বাংলা গানের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদীর জন্মদিন আজ। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সুরেলা কণ্ঠ, মুগ্ধকর গায়কি এবং অসংখ্য কালজয়ী গানের মাধ্যমে তিনি বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। 'একবার যদি কেউ ভালোবাসত', 'দিন যায় কথা থাকে', 'চোখের নজর এমনি কইরা', 'সব কটা জানালা খুলে দাও না'সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের এই শিল্পী আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে সমানভাবে স্থান করে আছেন।
জন্মদিন উপলক্ষে দৈনিক সময়ের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিমের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় বর্তমান সংগীতচর্চা, ভাইরাল সংস্কৃতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), নিজের সংগীতজীবন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি।
দীর্ঘ সংগীতজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, গান তার পেশা ছিল ঠিকই, কিন্তু অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে কখনো গান করেননি।
তার ভাষায়, আমি গান গেয়েছি ঠিকই। এটা আমার প্রফেশনও ছিল। কিন্তু আমি কোনোদিন টাকার জন্য গান করিনি। গান গেয়ে টাকা পেয়েছি, কিন্তু টাকার জন্য গান করিনি। যতদিন গান করেছি, কোথাও কোনোদিন পারিশ্রমিক দাবি করিনি।
তার মতে, শিল্পচর্চার মূল শক্তি হওয়া উচিত ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা, শুধুমাত্র অর্থ নয়।
বর্তমান সময়ের সংগীতের ধারা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন এই বরেণ্য শিল্পী। তিনি বলেন, একসময় মানুষ শিল্পের গভীরতা উপলব্ধি করত, কিন্তু এখন অধিকাংশ মানুষ ক্ষণস্থায়ী বিনোদন খোঁজে।
তিনি বলেন, মানুষ এখন শিল্প খোঁজে না, মানুষ নিছক বিনোদন খোঁজে। ভালো দিয়ে তো এখন ভিউ হয় না। এখন ভিউ পেতে হলে ভাইরাল হতে হয়।
তার মতে, ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা সংগীতের গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জনপ্রিয়তার সঙ্গে অর্থনৈতিক সাফল্য জড়িয়ে যাওয়ায় অনেকেই শিল্পের গভীরতার চেয়ে সহজে আলোচনায় আসার পথ বেছে নিচ্ছেন।
নিজের শুরুটা স্মরণ করে সৈয়দ আব্দুল হাদী জানান, ছোটবেলা থেকে তার স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হওয়ার। গায়ক বা শিল্পী হওয়ার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না।
তিনি বলেন, গায়ক হব বা শিল্পী হব— এরকম কোনো বাসনা আমার ছিল না। আমি শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু নিয়তি আমাকে সংগীতের দিকে টেনে নিয়ে গেছে।
সংগীতের প্রতি ভালোবাসা এতটাই গভীর হয়ে ওঠে যে একসময় কলেজের চাকরি ছেড়ে দেন। পরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের চাকরিও ছেড়ে দিতে হয়, কারণ সেই দায়িত্বের পাশাপাশি সংগীতচর্চা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।
তিনি বলেন, তাদের সময়ে একটি গান তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পরিচ্ছন্ন, নান্দনিক ও শিল্পসম্মত একটি সৃষ্টি উপহার দেওয়া। তখন বাণিজ্যিক সাফল্যের চেয়ে শিল্পের মানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো।
কিন্তু এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সৈয়দ আব্দুল হাদীর মতে, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা ও মূল্যবোধেও বড় পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, আগে পরিবার ছিল মানুষের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু এখন মানুষ অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। এই সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব সংগীতেও পড়েছে। মানুষের মনোযোগ কমে গেছে, নতুন কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বেড়েছে এবং ভাইরাল সংস্কৃতি শিল্পচর্চাকে প্রভাবিত করছে।
দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই বরেণ্য শিল্পী।
তিনি বলেন, ঢাকার বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠা ভবনগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। এগুলো শুধু স্থাপনা নয়, জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতিরও অংশ। তাই এসব সংরক্ষণে আরও যত্নবান হওয়া প্রয়োজন।
নিজের সংগীতজীবনে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাদের মধ্যে সুবল দাস ও কাদের জামিলের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করেন সৈয়দ আব্দুল হাদী।
তিনি জানান, বাংলা গানের উচ্চারণ, পরিবেশনা, শব্দচয়ন ও কারিগরি নানা দিক কাদের জামিলের কাছ থেকেই শিখেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষার প্রসারে কাদের জামিলের অবদান অনন্য।
দেশের কিংবদন্তি সুরকার আলাউদ্দিন আলীর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আলাউদ্দিন আলী এত প্রতিভাবান একজন সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন যে তাকে শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা উচিত।
তার মতে, আলাউদ্দিন আলীর সৃষ্টিশীলতা আন্তর্জাতিক মানের ছিল।
কলেজজীবনের বন্ধু নাজমুল হুদার কথা স্মরণ করে সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, তার উৎসাহ না থাকলে হয়তো তিনি কখনো মঞ্চে গান গাইতেন না। বন্ধুর জোরাজুরিতেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে তার সংগীতজীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশও তাকে ভাবিয়ে তোলে।
তিনি বলেন, এখন কোনো গান ভালো লাগলেও ভাবি, এটা কি সত্যিকারের কারও গাওয়া, নাকি এআই? এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো সংবাদ দেখলেও সন্দেহ হয়—এটা সত্যি, নাকি এআই?
তার মতে, প্রযুক্তির অগ্রগতি যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি সত্য-মিথ্যা যাচাই করাও দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
বর্তমানে নিয়মিত গান না গাওয়ার কারণও ব্যাখ্যা করেন সৈয়দ আব্দুল হাদী।
তিনি জানান, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর কিছু শারীরিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান সময়ের সংগীতধারার সঙ্গে নিজেকে আর আগের মতো মানিয়ে নিতে পারছেন না বলেও জানান তিনি।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিলেও নিজের কাজ নিয়ে তিনি এখনও আত্মসমালোচনামূলক।
তার ভাষায়, সব গানেই মনে হয়, আবার যদি সুযোগ পেতাম তাহলে আরও সুন্দর করে গাইতে পারতাম।
তবে নতুন প্রজন্মকে নিজের গান গাইতে দেখলে তিনি আনন্দ পান।
তিনি বলেন, যে-ই আমার গান গাক, ভালো লাগে। কারণ অন্তত একজন মানুষের অন্তরে আমি প্রবেশ করতে পেরেছি— এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বাংলা সংগীতের এই জীবন্ত কিংবদন্তির কাছে শিল্প মানে শুধু গান নয়, বরং দায়বদ্ধতা, নিষ্ঠা, ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যাওয়ার এক অনন্ত সাধনা।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ