টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বেশি হলেই কাউকে পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। নারী ও পুরুষ উভয়ের শরীরেই স্বাভাবিকভাবে এই হরমোন তৈরি হয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা, রোগ, ওষুধ এবং হরমোনজনিত বিভিন্ন কারণেও টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে।
বাংলাদেশের দুই অ্যাথলেট জান্নাত বেগম ও কবিতা রায়কে ঘিরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা এবং নারী বিভাগে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এর জেরে লিঙ্গ নির্ধারণী পরীক্ষার পর বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন তাদের নারী বিভাগের প্রতিযোগিতা থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে তাদের অর্জিত ১৫টি পদক ও দুটি জাতীয় রেকর্ড বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) ফেডারেশনের কার্যনির্বাহী কমিটির দ্বিতীয় সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফেডারেশন জানিয়েছে, নিজ নিজ সংস্থার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জান্নাত ও কবিতার পরীক্ষা করা হয়। এ জন্য ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা বোর্ড গঠন করা হয়েছিল।
দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গত ১১ মে তাদের শারীরিক পরীক্ষা শেষ হয়। ১৬ মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন ফেডারেশনের কাছে জমা দেওয়া হয়।
ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা বোর্ডের প্রতিবেদনে ২৮ বছর বয়সী জান্নাত বেগম ও ১৯ বছর বয়সী কবিতা রায়ের ক্ষেত্রে ‘৪৬ এক্সওয়াই ডিএসডি’ বা যৌন বিকাশের ভিন্নতা শনাক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাদের উভয়ের ‘পেনোস্ক্রোটাল হাইপোস্পেডিয়াস’ রয়েছে। এটি পুরুষের একটি জন্মগত শারীরিক অবস্থা, যেখানে মূত্রনালীর মুখ পুরুষাঙ্গের ডগায় না থেকে পুরুষাঙ্গ ও অণ্ডকোষের সংযোগস্থলের কাছাকাছি বা গোড়ায় অবস্থান করে।
পরীক্ষায় জান্নাতের রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পাওয়া যায় প্রতি লিটারে ১৯ দশমিক ৬৬ ন্যানোমোল এবং কবিতার ১৬ দশমিক ৫০ ন্যানোমোল। ফেডারেশনের দাবি, নারী বিভাগে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিশ্ব অ্যাথলেটিকস নির্ধারিত টেস্টোস্টেরনের সীমা প্রতি লিটারে ২ দশমিক ৫ ন্যানোমোল।
ফলে দুই অ্যাথলেটই নির্ধারিত সীমার ওপরে ছিলেন বলে জানিয়েছে ফেডারেশন। পরে জান্নাতের জ্যাভলিন থ্রো ও ডিসকাস থ্রোতে অর্জিত দুটি জাতীয় রেকর্ডসহ ১১টি পদক বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে আটটি স্বর্ণ, একটি রৌপ্য ও দুটি ব্রোঞ্জ পদক রয়েছে।
কবিতার ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও ৪×১০০ মিটার ইভেন্টের চারটি পদকও বাতিল করা হয়েছে। এসব পদক সংশ্লিষ্ট ইভেন্টে পরবর্তী অবস্থানে থাকা অ্যাথলেটদের মধ্যে বিধি অনুযায়ী পুনর্বণ্টন করা হবে।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে টেস্টোস্টেরনের মাত্রাকে কারও জৈবিক লিঙ্গ নির্ধারণের একক মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয় না। লিঙ্গসংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী ক্রোমোজোম, হরমোন, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, যৌন বিকাশ এবং চিকিৎসার ইতিহাসসহ একাধিক বিষয় বিবেচনা করা হয়।
খেলাধুলার ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। বয়ঃসন্ধির পর টেস্টোস্টেরন পেশি, হাড় ও লোহিত রক্তকণিকার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে কিছু ক্রীড়া সংস্থা নারী বিভাগে প্রতিযোগিতার যোগ্যতা নির্ধারণে নির্দিষ্ট টেস্টোস্টেরন সীমা ব্যবহার করে।
অর্থাৎ, টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কোনো ব্যক্তির নারী বা পুরুষ পরিচয় নির্ধারণের সর্বজনীন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নয়। নির্দিষ্ট ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা নির্ধারণে এটি একটি নীতিগত মানদণ্ড। তাই ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার যোগ্যতার নিয়ম এবং জৈবিক লিঙ্গ নির্ধারণকে একই বিষয় হিসেবে দেখা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, আমেরিকান লাইব্রেরি অব মেডিসিন ও হেলথলাইন।
সময়ের আলো/এমকে