ঢাকা শুধু যানজট, ব্যস্ততা আর দালানের শহর নয়। এই শহরের ফুটপাথেও লুকিয়ে আছে নানা স্বাদের গল্প। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তার পাশে বসে খাবার তৈরি করেন অসংখ্য বিক্রেতা। কেউ বিক্রি করেন ফুচকা। কেউ ঝালমুড়ি। কেউ চটপটি। কোথাও কাবাবের ধোঁয়া। কোথাও গরম শিঙাড়া আর সমুচার ঘ্রাণ। আবার কোথাও পাওয়া যায় মোমো, নুডলস, চিকেন ফ্রাই, বার্গার, শর্মা বা নানা ধরনের ভাজাপোড়া।
এই খাবারগুলোই ঢাকার স্ট্রিট ফুড। দাম তুলনামূলক কম। পরিবেশনও দ্রুত। তাই শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চাকরিজীবী, রিকশাচালক থেকে পথচারী— সব শ্রেণির মানুষের কাছেই এসব খাবারের জনপ্রিয়তা রয়েছে। খাবারের স্বাদের পাশাপাশি আড্ডা ও পথের পরিবেশও এই অভিজ্ঞতার অংশ।
ঢাকার পথের খাবারের ইতিহাস খুব নতুন নয়। শহরের পুরোনো খাবারের সংস্কৃতির সঙ্গে এর সম্পর্ক গভীর। বিশেষ করে পুরান ঢাকায় বহু বছর ধরে ছোট খাবারের দোকান, রাস্তার পাশের খাবারের আড্ডা এবং সস্তা খাবারের প্রচলন ছিল। ষাট দশকের ঢাকার স্মৃতিচারণায়ও ‘পাইস হোটেল’-এর কথা পাওয়া যায়। এসব ছোট খাবারের দোকানে অল্প টাকায় সাধারণ মানুষ খাবার খেতেন। তখন ঢাকার বড় অংশই ছিল পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক। ধানমন্ডি, গুলশান ও বনানীর মতো এলাকা তখনও আজকের মতো ঘনবসতিপূর্ণ হয়নি।
সময় বদলেছে। ঢাকা বড় হয়েছে। নতুন নতুন আবাসিক এলাকা তৈরি হয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রাও দ্রুত হয়েছে। এর সঙ্গে বদলেছে পথের খাবারের ধরন। আগে স্থানীয় খাবারই বেশি দেখা যেত। এখন দেশি খাবারের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের খাবারের প্রভাবও দেখা যায়। ফলে ঢাকার স্ট্রিট ফুডে তৈরি হয়েছে নানা স্বাদের মিশ্রণ।
স্ট্রিট ফুডের কথা উঠলে পুরান ঢাকার নাম প্রথম দিকেই আসে। সরু গলি আর ব্যস্ত রাস্তার পাশে এখানে খাবারের দোকান চোখে পড়ে। সকালে পাওয়া যায় পরোটা, ভুনা খিচুড়ি, নিহারি ও চা। দিনের অন্য সময়ে পাওয়া যায় বাকরখানি, কাবাব, ফুচকা, ঝালমুড়ি ও নানা ধরনের নাশতা। সন্ধ্যার পর কাবাব ও মাংসের নানা পদ ঘিরে জমে ওঠে খাবারের আড্ডা।
পুরান ঢাকার খাবারের বিশেষত্ব হলো এর ঐতিহ্য। এখানে খাবারের সঙ্গে মিশে আছে বহু বছরের রান্নার কৌশল ও মসলা ব্যবহারের নিজস্ব ধারা। বাকরখানি থেকে কাবাব, তেহারি থেকে কাচ্চি— অনেক খাবারই এই এলাকার খাদ্যসংস্কৃতির পরিচয় বহন করে।
গুলশান-২ ও আশপাশের এলাকায় সন্ধ্যার পর বিভিন্ন ধরনের খাবারের আয়োজন দেখা যায়। যে সড়ক কাবাবের জন্য পরিচিত ছিল তা এখন ‘মিনি ব্যাংকক’ নামে পরিচিত। সেখানে এখন চোখে পড়ে ছোট ছোট বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের প্লেট, মোমো, পিজ্জা, কুলফি এমনকি সুশিও। ছোট ছোট এলইডি বাতি আর ফেয়ারি লাইটের আলোয় সাজানো এসব দোকান দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। কিছু দিন ধরে ‘রাতের কাবাবের গলি’ বা ‘ল্যাভেন্ডারের গলি’ নামে পরিচিত এই জায়গাটি কাবাব, ফুচকা এবং নানা ধরনের ঝটপট স্ট্রিট ফুডের জন্য বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় নতুন সংযোজন হলো ‘ডিকির দোকান’।
মানুষ বিশেষ করে নারীরা নিজ গাড়ির পেছনের ডিকি খুলে সেটিকেই দোকান বানিয়ে ফেলেছে। সব ধরনের গাড়িই এখন যেন অস্থায়ী দোকানে পরিণত হয়েছে। তাদের সৃজনশীলতা সত্যিই চোখে পড়ার মতো। কোনো গাড়ির ডিকিতে সাজানো রয়েছে লেইস চিপসের প্যাকেট, মসলার বয়াম, কুচি করা মুরগি, গরুর মাংস ও সসেজ। আবার কোনো গাড়ি থেকে বিক্রি হচ্ছে ঠান্ডা পানীয়, কেক, পিজ্জা কিংবা প্লেটে সাজানো নানা ধরনের খাবার। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা, বন্ধুদের সঙ্গে স্মরণীয় সময় কাটাতে বের হওয়া তরুণ-তরুণী, সবাইকে এখানে দেখা যায়।
বনানী ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত খাবারের এলাকা।
বিশেষ করে বনানী ১১ নম্বর সড়ক একসময় তরুণদের খাবারের আড্ডার জন্য বেশ পরিচিত হয়ে ওঠে। এখানে ফুচকা, চটপটি, কাবাব, মোমো, বার্গার, শর্মা ও নানা ধরনের ভাজাপোড়া পাওয়া যায়। বনানীর পথের খাবারের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো বৈচিত্র্য। একই এলাকায় একদিকে দেশি নাশতা, অন্যদিকে বিদেশি খাবারের স্থানীয় সংস্করণ পাওয়া যায়। ফলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে অনেকেই এসব জায়গায় ভিড় করেন।
ধানমন্ডির খাবারের চিত্র গত দুই দশকে অনেক বদলেছে। একসময় এটি ছিল তুলনামূলক শান্ত আবাসিক এলাকা। পরে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান ও খাবারের দোকান বাড়তে থাকে। ধানমন্ডি লেকের আশপাশও তরুণদের আড্ডার জায়গা হয়ে ওঠে। সাতমসজিদ রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন ছোট-বড় খাবারের দোকান রয়েছে। ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, কাবাব, মোমো, নুডলস ও নানা ধরনের ভাজাপোড়াসহ পাহাড়ি খাবার মুন্ডির স্টল রয়েছে।
ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের স্ট্রিট ফুডপ্রেমীদের জন্য রয়েছে আলাদা আকর্ষণ। বিকাল থেকে সন্ধ্যা হলেই ফুটপাথে বসে নানা ধরনের খাবারের পসরা। ঝালমুড়ি, ফুচকা, চটপটি, দই ফুচকা, চিকেন শর্মা, গ্রিলড চিকেন, বার্গার ও মোমো সবই পাওয়া যায় এখানে। বিশেষ করে ফুচকা ও চটপটির ঝাল-টক স্বাদ তরুণদের বেশ টানে।
পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের চা, কফি ও ঠান্ডাপানীয়ও থাকে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে এসব মুখরোচক খাবার খাওয়ার আনন্দও আলাদা। কম খরচে নানা স্বাদের খাবার চেখে দেখার সুযোগ থাকায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ হয়ে উঠেছে ঢাকার জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুডের একটি পরিচিত জায়গা। এ ছাড়াও সেখানে কেক, পোড়া রুটি-চা, পিজ্জা, ফ্রাইড রাইস, চিকেন বোল রাইস, চিকেন ফ্রাই, ছোলা বাটোরা, দোসা, রাজকচুড়িসহ আরও অনেক খাবার সবার বেশ পছন্দ।
ইস্কাটন গার্ডেন রোডে বিকাল ৫টার পর থেকেই বিটিসিএল ভবনের সামনের চত্বরটা ভরে যায় বাইক আর গাড়িতে। এখানে কাবাব কারবারে পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের কাবাব এবং মজাদার চাপ। ইস্কাটন গার্ডেন রোডের এ জায়গায় বেশ কিছু ভ্যান আছে। ভ্যানের ওপরে লেখা লাইভ পিজ্জা। চোখের সামনেই পিজ্জা বানিয়ে দিচ্ছেন দোকানিরা। তেলাপিয়া, কোরাল, সুরমা, টুনা, কাঁকড়ার বারবিকিউও এখানে মেলে বেশ কয়েকটি দোকানে। কয়েকটি ভ্যানে মোমোর আয়োজনও রয়েছে ইস্কাটন গার্ডেন রোডের এই খাবার চত্বরে। পাশাপাশি কাছেই ভিকারুন নিসা স্কুলের সঙ্গে ২-৩ বছর থেকেই স্ট্রিট ফুডের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। পথের খাবারের ধারায় মোমোর জনপ্রিয়তাও কম নয়।
মোহাম্মদপুরের স্ট্রিট ফুডের রয়েছে আলাদা পরিচয়। টাউন হল, সালিমুল্লাহ রোড, তাজমহল রোড এবং আশপাশের এলাকায় সন্ধ্যার পর খাবারের ভিড় বাড়ে। ফুটপাথের দোকানে কাবাবের ধোঁয়া, চায়ের গন্ধ আর মোমো ভাপানোর দৃশ্য সহজেই চোখে পড়ে। এই এলাকার খাবারের সংস্কৃতিতে স্থানীয় রান্নার পাশাপাশি বিহারি রান্নারও প্রভাব রয়েছে। ফলে কাবাব, চাপ, ভুনা, পরোটা ও নানা ধরনের মাংসের খাবার বেশ জনপ্রিয়।
মোহাম্মদপুরের খাবারের কথা বলতে গেলে মোস্তাকিমের কাবাবের (স্থাপিত ১৯৮২) মতো পুরোনো খাবারের দোকানের কথাও আসে। ছোট খাবারের দোকান থেকে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার এমন উদাহরণ এই এলাকার খাবারের সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
ঢাকার বড় আবাসিক এলাকাগুলোর একটি মিরপুর। মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এখানে খাবারের বাজারও বড়। রাস্তার পাশে ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, শিঙাড়া, সমুচা, কাবাব ও চায়ের দোকান দেখা যায়। এ ছাড়াও সিফুড, নিহারি, বার্গার, পাস্তাসহ আরও অনেক খাবার খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
বিভিন্ন মোড় ও বাজারের আশপাশে সন্ধ্যার পর খাবারের দোকান জমে ওঠে। মিরপুরের খাবারের জগতে দীর্ঘদিনের ছোট দোকানেরও গুরুত্ব আছে। এমনকি কিছু খাবারের দোকান একসময় ফুটপাথের ছোট আয়োজন দিয়ে শুরু হয়ে পরে পরিচিতি পেয়েছে। মিরপুর-১১ এলাকার রাব্বানি হোটেলের ইতিহাসে এমন একটি পথচলার উল্লেখ পাওয়া যায়।
অনেকে স্ট্রিট ফুড বললেই ফুচকা, চটপটি আর ঝালমুড়ির কথা ভাবেন। কিন্তু ঢাকার খাবারের জগৎ এখন অনেক বড়। মোমো, কাবাব, শর্মা, নুডলস, বার্গার, ফ্রাইড চিকেন, স্যান্ডউইচসহ নানা খাবার এখন রাস্তার পাশের খাবারের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। তবে দেশি খাবারের জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং অনেক নতুন খাবারের সঙ্গে দেশি স্বাদের মিশেল তৈরি হয়েছে। ফুচকার সঙ্গে নতুন ধরনের টক বা ঝাল, মোমোর সঙ্গে স্থানীয় মসলা কিংবা বার্গারে দেশি কাবাবের স্বাদ— এমন নানা পরীক্ষা এখন দেখা যায়।
ঢাকার স্ট্রিট ফুডের জনপ্রিয়তার বড় কারণ শুধু খাবার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আড্ডা। বন্ধুরা একসঙ্গে বসে ফুচকা খাচ্ছেন। কেউ চা হাতে গল্প করছেন। কেউ আবার অফিস শেষে দ্রুত কিছু খেয়ে বাড়ি ফিরছেন। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বা ছোট বেঞ্চে বসে খাবার খাওয়ার মধ্যে এক ধরনের সহজ আনন্দ আছে। এখানে বড় আয়োজন নেই। নেই আনুষ্ঠানিকতার চাপ। খাবার সামনে এলেই আড্ডা শুরু হয়ে যায়।
স্ট্রিট ফুড খাওয়ার সময় স্বাদের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার দিকেও নজর দেওয়া দরকার। খাবার ঢেকে রাখা হয়েছে কি না, বিক্রেতা পরিষ্কারভাবে খাবার পরিবেশন করছেন কি না এবং ব্যবহৃত পানি ও বাসনপত্র কতটা পরিষ্কার— এসব দেখা ভালো। গরম খাবার সাধারণত ভালোভাবে রান্না হয়েছে কি না সেটিও খেয়াল করা দরকার। অতিরিক্ত সময় ধরে খোলা অবস্থায় পড়ে থাকা খাবার এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। নিজের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে খাবার বেছে নেওয়া উচিত।
ঢাকার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে এর খাবারের সংস্কৃতিও। একসময় পথের খাবার বলতে মূলত স্থানীয় কিছু নাশতাকেই বোঝানো হতো। এখন সেখানে যোগ হয়েছে বিভিন্ন দেশের খাবার। একই সঙ্গে পুরোনো খাবারও টিকে আছে। পুরান ঢাকার বাকরখানি থেকে মোহাম্মদপুরের কাবাব, ধানমন্ডির ফুচকা থেকে বনানীর মোমো, মিরপুরের চায়ের দোকান থেকে গুলশানের আধুনিক খাবারের আয়োজন— সব মিলিয়ে ঢাকার স্ট্রিট ফুড যেন শহরেরই একটি জীবন্ত ছবি।
এই খাবারের স্বাদে আছে ঢাকার পুরোনো দিনের স্মৃতি। আছে নতুন প্রজন্মের পছন্দ। আছে ব্যস্ত জীবনের সহজ সমাধান। তাই ঢাকা যতই বদলাক, রাস্তার পাশে ধোঁয়া ওঠা কাবাব, টক-ঝাল ফুচকা কিংবা এক কাপ গরম চায়ের আড্ডা হয়তো এই শহরের জীবন থেকে কখনো হারিয়ে যাবে না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে/এমকে