পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সুস্থ জীবনযাপনের জন্য জরুরি। বিশেষ করে কোভিড মহামারির পর অনেকের ভেতরেই সচেতনতা আরও বেড়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতাও হতে পারে ক্ষতির কারণ। এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, পরিচ্ছন্নতা অবশ্যই জরুরি, তবে অতিরিক্ত জীবাণুভীতি বা সব ধরনের অণুজীবকে নির্মূল করার চেষ্টা সবসময় উপকারী নয়।
ইমিউন সিস্টেম কীভাবে কাজ করে?
মানবদেহের ইমিউন সিস্টেম হলো একটি জটিল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা অন্যান্য ক্ষতিকর অণুজীব শরীরে প্রবেশ করলে- এটি তাদের শনাক্ত করে এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
তবে, ইমিউন সিস্টেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো- এটি শেখে। জীবনের শুরু থেকে বিভিন্ন অণুজীব, পরিবেশ এবং খাদ্যের সংস্পর্শে এসে এটি ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে কোনটি ক্ষতিকর, কোনটি নয়।
সব জীবাণুই কি ক্ষতিকর?
একেবারেই নয়। আমাদের শরীরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাক বাস করে, যাদের সম্মিলিতভাবে বলা হয় মাইক্রোবায়োম। এদের একটি বড় অংশ অন্ত্রে, ত্বকে এবং মুখগহ্বরে থাকে। এই উপকারী অণুজীবগুলো-খাবার হজমে সাহায্য করে, ভিটামিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে, ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ ছাড়া, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, সব জীবাণুকে ধ্বংস করার চেষ্টা করলে উপকারী অণুজীবেরও ক্ষতি হতে পারে।
‘হাইজিন হাইপোথিসিস’ কী?
১৯৮৯ সালে ব্রিটিশ গবেষক ডেভিড স্ট্রাচান একটি ধারণা দেন, যা হাইজিন হাইপোথিসিস নামে পরিচিত। এই ধারণা অনুযায়ী, শৈশবে খুব কম জীবাণুর সংস্পর্শে এলে ইমিউন সিস্টেম পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পায় না। ফলে, পরবর্তী জীবনে অ্যালার্জি, হাঁপানি কিংবা কিছু অটোইমিউন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে 'ওল্ড ফ্রেন্ডস হাইপোথিসিস' তুলে ধরেন। এতে বলা হয়, মানুষের শরীরের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সহাবস্থানকারী কিছু নিরীহ অণুজীবের সংস্পর্শে থাকা ইমিউন সিস্টেমের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত জীবাণুনাশক ব্যবহারের প্রভাব
প্রয়োজন ছাড়া নিয়মিত শক্তিশালী জীবাণুনাশক বা অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল পণ্য ব্যবহার করলে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন-
- ত্বকের স্বাভাবিক উপকারী ব্যাকটেরিয়া কমে যেতে পারে।
- ত্বক শুষ্ক ও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।
- কিছু জীবাণু ধীরে ধীরে জীবাণুনাশকের বিরুদ্ধে সহনশীলতা গড়ে তুলতে পারে।
- পরিবেশের মাইক্রোবায়োমেরও পরিবর্তন ঘটতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, জীবাণুনাশক ব্যবহার করা উচিত নয়। হাসপাতাল, অসুস্থ ব্যক্তির পরিচর্যা কিংবা সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে এগুলোর ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বারবার হাত ধোয়া কি ক্ষতিকর?
হাত ধোয়া সংক্রমণ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর একটি উপায়। তবে, প্রয়োজন ছাড়াই কয়েক মিনিট পরপর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া বা অতিরিক্ত অ্যালকোহলভিত্তিক স্যানিটাইজার ব্যবহার করলে ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, খাওয়ার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর, বাইরে থেকে বাড়ি ফিরলে, অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে এবং খাবার তৈরির আগে ও পরে ভালোভাবে হাত ধুতে হয়।
শিশুদের ক্ষেত্রে কী জানা জরুরি?
শিশুদের ইমিউন সিস্টেম ধীরে ধীরে পরিপক্ব হয়। তাই তাদের সবসময় সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত পরিবেশে রাখার প্রয়োজন নেই। নিরাপদ পরিবেশে মাটি, ঘাস, পোষা প্রাণী বা প্রকৃতির সংস্পর্শে আসা তাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, শিশুদের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে রাখা উচিত। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখেই স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়াই সবচেয়ে ভালো।
পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুভীতি এক নয়
পরিচ্ছন্ন থাকা একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস। কিন্তু যখন জীবাণুর ভয়ে কেউ অতিরিক্ত পরিচ্ছন্ন থাকার চেষ্টা করেন, তখন সেটি মানসিক চাপের কারণও হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই আচরণ অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডারের (ওসিডি) লক্ষণও হতে পারে, যেখানে ব্যক্তি অযৌক্তিক জীবাণুভীতির কারণে একই কাজ বারবার করেন।
সুস্থ থাকতে কী করবেন?
সুস্থ থাকতে কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
- সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান।
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
- নিয়মিত শরীরচর্চা করুন।
- অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক এড়িয়ে চলুন।
- সব টিকা সময়মতো নিন।
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- প্রয়োজন অনুযায়ী সাবান কিংবা জীবাণুনাশক ব্যবহার করুন, তবে অযথা নয়।
- প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটান এবং স্বাভাবিক পরিবেশে চলাফেরা করুন।
মানবদেহ মূলত কোটি কোটি উপকারী অণুজীবের সঙ্গে সহাবস্থান করেই সুস্থ থাকে। তাই সব জীবাণুকে নির্মূল করার চেয়ে ক্ষতিকর জীবাণু থেকে সুরক্ষা এবং উপকারী অণুজীবের সঙ্গে স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখবেন, অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতা নয়, সঠিক পরিচ্ছন্নতাই সুস্থ থাকার চাবিকাঠি।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ
সময়ের আলো/মহু