মি. কিউলমান নামের এক আঁকিয়ে বেগমের ছবি এঁকেছিলেন। ছবি : সংগৃহীত
একসময় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল থেকে সুন্দরবন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিচরণ করত গন্ডার। শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে সেই প্রাণী আজ বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত। এ দেশের শেষ জীবিত গন্ডার হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া ‘বেগমের’ করুণ পরিণতির গল্প জানে না অনেকেই। ব্রিটিশরা মাত্র ৫ হাজার ডলারে বিক্রি করে দিয়েছিল তাকে।
গন্ডার এক ধরনের বৃহৎ তৃণভোজী স্তন্যপায়ী প্রাণী। রাইনোসেরোটিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এই প্রাণী একসময় পৃথিবীর নানা অঞ্চলে বিচরণ করত। বুনো পরিবেশে টিকে থাকা ৫ প্রজাতির গন্ডারের মধ্যে দুটি ছিল আফ্রিকায় এবং তিনটি এশিয়ায়। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এশিয়ার তিন প্রজাতির গন্ডারই একসময় বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বাস করত।
কালের বিবর্তনে আবাসস্থল ধ্বংস, মানুষের বসতি বিস্তার এবং নির্বিচার শিকারের কারণে সেই গন্ডারগুলো আজ বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। পুরনো নথিপত্র, বিভিন্ন জেলার গেজেটিয়ার এবং ব্রিটিশ শাসনামলে প্রকাশিত নানা বিবরণ ঘেঁটে জানা যায়, দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্বের পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় একসময় গন্ডারের বিচরণ ছিল।
বাংলাদেশে যে তিন প্রজাতির গন্ডার ছিল, তাদের মধ্যে ইন্ডিয়ান রাইনোসেরস বা একশিঙ্গি বড় গন্ডার মূলত নেপাল ও সিকিম হয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
সুন্দরবন এলাকায় পাওয়া গন্ডারের ফসিল হাতে ইসমে আজম। ছবি : সংগৃহীত
জাভান রাইনোসেরসের বিস্তৃতি ছিল আরও বড় এলাকায়। সুন্দরবন, যশোর, বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহসহ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় এই একশিঙ্গি ছোট গন্ডারের উপস্থিতির কথা জানা যায়। সুন্দরবন ও যশোর এলাকা থেকে শিকার করা অন্তত ১১টি ছোট একশিঙ্গি গন্ডার তৎকালীন সময়ে কলকাতা, বার্লিন ও লন্ডনের বিভিন্ন জাদুঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে সুমাত্রান রাইনোসেরস, অর্থাৎ দুইশিঙ্গি গন্ডারের আবাস ছিল মূলত কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার পর্যন্ত অঞ্চলে। ১৮৭৬ সালে কুমিল্লায় একটি দুইশিঙ্গি গন্ডার গুলি করে হত্যা করা হয়। এরও আগে, ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম থেকে একটি দুইশিঙ্গি গন্ডার জীবিত অবস্থায় ধরা পড়েছিল। সেই গন্ডারটিই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের শেষ জীবিত গন্ডার হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়। তার নাম ছিল ‘বেগম’।
১৮৬৮ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রামের দক্ষিণের কোনো এক এলাকায় গন্ডারটি চোরাবালিতে আটকে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। স্থানীয় মানুষ সেটিকে চোরাবালি থেকে উদ্ধার করে আটকে রাখেন এবং প্রশাসনকে খবর দেন। খবর পেয়ে তৎকালীন ব্রিটিশ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হুড ও মি. উইকস ৮টি হাতি নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। প্রায় ১৬ ঘণ্টার কঠোর প্রচেষ্টার পর গন্ডারটিকে বন্দি করা সম্ভব হয়। লন্ডন চিড়িয়াখানা গন্ডারটির খবর পাওয়ার পর দীর্ঘ দর-কষাকষি করে ১৮৭২ সালে সেটিকে পাঁচ হাজার পাউন্ডে কিনে নেয়।
নিজের বন, জলাভূমি ও পরিচিত ভূখণ্ড ছেড়ে বেগমের ঠিকানা হলো বহু দূরের লন্ডন। লন্ডন চিড়িয়াখানাতেই তার নাম রাখা হয় ‘বেগম’। সেখানে মি. কিউলমান নামের এক আঁকিয়ে বেগমের ছবি আঁকেন। সেই ছবিই মানুষের চোখে ধরা পড়া বাংলাদেশের জীবিত শেষ গন্ডারের অন্যতম ঐতিহাসিক চিত্র।
সুন্দরবনে আদি সভ্যতার প্রত্নস্থলের আবিষ্কারক ইসমে আজম (ঋজু) বাংলাদেশ থেকে গন্ডারের বিলুপ্তি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন।
ইসমে আজম জানান, বেগমকে বাংলাদেশের শেষ গন্ডার হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সুন্দরবনের ইতিহাসে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। ১৮০০ সালের শেষভাগ কিংবা ১৯০০ সালের শুরুর দিকে সুন্দরবনের নলিয়ান এলাকায় কালাচাঁদ নামের এক শিকারি একটি জাভান রাইনোসেরস শিকার করেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার খুলনার রায়সাহেব নলিনীকান্ত রায়চৌধুরী ১৮৮৫ সালেও সুন্দরবনে গন্ডারের পায়ের ছাপ দেখেছিলেন বলে জানা যায়। এরপর সুন্দরবন কিংবা বাংলাদেশের অন্য কোথাও গন্ডারের উপস্থিতির নির্ভরযোগ্য উল্লেখ আর পাওয়া যায়নি।
তিনি জানান, বনভূমি, পুরনো ইতিহাস এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে মনে হয়েছে, সুন্দরবনে তৃণভূমির সংকট এবং অবাধ শিকার গন্ডার বিলুপ্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।
ইসমে আজম বলেন, ‘একসময় সুন্দরবনে চামড়া, শিং ও মাংসের জন্য ব্যাপক আকারে গন্ডার শিকার করা হতো। প্রাচীনকালে সুন্দরবন অঞ্চলের আদিবাসীরা গন্ডারের মাংস খেত। সুন্দরবনের প্রাচীন প্রত্নস্থলে তারই নমুনাস্বরূপ একটি গন্ডারের দাঁতের জীবাশ্ম-প্রমাণ পাওয়া যায়। পাশাপাশি অবশ্য অন্যান্য প্রাণীর হাড়ের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। অন্য আরেক প্রত্নস্থলে পাওয়া যায় পায়ের হাড়, যা দেখে অনুমান করা যায় হাড়ের ভেতরের মজ্জা বের করার জন্য ভাঙা হয়েছিল হাড়টি।’
তিনি আরও জানান, “সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সেকেন্দার ডাক্তার একটি পুকুর খননের সময় মাটির গভীরে দুটি গন্ডারের কঙ্কাল পান। এ ছাড়া সুন্দরবনসংলগ্ন হরিণগড় গ্রামে এফাজতুল্লা সরদার পুকুর খননের সময় একটি গন্ডারের কঙ্কাল, ধুমঘাট দিঘি খননের সময় ছয়টি গন্ডারের কঙ্কাল ও ঈশ্বরীপুর মাখন লাল অধিকারীর বাড়িতে ‘সুন্দরবনের ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক এ এফ এম আবদুল জলিল ছয়টি গন্ডারের কঙ্কাল দেখেন।”
ইসমে আজম বলেন, ‘সুন্দরবন অঞ্চলে বসবাসরত ঢালী পদবির লোকজন সুন্দরবনে গন্ডার শিকার করে তার চামড়া দিয়ে যুদ্ধের জন্য ঢাল প্রস্তুত করত। ঢাল থেকে পেশাগত কারণে ঢালী পদবির উৎপত্তি। এই ঢালীরা মহারাজ প্রতাপাদিত্যর হয়ে যুদ্ধ করত। পরবর্তী যুগে এসে ইংরেজ শিকারিদের ব্যাপক শিকারের ফলে অবশিষ্ট গন্ডার সুন্দরবন থেকে বিলীন হয়ে যায়।’
আজ বাংলাদেশে গন্ডার নেই। কিন্তু তাদের স্মৃতি এখনো ভূগোল ও স্থানীয় নামের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এমন অনেক গ্রাম, বাজার, নদী ও খালের নাম রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে গন্ডারের স্মৃতির সম্পর্ক রয়েছে। গাড়াখালী কিংবা রামপাল অঞ্চলের গাড়ামারা তারই উদাহরণ।
সুন্দরবন অঞ্চলে পশু ধরার ফাঁদকে স্থানীয়ভাবে ‘কল’ এবং গন্ডারকে ‘গেঁড়া’ বলা হতো। শক্তিশালী গন্ডার ধরার জন্য তৈরি ফাঁদও ছিল অত্যন্ত মজবুত। অন্যান্য প্রাণীর পক্ষে সেই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব ছিল। তাই প্রচলিত ‘গেঁড়াকল’ প্রবাদের উৎপত্তিও সুন্দরবন অঞ্চলের সেই পুরনো শিকার সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়।