একজন মানুষ! এলোমেলো চুল। হাতে কখনও খাঁচাবন্দি সূর্য, কখনও কাঁটাতার ছিন্ন করার যন্ত্র। কোথাও দৌড়াচ্ছে, কোথাও বসে আছে, কোথাও জেলের গরাদে দাঁড়িয়ে। তার নাম সুবোধ। কিন্তু সে কি সত্যিই একজন মানুষ? নাকি একটি সময়ের বিবেক, যা বারবার দেয়ালে ফিরে এসে আমাদের সমাজকে প্রশ্ন করে?
বাংলাদেশে ‘সুবোধ’ এখন আর শুধু একটি শব্দ নয়। এটি এমন একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক, যা কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানেরও নয়। এটি এমন এক চরিত্র, যে কথা বলে না— তবু সবচেয়ে বেশি কথা বলে।
প্রায় এক দশক আগে রাজধানীর দেয়ালে জন্ম নেওয়া এই রহস্যময় চরিত্রটি সম্প্রতি আবার আলোচনায় এসেছে। এবার বাংলাদেশে নয়, ভারতের সিকিমে। সীমান্তঘেঁষা একটি দেয়ালে ‘হবেকি?’- এর নতুন গ্রাফিতিতে আবারও দেখা মিলেছে সুবোধের। ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—কে এই সুবোধ? কেন বারবার ফিরে আসে সে? আর কেন একটি কাল্পনিক চরিত্র এত বছর পরও মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে?
সুবোধ আসলে কে?
আক্ষরিক অর্থে ‘সুবোধ’ মানে সৎ বুদ্ধিসম্পন্ন, শান্ত-শিষ্ট বা সহজে বোঝে এমন মানুষ। কিন্তু বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অভিধানে এই শব্দের অর্থ বদলে গেছে অনেক আগেই। ২০১৭ সালের দিকে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন দেয়ালে বেনামি শিল্পী ‘হবেকি?’ একটি ধারাবাহিক গ্রাফিতি আঁকতে শুরু করেন। সেখানে দেখা যায় এলোমেলো চুলের এক তরুণকে, যার হাতে একটি খাঁচাবন্দি সূর্য। ছবির পাশে লেখা থাকে— ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না।’ একটি মাত্র বাক্য আর একটি চরিত্র— এই দুটিই যথেষ্ট ছিল দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিতে।
কে এই রহস্যময় শিল্পী?
‘হবেকি?’ বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত স্ট্রিট আর্টিস্টদের একজন বা একাধিক ব্যক্তি হলেও আজও তার বা তাদের পরিচয় প্রকাশ্যে আসেনি। শিল্পী কখনও নিজের পরিচয় সামনে আনেননি, আবার নিজের কাজের ব্যাখ্যাও দেননি। ফলে তার প্রতিটি গ্রাফিতির অর্থ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা ব্যাখ্যা।
২০১৭ সালে সুবোধ সিরিজ ব্যাপক আলোচনায় এলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও শিল্পীর পরিচয় জানার চেষ্টা করেছিল বলে বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমে তথ্য উঠে আসে। কিন্তু আজও ‘হবেকি?’ একটি রহস্যই রয়ে গেছে।
সুবোধের জনপ্রিয়তার বড় কারণ, এটি কোনো সরাসরি রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এখানে কোনো দলের নাম নেই, কোনো নেতার ছবি নেই, কোনো ঘটনার সরাসরি উল্লেখও নেই। বরং প্রতিটি গ্রাফিতি দর্শকের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়। খাঁচাবন্দি সূর্য কী বোঝায়? সুবোধ কেন পালাতে চাইছে? ভোর কেন আসছে না? মানুষ কেন ভালোবাসতে ভুলে গেছে?
শিল্পী উত্তর দেন না। উত্তর খুঁজে নিতে হয় দর্শককেই। ফলে একই ছবি একজনের কাছে রাজনৈতিক বার্তা, আরেকজনের কাছে সামাজিক হতাশা, আবার অন্য কারও কাছে ব্যক্তিগত সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে।
২০২৪- এর পর শিল্পভাষার পরিবর্তন
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকার দেয়ালে ‘হবেকি?’-এর নতুন কাজ ‘This Is My Masterpiece’ -এ দেখা যায়, একজন তরুণী বাংলাদেশের পতাকা আঁকা একটি চিত্রকর্ম বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন। এই কাজ দেখিয়েছে, শিল্পীর ভাষা একই থাকলেও সময়ের সঙ্গে তার প্রতীক ও বক্তব্যের ধরন বদলাচ্ছে।
২০২৬ সালের জুনের শেষ দিনে ভারতের সিকিমের গ্যাংটক-রংপো সড়কের মাঝিতার নালা ব্রিজের একটি দেয়ালে নতুন করে দেখা যায় সুবোধকে। প্রায় ২০ ফুট দীর্ঘ এই গ্রাফিতিতে দেখা যায়, কাঁটাতারের সঙ্গে বাঁধা একটি হ্যামকে শুয়ে আছে সুবোধ। তার হাতে রয়েছে ওয়্যার কাটার, নিচে রাখা একটি বালতি। ছবির এক প্রান্তে শিল্পীর পরিচিত স্বাক্ষর— ‘হবেকি?’
এবারের কাজের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো— এখানে কোনো লেখা নেই। ফলে দর্শকের সামনে কোনো নির্দেশনা নেই। পুরো ব্যাখ্যার দায়িত্ব তার নিজের। কেউ এটিকে সীমান্তের প্রতীক হিসেবে দেখছেন, কেউ দেখছেন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, আবার কেউ মনে করছেন এটি মানুষের তৈরি বিভাজনকেই প্রশ্ন করছে।
কেন এখনও প্রাসঙ্গিক সুবোধ?
বাংলাদেশে অনেক দেয়ালচিত্র এসেছে, আবার হারিয়েও গেছে। কিন্তু ‘সুবোধ’ টিকে আছে প্রায় এক দশক ধরে। এর কারণ সম্ভবত একটি— ‘সুবোধ’ কখনো একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে থাকেনি। প্রতিটি নতুন বাস্তবতায় মানুষ নিজের মতো করে তাকে নতুন অর্থ দিয়েছে। তাই সুবোধ কোনো একক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং একটি উন্মুক্ত প্রতীক। যে প্রতীক সময়ের সঙ্গে বদলায়, কিন্তু হারিয়ে যায় না।
সময়ের আলো/জেডআই