একটি দেশের শক্তি মাপার জন্য আমরা সাধারণত তার কামানের সংখ্যা গুনি, যুদ্ধবিমানের গর্জন শুনি, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা মাপি। কিন্তু খুব কম সময়ই আমরা হিসাব করি—সেই দেশের মানুষের পেটে কত দিনের খাবার আছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমরা সীমান্তের দিকে তাকাই, অথচ ভুলে যাই, একটি ক্ষুধার্ত মানুষের ভেতরেও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম হয়। ক্ষুধা অনেক সময় কামানের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের নাম।
সামরিক শক্তি অবশ্যই রাষ্ট্রের প্রয়োজন। কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রই এমন দুর্বল হতে পারে না যে তার সীমান্ত, সার্বভৌমত্ব কিংবা জনগণের নিরাপত্তা অন্যের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ কোথায় কতটা ব্যয় হবে? একটি ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে যদি আমরা এক হাতে রুটি এবং অন্য হাতে রাইফেল রাখি, সে কোনটিকে বেছে নেবে? রাষ্ট্রের উত্তর আর নাগরিকের উত্তর কি একই হবে?
আমাদের রাষ্ট্রচিন্তায় এই প্রশ্নটি খুব জরুরি। কারণ যুদ্ধ কেবল সীমান্তে হয় না। যুদ্ধ হয় ক্ষেতে, বাজারে, রান্নাঘরে, কর্মস্থলে। কৃষক যখন সার-বীজের দাম সামলাতে পারে না, শ্রমিক যখন দিনের শেষে বাজারের ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিস তুলতে পারে না, নিম্নবিত্ত পরিবার যখন ডিম-মাছ-মাংসের বদলে শুধু চাল আর লবণের হিসাব করে—তখন রাষ্ট্রের নিরাপত্তার আরেকটি অদৃশ্য সংকট তৈরি হয়।
আমরা উন্নত অস্ত্র কিনি। কারণ পৃথিবী নিরাপদ নয়। কিন্তু যে পৃথিবীতে অস্ত্রের বাজার ক্রমশ বড় হয়, সেখানে খাদ্যের বাজারও কি নিরাপদ? জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, মহামারি, সরবরাহব্যবস্থার বিপর্যয় এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাত—সবকিছু মিলিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা এখন আর নিছক কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।
একটি যুদ্ধবিমান আকাশ পাহারা দিতে পারে, কিন্তু সে ধান ফলাতে পারে না। একটি যুদ্ধজাহাজ সমুদ্রসীমা রক্ষা করতে পারে, কিন্তু জেলের নৌকায় মাছ তুলে দিতে পারে না। একটি ক্ষেপণাস্ত্র শত্রুর ঘাঁটি ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু ক্ষুধার্ত শিশুর সামনে একবেলা ভাত রাখতে পারে না। অস্ত্র রাষ্ট্রের বাহু শক্ত করে; খাদ্য রাষ্ট্রের ভিত শক্ত করে।
আমাদের সমস্যা হলো, বাহুর শক্তি সহজে দেখা যায়, ভিতের শক্তি দেখা যায় না। নতুন যুদ্ধবিমান এলে তার ছবি সংবাদপত্রে ছাপা হয়। নতুন যুদ্ধজাহাজ এলে জাতীয় গৌরবের ভাষা তৈরি হয়। কিন্তু দেশের গুদামে কত টন খাদ্য মজুত আছে, কৃষক তার উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে কি না, কৃষিজমি কতটা কমছে, খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা কতটা বাড়ছে—এসব প্রশ্ন নিয়ে আমাদের উত্তেজনা তুলনামূলকভাবে কম।
অথচ ইতিহাস বলে, কোনো সভ্যতা কেবল তরবারির জোরে টিকে থাকে না। রোমের সৈন্য ছিল, মুঘলদের অশ্বারোহী বাহিনী ছিল, ব্রিটিশদের নৌবহর ছিল; কিন্তু প্রতিটি সাম্রাজ্যের পেছনে ছিল খাদ্য, কর, শ্রম ও উৎপাদনের এক বিশাল কাঠামো। সৈন্যকে যুদ্ধ করাতে হলে তার অস্ত্র লাগে, কিন্তু তার চেয়েও আগে লাগে খাবার। রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সবচেয়ে প্রাচীন প্রযুক্তি তাই সম্ভবত কৃষি।
আমরা যদি জাতীয় বাজেটের দিকে তাকাই, তখন প্রশ্নটি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। সামরিক আধুনিকায়ন প্রয়োজন—কিন্তু তার সঙ্গে কৃষি গবেষণা, সেচ, সংরক্ষণ, খাদ্যগুদাম, কৃষিপণ্য পরিবহন, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, পুষ্টি এবং খাদ্য অপচয় রোধে বিনিয়োগও কি একই গুরুত্ব পাচ্ছে? একটি দেশের প্রতিরক্ষা নীতি যদি শুধু অস্ত্রের তালিকা দিয়ে তৈরি হয়, তবে সেটি অসম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা নীতি। কারণ জনগণই রাষ্ট্রের মূল প্রতিরক্ষা-সম্পদ।
এখানে কেউ যেন ভুল না বোঝেন। খাদ্যের কথা বলে সামরিক শক্তিকে অপ্রয়োজনীয় বলা হচ্ছে না। বরং বলা হচ্ছে—সামরিক নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার দিন শেষ। আধুনিক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বহুমাত্রিক। সীমান্ত সুরক্ষিত থাকবে, আকাশ সুরক্ষিত থাকবে, সমুদ্র সুরক্ষিত থাকবে; একই সঙ্গে মানুষের খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও মর্যাদাও সুরক্ষিত থাকবে।
একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে আপনি দেশপ্রেমের বক্তৃতা দিতে পারেন, কিন্তু তার ক্ষুধা মেটাতে হবে খাদ্য দিয়ে। পেটের ক্ষুধা কোনো মতাদর্শ বোঝে না। খালি পেট রাষ্ট্রের পতাকা দেখে তৃপ্ত হয় না। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করতে পারে না, তার উন্নত অস্ত্রভাণ্ডারও একসময় জনগণের কাছে প্রশ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
তাই প্রশ্নটি আসলে ‘সামরিক সরঞ্জাম নাকি খাদ্য’—এত সরল নয়। প্রশ্নটি হলো, রাষ্ট্রের সম্পদ কি এমনভাবে ব্যয় হচ্ছে, যাতে একই সঙ্গে সার্বভৌমত্ব ও নাগরিকের জীবন—দুটিই নিরাপদ থাকে?
আমাদের প্রয়োজন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত সেনাবাহিনী, কিন্তু যুদ্ধের আগেই যেন ক্ষুধার কাছে পরাজিত না হয় জনগণ। প্রয়োজন আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কিন্তু তার পাশে আধুনিক কৃষিব্যবস্থা। প্রয়োজন শক্তিশালী সীমান্ত, কিন্তু তার ভেতরে শক্তিশালী খাদ্যশৃঙ্খল। প্রয়োজন অস্ত্রের মজুত, কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন কৃষকের হাতে বীজ, মাঠে পানি, গুদামে খাদ্য এবং মানুষের ঘরে ভাত।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুর্গ কোনো কংক্রিটের বাঙ্কার নয়—তার মানুষ। সেই মানুষ যদি সুস্থ, শিক্ষিত, কর্মক্ষম ও পরিতৃপ্ত থাকে, তবে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা-প্রাচীরও শক্ত হয়। আর মানুষ যদি ক্ষুধার্ত হয়, তবে সবচেয়ে উঁচু প্রাচীরের ভেতরেও নিরাপত্তাহীনতা বাসা বাঁধে।
আমরা কত টাকা দিয়ে অস্ত্র কিনলাম—এই হিসাব ইতিহাস একদিন ভুলে যেতে পারে। কিন্তু সেই অস্ত্র কেনার সময়ে দেশের মানুষ কতটা নিরাপদ, কতটা পুষ্ট, কতটা মর্যাদার সঙ্গে বেঁচেছিল—ইতিহাস হয়তো সেই হিসাবটাই মনে রাখবে।
অতএব সামরিক সরঞ্জাম অবশ্যই চাই। কিন্তু তার আগে চাই এমন একটি রাষ্ট্র, যার মানুষ ক্ষুধার্ত নয়। কারণ যে রাষ্ট্র তার মানুষের পেট রক্ষা করতে পারে না, সে রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষা করলেও তার নিরাপত্তা সম্পূর্ণ হয় না।
রাষ্ট্রের হাতে বন্দুক থাকুক—অবশ্যই। কিন্তু মানুষের ঘরে ভাতও থাকুক। কারণ একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু তার অস্ত্রাগারে নয়, তার মানুষের পাতে কতটা খাবার আছে—সেখানেও মাপা হয়।
সাইফুল ইসলাম, লেখক ও কলামিস্ট
সময়ের আলো/জেডি