমোনো নামক স্থানে ফ্রান্সের সাহায্যে পারমাণবিক চুল্লি বানানোকে কেন্দ্র করে।
তৎকালীন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ন পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন— ‘এটা আমরা বিদ্যুৎ ও গবেষণার জন্য ব্যবহার করব শান্তিপূর্ণ উপায়ে’। জন এফ কেনেডি এটা বিশ্বাস করলেন না। তিনি স্পষ্ট করে এক বক্তৃতায় বলেন যে— ‘আমি ইসরাইলি নেতৃত্বকে স্পষ্ট করে জানিয়েছি যে, তাদের সম্প্রসারণবাদী ধারণাকে আমি সমর্থন করি না। ওই ভূখণ্ডের আদিবাসী মানুষের এমন অধিকার আছে যেগুলো উপেক্ষা করা যায় না। আমাদের এমন একটি ন্যায্য সমাধান খুঁজে বের করতে হবে, যা কোনো একক গোষ্ঠীর ইচ্ছায় চাপিয়ে দেওয়া হবে না।’
জন এফ কেনেডি দায়িত্ব গ্রহণের ৮ মাসের মাথায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দাঁড়িয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিপক্ষে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার নিমিত্তে বক্তব্য প্রদান করেন। এভাবে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েনের মধ্যে ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর জন এফ কেনেডি এক আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তার নিহতের ঘটনায় ইসরাইলের হাত আছে বলে অনেক অভিযোগ দেখতে পাওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইসরাইলের এজেসির মাধ্যমে বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডকে রবার্ট এফ কেনেডি সমর্থন করতেন না। জন এফ কেনেডির মৃত্যুর পর পরবর্তী প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বেইন্স জনসন ক্ষমতায় আসার পর ওই বিষয়টি একেবারে ধামাচাপা পড়ে যায়। রবার্ট এফ কেনেডি ৫ জুন, ১৯৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের প্রেসিডেন্ট প্রাথমিক নির্বাচনে জয়লাভ করেন। একই দিন রাতে লস অ্যাঞ্জেলেসের অ্যাম্বাসেডর হোটেলে বিজয়ী ভাষণ দেওয়ার পর তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাকে হত্যা করা না হলে তিনিই হতেন পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তার হত্যার পেছনে মূল কারিগর হলো ইসরাইল বলে অনেকে অভিযোগ দেয়।
ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পও আজ সেই জন এফ কেনেডি ও রবার্ট এফ কেনেডির বাস্তবতার মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দিন দিন সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইতালিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইরানে হামলা করার কখনো পক্ষপাতী না। তারা প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে না বলে ঘোষণা করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাদের চাপে পড়ে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছেন। ইসরাইল এ চুক্তির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আগ্রাসনবাদী চিন্তা ও মধ্যপ্রাচ্য দখল করে গ্রেটার ইসরাইল হওয়ার স্বপ্নে তারা বিভোর হয়ে পড়েছে। তারা ট্রাম্পের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইরানের ওপর থেমে থেমে হামলা করছে আবার আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে হত্যার হুমকির পাশাপাশি ইসরাইলও যে ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে না সেটা বলা অত্যন্ত মুশকিল হয়ে পড়েছে। তবে ট্রাম্পের বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন যে শুধু চাপ নয় অনেকটা মৃত্যুর ভয় সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!
লেখক : প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ রোভারপল্লী ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে