বৈজ্ঞানিক উপায়ে বাচ্চাদের প্রিয় খাবার হবে সবজি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ফিচার

শিশুর প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন তাদের খাওয়ার ধরনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব রাখে। বিশেষ করে শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ানো নিয়ে

2026-07-01T02:40:57+00:00
2026-07-01T02:40:57+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
ফিচার
বৈজ্ঞানিক উপায়ে বাচ্চাদের প্রিয় খাবার হবে সবজি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ২:৪০ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
শিশুর প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন তাদের খাওয়ার ধরনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব রাখে। বিশেষ করে শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ানো নিয়ে প্রায় প্রতিটি মা-বাবাই চিন্তায় থাকেন। অভিভাবকদের আলোচনায় প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে ‘আমার বাচ্চাটা শাকসবজি খেতে চায় না, কি যে করি?’

বিবিসির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর প্রধান কারণ হলো মিষ্টি স্বাদের প্রতি শিশুর পছন্দ জন্মের আগে থেকেই তৈরি হতে শুরু করে। এমনকি মায়ের বুকের দুধেও প্রাকৃতিক শর্করা থাকে, যা তাকে মিষ্টি স্বাদ দেয়। শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করার পর ব্রোকোলি বা পালংশাকের মতো সবজি খাওয়ানো অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ে। 

অথচ শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রচুর ফল ও শাকসবজির মতো বৈচিত্র্যময় খাবার অপরিহার্য। অসম্পূর্ণ বা অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শিশুর মেধা, মনোযোগ, আচরণ এমনকি পড়ালেখার ফলাফলকেও প্রভাবিত করে। তা ছাড়া বিশ্বজুড়ে শিশুদের মধ্যে স্থূলতার প্রবণতা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি রোগ ও শিক্ষাগত যোগ্যতায় পিছিয়ে পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে সুসংবাদ হলো বিজ্ঞানীরা শিশুদের খাদ্যাভ্যাস উন্নত করার কার্যকর ও সহজ কিছু উপায় খুঁজে পেয়েছেন। ঘরেই প্রয়োগ করা যায় এমন ছয়টি পদ্ধতি সময়ের আলোর পাঠকদের জন্য নিচে আলোচনা করা হলো।

বারবার পরিচিতি করানো : যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব-মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ম্যারিয়ন হেথারিংটন বলছেন, শৈশবে যত বেশি ধরনের শাকসবজি বারবার খাওয়ানোর চেষ্টা করা হবে, শিশু তত সহজেই সেগুলো গ্রহণ করবে। প্রাক-বিদ্যালয় পর্যায়ে অর্থাৎ পাঁচ বছর বয়সের আগে এই অভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে কার্যকর। তার মতে, পাঁচ বছরের মধ্যে যদি শিশুকে বিভিন্ন সবজির সঙ্গে পরিচিত করানো না যায়, তবে পরে তা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। একেবারেই যে পারা যায় না তা নয়, তবে অনেক কঠিন হয়ে যায়।


গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো নতুন খাবার শিশুকে গ্রহণ করার আগে প্রায় ৫-১৫ বার তার সংস্পর্শে রাখা উচিত। এক বছরের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা কম হতে পারে। তবে তিন-চার বছর বয়সে নতুন কিছু গ্রহণে অনীহা দেখা দেয়। এমনকি এই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে শিশুর জন্মের আগেই। মায়ের খাদ্যাভ্যাস গর্ভস্থ সন্তানের ওপর প্রভাব ফেলে এবং পরবর্তী সময়ে তার খাবারের পছন্দ নির্ধারণ করে।

প্রথমেই শাকসবজি দিন : শিশুকে শুধু বললে হবে না যে- এটা খাও, না খেলে শরীর খারাপ করবে। এটি প্রায়ই বিপরীত ফল দেয়। তারা বরং ‘সুস্বাদু’ বলে পরিচিত খাবারগুলো বেছে নিতে বেশি পছন্দ করে। তাই খাবার পরিবেশনের সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের শুরুতেই যখন শিশু সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত থাকে, তখনই শাকসবজি দিন। তারা প্রথমেই পছন্দের খাবার খেয়ে নিলে পরে সবজি খাওয়ার ইচ্ছা থাকে না।

মার্কিন পেনসিলভানিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানের অধ্যাপক বারবার রোলস বলছেন, এভাবে প্রথমে সবজি দিলে শিশু অতিরিক্ত খাবারও খায় না। শুধু দুপুর বা রাতের খাবার নয়, সকালের নাস্তাতেও সবজি যোগ করা যেতে পারে। যেমন ওমলেটে মাশরুম বা পালংশাক, বা মাফিনে কুচি করা কুমড়ো। ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যের আটটি শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রে চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, সকালের নাস্তায় সবজি দিলে প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রেই শিশুরা তা খেয়েছে।

স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিমাণ বাড়ানো : যদি প্রথমে সবজি দেওয়া সম্ভব না মনে হয়, তবে প্লেটে খাবারের অনুপাত পরিবর্তন করুন। ক্যালোরি বেশি এমন উপাদান কমিয়ে শাকসবজির পরিমাণ বাড়ান। পাশের খাবার হিসেবে বেশি পরিমাণে সবজি দিতে পারেন, বা সস ও তরকারিতে গাজর, কুমড়ো কুচি করে মিশিয়ে দিতে পারেন। 

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সাধারণত নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার খায়, তাই মাংস বা অন্য কিছু র তুলনায় সবজির অনুপাত বাড়ালে শিশু স্বাভাবিকভাবেই বেশি পরিমাণে সবজি গ্রহণ করে। প্লেটে ফল ও সবজির পরিমাণ ৫০ শতাংশ বাড়ালে শিশু তা খাওয়ার পরিমাণও বেড়ে যায়। এ ছাড়া একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সবজি দিলে প্রাক-বিদ্যালয়ের শিশুরা বেশি পরিমাণে সেগুলো খায়।

সবজির চেহারা ও উপস্থাপনা বদলানো : খাবারের প্রতি আমাদের পছন্দ শুরু হয় চোখ দিয়ে দেখার মাধ্যমে। শিশুরা পরিচিত ও আকর্ষণীয় দেখতে খাবারের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। তাই খাবার পরিবেশনের ধরন পরিবর্তন করলে তাদের আগ্রহ বাড়ে। 

গবেষণায় দেখা গেছে, শাকসবজিকে মজার কোনো কিছুর মতো সাজিয়ে পরিবেশন করলে শিশুরা তা খেতে বেশি আগ্রহী হয়। প্রিয় কোনো খেলনা বা মাছের আকারে কেটে দিলে তাদের কাছে স্বাস্থ্যকর খাবারও মজার মনে হয়। এমনকি একসঙ্গে এক পাত্রে বিভিন্ন সবজি রাখলে বা প্লেটকে ভাগ করে ভিন্ন ভিন্ন অংশে আলাদাভাবে রাখলে শিশুরা প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি পরিমাণে সবজি খায়।

পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়া : বাবা-মায়ের খাদ্যাভ্যাস শিশুর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। অভিভাবকরা যদি অস্বাস্থ্যকর খাবার বা ফাস্টফুড খান, তবে শিশুরাও তা অনুকরণ করে। 

নিউজিল্যান্ডের স্কুল শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের বাবা-মা সুষম খাদ্য গ্রহণ করেন, তাদের শিশুরা কেক, চকোলেট ও অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর খাবার কম খায়। সপ্তাহে অন্তত তিনবার পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাবার খেলে শিশুর ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে, খাদ্যাভ্যাস উন্নত হয় এবং তারা স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে শেখে। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে খায়, তাদের শারীরিক সক্ষমতা বেশি থাকে ও কোমল পানীয় কম পান করে।


খাবারকে মজার করে তোলা : শিশুকে জোর করে কোনো খাবার খাওয়ানো বা ভালো খাওয়ার বিনিময়ে মিষ্টি বা চর্বিযুক্ত খাবার দিলে তার বিপরীত প্রভাব পড়ে। এতে তাদের সুস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি অনীহা বাড়ে। তবে খাবারের সঙ্গে খেলার সুযোগ দিলে নতুন কিছু গ্রহণের ভয় কমে যায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের বিটরুট বা ছোলার মতো খাবারের স্পর্শ, গন্ধ নিতে ও ভালোভাবে দেখার সুযোগ দিলে এবং খাওয়ার জন্য কোনো চাপ না দিলে পরবর্তী সময়ে তারা সেগুলো চেখে দেখতে বেশি আগ্রহী হয়। এমনকি রান্নার কাজে অল্প অংশ নিতে দিলেও তাদের নতুন খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ে।

গবেষণার সঙ্গে যুক্ত পরীক্ষামূলক শেফ জোজেফ ইউসেফ বলছেন, খাবারকে মজার ও খেলার মতো করে উপস্থাপন করলে শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই তার সঙ্গে মিশতে ও চেখে দেখতে চায়। চাপমুক্ত পরিবেশে তারা নতুন স্বাদ নিয়ে পরীক্ষা করতে পছন্দ করে।

এই ছোট ছোট পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করলে ধীরে ধীরে শিশুর নির্দিষ্ট খাবারের প্রতি একগুঁয়েমি ভাব কমে যাবে এবং গড়ে উঠবে দীর্ঘস্থায়ী সুস্থ ও সুষম খাদ্যাভ্যাস।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   বৈজ্ঞানিক  উপায়  বাচ্চা  প্রিয় খাবার  সবজি 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: