আন্তর্জাতিক স্তরে তৈরি হওয়া এই বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশকে চরম আর্থিক ও সামাজিক বোঝা বহন করতে হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী ঐতিহাসিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের ভূমিকা প্রায় শূন্যের কোঠায়— মাত্র ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের মতো। অথচ এর চরম খেসারত দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত ওপরের সারিতে অবস্থান করতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের বাস্তবতাকে এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা শিল্পায়নের পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার সংগ্রামটি আর কোনো সাধারণ পরিবেশগত এজেন্ডা নয় বরং এটি সরাসরি ‘মানবতার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’।
বিশ্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আগামী মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এই বিপজ্জনক ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করার উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) নতুন মূল্যায়ন প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করা হয়েছে যে, ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্যারিস চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণের যে লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল বিশ্ব তা থেকে স্পষ্টভাবে বিচ্যুত হতে চলেছে।
বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন নতুন নতুন রেকর্ড ভেঙে চলা তীব্র তাপপ্রবাহ, নজিরবিহীন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বিধ্বংসী বন্যা এবং ধ্বংসাত্মক উপকূলীয় ঝড়প্রবাহ প্রমাণ করে যে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর দূরবর্তী কোনো বৈজ্ঞানিক ধারণার বিষয় নয় বরং তা মানব সভ্যতার জন্য এক চরম বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা।
এই চরম বৈশ্বিক ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বা কার্যকর সমাধানের কোনো অভাব কিন্তু বিশ্বে নেই। বিগত কয়েক দশক ধরেই বিশ্বমানের জলবায়ু বিজ্ঞানীরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য দিয়ে আসছেন। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য শক্তি প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে দ্রুত গতিতে এবং নীতিগত নানা কৌশলও রাষ্ট্রগুলোর হাতে রয়েছে।
কিন্তু আসল ঘাটতিটি তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক সংকল্প ও ইচ্ছাশক্তিতে। বিশ্ব যা করণীয় বলে মানুষ বিজ্ঞানসম্মতভাবে জানে এবং যা বাস্তবে অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়— এই দুইয়ের মাঝে একটি বিশাল নীতিগত ব্যবধান রয়ে গেছে।
১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নির্ধারিত সীমাটি কখনোই কোনো কাল্পনিক বা পছন্দসই সংখ্যা ছিল না। এটি মূলত এমন একটি পরিবেশগত সীমা যা অতিক্রম করলে পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থা অনিয়ন্ত্রিত ও চরম বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এর ওপরে উষ্ণতার প্রতি অতিরিক্ত সামান্য বৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া বৈচিত্র্য ধ্বংস করবে, ছোট ছোট দ্বীপরাষ্ট্র এবং নিচু উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে নিমজ্জনের দিকে ঠেলে দেবে। একই সঙ্গে মানবস্বাস্থ্য, বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা, সুপেয় পানির সংস্থান ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর এমন অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হবে যা আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রকাশিত সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়টি ছিল এযাবৎকালের ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম এগারোটি বছর। বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের তাপধারণ ক্ষমতা নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে এবং ১৯৯৩ সালের ভিত্তিরেখার তুলনা করলে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ১১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর পাশাপাশি প্রতি বছর বিশ্বের একশ বিশ কোটিরও বেশি শ্রমজীবী মানুষ মাত্রাতিরিক্ত তাপজনিত তীব্র চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন যা সরাসরি তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক শ্রম উৎপাদনশীলতায় বড় ধস নামাচ্ছে। পরিবেশ সম্পর্কিত ইউএনইপির নতুন ‘এমিশনস গ্যাপ রিপোর্ট’—এ সতর্ক করা হয়েছে যে, বর্তমানে বিভিন্ন রাষ্ট্র যে পরিমাণ কার্বন নির্গমন কমানোর অঙ্গীকার করেছে, তা যদি শতভাগ বাস্তবায়িতও হয় তবুও এই শতাব্দী শেষে পৃথিবীর তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে ২.৩ থেকে ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। অথচ জলবায়ুর সম্ভাব্য চরম বিনাশ এড়াতে এবং সুস্থ পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন ২০১৯ সালের মাত্রার চেয়ে অন্তত ৫৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে।
বিশ্বের সার্বিক এই পরিস্থিতিতে সর্বাপেক্ষা দ্রুত গতিতে ইতিবাচক ফল পাওয়ার একটি ক্ষেত্র হতে পারে মিথেন গ্যাস নির্গমন রোধ করা। ‘গ্লোবাল মিথেন প্লেজ’-এর আওতায় ১৫০টিরও বেশি দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে মিথেন নির্গমন অন্তত ৩০ শতাংশ কমানোর অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে এর অগ্রগতি থমকে আছে নগণ্য স্তরে। মিথেন নির্গমন কমানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হলে প্রতি বছর জনস্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে শত শত কোটি ডলারের অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি রক্ষা করা যেত।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, জলবায়ু সংকটের প্রধান চালিকাশক্তি কয়লা, অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি এখনও বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের কেন্দ্রে রাজত্ব করছে। বিশ্বনেতারা বিশ্বমঞ্চে বড় বড় বক্তৃতা দিলেও নিজ দেশে নতুন নতুন জীবাশ্ম জ্বালানি অবকাঠামো অনুমোদন দিয়ে চলছেন, যা আগামীর ভবিষ্যৎকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক স্তরে তৈরি হওয়া এই বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশকে চরম আর্থিক ও সামাজিক বোঝা বহন করতে হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী ঐতিহাসিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের ভূমিকা প্রায় শূন্যের কোঠায়— মাত্র ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের মতো। অথচ এর চরম খেসারত দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত ওপরের সারিতে অবস্থান করতে হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ক্লাইমেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আবহাওয়াগত পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বার্ষিক গড় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি। দেশের সিংহভাগ ভৌগোলিক এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র কয়েক মিটার উঁচুতে অবস্থান করায় এবং উপকূলবর্তী নদীনালা ও জলাভূমি বিস্তৃত থাকায় বাংলাদেশের ঝুঁকি আরও তীব্র রূপ ধারণ করে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বর্ধিত বৃষ্টিপাতের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের কৃষি জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
শুধুমাত্র বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাতেই বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ঘটে চলেছে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রমাগত লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে কৃষিজমি নিষ্ফলা হয়ে পড়ছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য পানীয় জলের তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ খোলা আকাশের নিচে কাজ করা কোটি কোটি মেহনতি শ্রমিকের দৈনিক আয় কমিয়ে দিচ্ছে এবং নদীভাঙন ও আকস্মিক বন্যা ক্রমাগত হাজার হাজার পরিবারকে বাস্তুচ্যুত করে গৃহহীন বানিয়ে তুলছে। একটি ক্রমবর্ধমান উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি কেবল পরিবেশগত কোনো সমস্যা নয় বরং এটি দারিদ্র্য বিমোচন, প্রবৃদ্ধি অর্জন, অর্থনৈতিক সমতা এবং রফতানি সক্ষমতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এক কঠিন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধক।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এই একই বৈষম্যের চরম প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় যা পরিবেশ নীতিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে উন্নত ও ধনী দেশগুলো অনিয়ন্ত্রিত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে নিজেদের সম্পদ ও শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলেছে, তাদের ঐতিহাসিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করার। ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যে নতুন প্রযুক্তিতে রূপান্তর ও অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হচ্ছে তার ব্যয়ভার বহন করা উন্নত বিশ্বের জন্য কোনো দান-খয়রাত বা দাতব্য কাজ নয়; এটি মূলত একটি বৈশ্বিক সংকটের যৌক্তিক দায় পরিশোধ।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বৈশ্বিক আলোচনা ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ফুটলেও কার্যকর ও শর্তহীন অর্থায়নের সরবরাহ এখনও সবচেয়ে দুর্বল ক্ষেত্র হিসেবে রয়ে গেছে। বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে উন্নত দেশগুলো যে আর্থিক অনুদানের ঘোষণা দিয়ে থাকে তা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অতি নগণ্য এবং তার বড় অংশই আসে ঋণ হিসেবে, যা দরিদ্র দেশগুলোর ওপর ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দিয়ে উল্টো নতুন সংকট তৈরি করে।
জলবায়ু সুরক্ষার উদ্যোগ বাস্তবায়নে কত শত কোটি টাকা খরচ হবে তা ভাবার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা যদি এখন নিষ্ক্রিয় থাকি তবে ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক মহাবিপর্যয় ও পুনর্গঠন ব্যয়ের পেছনে বহুগুণ বেশি চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হবে। পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার মূল বিনাশ এড়াতে আগামী কয়েকটি বছর মানবজাতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।
বিশ্ব সরকারগুলোকে অবিলম্বে মুখের কথা ও সভার সিদ্ধান্তগুলোকে বাস্তবসম্মত রূপ দিতে হবে, জীবাশ্ম জ্বালানির যুগ থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে বাঁচাতে হবে এবং অভিযোজন খাতে আর্থিক বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের লড়াই কেবল একটি কারিগরি সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার গল্প নয়; এটি মানবজাতিকে একটি স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করার লড়াই। মানবতার অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ রক্ষার এই লড়াইয়ে জেতার সময়, অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এখনই।
লেখক : গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/সময়ের আলো