ঢাকায় ভৌগোলিকভাবে সূর্যোদয়ের সময় পুরো শহরে প্রায় একই। কিন্তু জনজীবনের ব্যস্ততা কখন শুরু হচ্ছে, সেই হিসাব করলে রাজধানীর সব এলাকার সকাল এক সময়ে শুরু হয় না। কোথাও ভোরের আগেই পাইকারি বাজার বসে যায়, কোথাও রাত শেষ হওয়ার আগেই ট্রাক থেকে পণ্য নামতে শুরু করে। আবার কোথাও ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে বের হন নগরবাসী। কর্মব্যস্ততার ধরন অনুযায়ী ঢাকার কিছু এলাকায় তাই সকাল শুরু হয় অন্যদের চেয়ে অনেক আগে।
বাকরখানি তৈরিতে ব্যস্ত চকবাজারের দোকানি। ছবি : সংগৃহীত
পুরান ঢাকা
পুরান ঢাকার চকবাজার, বড় কাটরা ও বেগমবাজারে দিনের শুরুটা হয় ভোরেরও আগে। ভোর সাড়ে ৪টা থেকে ৫টার মধ্যেই এসব এলাকায় পাইকারি ব্যবসা, খাবার তৈরির কাজ ও দোকান খোলার ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। কোথাও মালামাল ওঠানামা করছে, কোথাও বাকরখানি ও নানা ধরনের নাস্তা তৈরির প্রস্তুতি চলছে। ভোরের নীরবতা ভেঙে শ্রমিক, দোকানি ও ক্রেতাদের আনাগোনায় ধীরে ধীরে সরব হয়ে ওঠে পুরান ঢাকার অলিগলি।
নাজিমউদ্দীন রোড ও সাত রওজার দিকেও খুব ভোরেই খুলতে শুরু করে খাবারের দোকান। ঐতিহ্যবাহী নাস্তা, গরম চা ও সকালের খাবারের টানে ভোরেই এসব এলাকায় মানুষের চলাচল বাড়তে থাকে। রাতের শহর তখনও পুরোপুরি ঘুমিয়ে থাকলেও পুরান ঢাকার অনেক মানুষের কর্মদিবস শুরু হয়ে যায়।
কারওয়ান বাজারের কর্মচঞ্চল সকাল। ছবি : সংগৃহীত
কারওয়ান বাজার ও যাত্রাবাড়ী
রাজধানীর বড় দুই বাণিজ্যিক কেন্দ্র কারওয়ান বাজার ও যাত্রাবাড়ীতেও সকাল আসার অপেক্ষা করতে হয় না। রাতভর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ট্রাকগুলোতে কাঁচামাল ও কৃষিপণ্য পৌঁছাতে থাকে। ভোরের আগেই শুরু হয় ট্রাক থেকে পণ্য নামানো, বাছাই ও পাইকারি বিক্রির প্রস্তুতি। তাই কারওয়ান বাজারে সবজি, মাছ ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আড়তে ভোর থেকেই ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও ক্রেতাদের ব্যস্ততা চোখে পড়ে।
একইভাবে যাত্রাবাড়ীর পাইকারি বাজারেও রাত পেরোনোর আগেই শুরু হয় কর্মচাঞ্চল্য। ফলে, এসব এলাকায় সূর্য ওঠার আগেই শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতি পেতে শুরু করে।
বুড়িগঙ্গায় ভোরবেলাতেই শুরু হয়ে যায় নৌকা চলাচল। ছবি : সংগৃহীত
সদরঘাট ও গাবতলী
সদরঘাট ও গাবতলী বাস-লঞ্চ টার্মিনালও ঢাকার সেই জায়গাগুলোর মধ্যে পড়ে, যেখানে ভোরের আগেই মানুষের চলাচল শুরু হয়। দূরপাল্লার যাত্রী, পরিবহনশ্রমিক, চালক, হেলপার ও বিভিন্ন পেশার মানুষকে নিয়ে রাতের শেষ ভাগ থেকেই সরব হয়ে ওঠে টার্মিনাল এলাকা।
সদরঘাটে ভোরের লঞ্চের যাত্রীদের আনাগোনা ও গাবতলীতে দূরপাল্লার বাসের যাত্রীদের চলাচলে দিনের প্রথম ব্যস্ততা তৈরি হয়। টার্মিনালসংলগ্ন চায়ের দোকান, খাবারের দোকান ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও যাত্রীদের প্রয়োজন মেটাতে অনেক আগেই খুলে যায়।
সকালে রমনা পার্কে হাঁটতে আসে অনেকেই। ছবি : সংগৃহীত
প্রাতঃভ্রমণের জায়গাগুলোতেও ভোরের ব্যস্ততা
রাজধানীর রমনা পার্ক ও চন্দ্রিমা উদ্যানের মতো জায়গাগুলোতে দিনের শুরুটা হয় ভিন্ন আবহে। ভোর ৫টার পর থেকেই হাঁটতে বের হন নানা বয়সী মানুষ। কেউ শরীরচর্চা করেন, আবার কেউ ভোরের আবেশ গায়ে মাখতে আসেন।
সূর্যের আলো ধীরে ধীরে বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব উদ্যান ও পার্কে মানুষের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে। ব্যস্ত নগরজীবনের বাইরে কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ খুঁজতে ভোরেই এখানে জড়ো হন নগরবাসী।
সব মিলিয়ে ঢাকার সকাল একেক এলাকায় একেক রকম। কোথাও পাইকারি বাজারের হাঁকডাক, কোথাও টার্মিনালের ব্যস্ততা, কোথাও খাবারের দোকানের ধোঁয়া ও গরম চায়ের গন্ধ, আবার কোথাও শরীরচর্চায় ব্যস্ত মানুষ- এসব মিলিয়ে সূর্য ওঠার আগেই ধীরে ধীরে জেগে ওঠে রাজধানী।