জ্বালানি নিরাপত্তায় বহুমুখী উৎসের বিকল্প নেই

সম্পাদকীয়

মতামত

দেশের অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে জ্বালানি সংকটের অভিঘাত পড়েছে। জ্বালানির অভাবে শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, পরিবহন ব্যয় বাড়ছে ও কৃষিতে

2026-09-07T05:07:49+00:00
2026-09-07T05:07:49+00:00
 
  সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
জ্বালানি সংকটের বহুমাত্রিক অভিঘাত
জ্বালানি নিরাপত্তায় বহুমুখী উৎসের বিকল্প নেই
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:০৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
দেশের অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে জ্বালানি সংকটের অভিঘাত পড়েছে। জ্বালানির অভাবে শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, পরিবহন ব্যয় বাড়ছে ও কৃষিতে সেচের খরচ বাড়ছে। একই কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ হয়েছে ঊর্ধ্বমুখী।

গতকাল সময়ের আলোয় প্রকাশিত ‘জীবনে জ্বালানির জ্বালা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিদ্যুৎ উৎপাদনও চাহিদার তুলনায় ঢের কম। জ্বালানি সংকটের অন্যতম বড় একটি কারণ হচ্ছে— আমদানিনির্ভরতা। দেশের ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। এলএনজি ও ডিজেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে বলেই বহির্বিশ্বের অস্থিরতার কাছে দেশের অর্থনীতিকে অনেক সময় অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়। 

Advertisement
এর সঙ্গে রয়েছে ডলার সংকট। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বা ভূরাজনৈতিক কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের সঞ্চিত বৈদেশিক মুদ্রার ওপর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলার। এক জ্বালানির পেছনেই যদি এত বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয় তা হলে দেশের অর্থনীতি গতি পাবে কীভাবে সেটা একটা প্রশ্ন। জ্বালানি কিনতে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হচ্ছে, আবার ডলারের সংকটে সেই আমদানি নিশ্চিত করাও কঠিন হচ্ছে।

নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর ব্যবহারের কারণে কলকারখানার উৎপাদন খরচ বাড়ছে। তৈরি পোশাক শিল্পে উৎপাদন খরচ বেড়েছে ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাক খাতকে তীব্র প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হয়। উৎপাদন খরচ বাড়লে রফতানি সক্ষমতায় বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। সিমেন্ট, স্টিল, প্লাস্টিক, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও তাঁতশিল্পের মতো খাতও একই চাপে রয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ওপর জ্বালানি সংকটের চাপ আরও বেশি। 

কারণ তাদের পক্ষে দীর্ঘ সময় উচ্চ ব্যয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন। শিল্পে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। প্রয়োজনীয় জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের নিশ্চয়তা না পেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। নতুন বিনিয়োগ না হলে নতুন কর্মসংস্থান হবে না। কর্মসংস্থান না হলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এভাবে তৈরি হয় সংকটের এক দুষ্টচক্র।

জ্বালানি সংকটের কারণে কৃষি খাতও ধুঁকছে। যার প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের বাজারে। বোরো ধানের মৌসুমে সেচের বড় উৎস হচ্ছে— ডিজেলচালিত পাম্প। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে। ইউরিয়া সার উৎপাদনের জন্য চাই গ্যাস। চাহিদামতো গ্যাস না মিললে সার উৎপাদন ব্যাহত হয়। পরিবহন খরচ তো বেড়েছেই। ঘুরেফিরে এসব খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত বইতে হয় কৃষক আর ভোক্তাকে।

নাগরিকরা দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভার বয়ে চলেছেন। জ্বালানি সংকট তাদের কাছে বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়ে হাজির হয়েছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। অনেকের কাজই নেই। কাজ থাকলেও আয় বাড়ছে না। খরচ ঠিকই বাড়ছে। সাধারণ মানুষ তাই শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ে কাটছাঁট করতে বাধ্য হন। জ্বালানি সংকট শেষ পর্যন্ত নাগরিকদের জীবনযাত্রাকেও বিপর্যস্ত করে তোলে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলানো সরকারের জন্য সহজ নয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাসে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ভর্তুকি একেবারে তুলে দেওয়া যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি সবার জন্য একই হারে ভর্তুকি দেওয়াও যুক্তিসংগত নয়। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করে ধীরে ধীরে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি ব্যবস্থায় যাওয়া প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে অপচয় বন্ধ করতে হবে। শিল্প-কারখানায় এনার্জি অডিট বাধ্যতামূলক করা যায় কি না সেটা ভেবে দেখতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি সাশ্রয়ের মানদণ্ড চালু করা যেতে পারে। তবে সাশ্রয়ের নামে উৎপাদন যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আর এটাও মনে রাখতে হবে যে, অপচয় বন্ধ করা জ্বালানি সংকেটর টেকসই সমাধান নয়।

মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণের বিকল্প নেই। বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান করতে হবে। পাশাপাশি সৌর, বায়ু, বায়োগ্যাস ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এলএনজির প্রশ্নে স্পট মার্কেটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে করে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতিকে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে না হয়। সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বর্তমান জ্বালানি সংকট থেকে অদূর ভবিষ্যতে মুক্ত হওয়া সম্ভব বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   জ্বালানি  নিরাপত্তা  সংকট  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: