সীমান্তের শূন্যরেখায় অসীম শূন্যতা নিয়ে দিন যাপন করছে মানুষ। তারা বসে আছে সবুজ মাঠের আলপথে কিংবা শিমুলের রৗদ্র ছায়ায়। তাদের পায়ের তলায় যেন জল থইথই পারাবার, মাথার ওপর অচেনা আকাশ। তারা একেকজন বিষণ্ণ মেঘ হয়ে ঝুলে আছে তারকাঁটায়।
এ মানুষগুলো দেশ চেনে, রাষ্ট্র চেনে না। তারা চেনে জন্মভূমির সবুজ বৃক্ষ, বিন্নি ধানের খেত, জ্যোৎস্না লুটোপুটি খেলা মায়াময় বাড়ির উঠান। নদীর ভাটিয়ালি গানের সঙ্গে আজন্ম সখ্য তাদের। রাষ্ট্রের জটিল হিসাব আপন চৌকাঠ থেকে অনেক দূরে থেকেছে চিরকাল। অথচ, নিয়তি আজ তাদের ছেঁড়া মানচিত্রের মাঝখানে দাড় করিয়ে রেখে হাত গুটিয়ে বসে আছে।
যে মানুষটা জীবন সায়াহ্নে এসে শূন্যরেখায় দুপারের সীমান্তরক্ষীদের তাড়া খেয়ে বেড়াচ্ছে, সে ঠিক জানে না জন্মভূমির কোল তাকে গ্রহণ করতে কেন অপারগ, কেনইবা প্রতিবেশী দেশের কাছে সে এত অনাকাঙ্ক্ষিত।
৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মা চোখের ভেতর বান আটকে রেখে বৃষ্টিভেজা ফসলের মাঠে বসে ভাবছে, তার অনাগত সন্তানের কী কোনো দেশ থাকবে না, সে কী ভূমিহীন, পরিচয়হীন হয়ে জন্ম নেবে?
ক্ষুধা আর প্রচণ্ড রোদে কাঁদতে থাকা কোলের শিশুটা জানে না, সে কেন চোখ মেলে তাকাতে পারছে না, তার খেলনাগুলো কোথায় গেল, কোথায় তার চেনা ঘরের সিলিং কিংবা তার মা কেন বুকের দুধটাও ঠিকমতো খাওয়াতে পারছে না তাকে।
‘মাকে নিয়ে বাড়ি যাব’ বলে কান্না করা সেই ১২ বছরের শিশুটি জানে না, তার চেনা ঘরবাড়ি, স্কুল, পাড়ার অলিগলি কেন তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। ওরা কী সত্যিই মুখ ফেরায়, নাকি রাষ্ট্রই মানুষের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করে- ছোট্ট মেয়েটার কাছে তা ঠিক বোধগম্য নয়।
টানা ১৭ দিন ধরে আলপথে দিনরাত্রি যাপন করা সেই তিন তরুণ বুঝতে পারছে না, কেন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলো তাদের, কেনইবা আপনজনদের কাছে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না। যে মানুষগুলো একসময় ছিল হাত বাড়ানো দূরত্বে, হঠাৎ কেন তাদের সঙ্গে দেখা না হওয়ার, ছুঁতে না পারার যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি হলো।
যে শিমুল গাছের ছায়ায় বসে আছে কতগুলো ঘর হারানো মানুষ, সেই গাছটি হয়ত মনে মনে ভাবছে- দেশভাগকে আয়নায় কিছুটা এমনই লাগত দেখতে। তখনও তো মানুষ ঘর হারিয়েছিল, জমি হারিয়েছিল, হারিয়েছিল আজন্ম চেনা নিজের দেশ। দেশভাগ যদিও আরও অনেক কঠিন বাস্তব। যাক সে কথা….
সীমান্তের মানুষগুলো দুঃখ নিয়েই জন্মায় আসলে। তাদের পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নেই। কৃষিজমিতে যে একটু কাজ করে খাবে, সেখানেও নিরাপত্তার অভাব। সকালে তারা ঘর থেকে বেরিয়ে মাঠে যাওয়ার সময় জানে না, আবার ঘরে ফিরে আসতে পারবে কী না, আপন মানুষগুলোর মুখ দেখতে পারবে কী না। তাদের মরতে হয় দুর্যোগে, চিকিৎসার অভাবে, সীমান্তরক্ষীর গুলিতে; যেন যেচে অযাচিত মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে জন্মায় মানুষগুলো।
তাদের এত এত দুর্ভোগের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে পুশইনের শিকার হওয়া মানুষেরা। সীমান্ত অঞ্চলের মানুষদের দায়িত্ব এখন আরও বেড়ে গেছে। তারা নিজের জীবন ও জন্মভূমি রক্ষা করতে সীমান্তপ্রহরীদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে জরুরি নাগরিক ভূমিকা পালন করছে। দিনরাত জেগে থাকছে, সচেতন থাকছে মানুষগুলো। কখনও ঠেকিয়ে দিচ্ছে পুশইন, কখনও আবার নিজেদের মানুষদের ফিরিয়ে আনছে ওপারের সীমান্তরক্ষীদের হাত থেকে। কিন্তু জীবন তো এমন হওয়ার কথা ছিল না…..
সীমান্তের মানুষদের চেয়ে হয়ত শূন্যরেখার মানুষেরা আরও বেশি দুর্ভাগ্যের শিকার। সীমান্তের মানুষদের তবু দেশ আছে, শূন্যরেখার মানুষদের দেশ নেই, পরিচয় নেই। আছে ঠিকই, রাষ্ট্র তা স্বীকার করতে নারাজ। আর রাষ্ট্র স্বীকৃতি না দিলে প্রতিটা মানুষই তো আসলে মেঘের মতো ভাসমান। তারা তারকাঁটায় ঝুলে থেকে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে কেবল। তাদের সেই ক্ষত কেউ দেখে না।
শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন-
“তারপর, ভোরের সামান্য আগে
সীমান্তসান্ত্রির গুলি বুকে এসে লাগে–
মরণের আগে ঠিক বুঝতেও পারি না আমি
শরীর লুটাব কোন্ দেশে।”
আহা, কী নিদারুণ সত্যিই না তিনি বলে গেছেন। শূন্যরেখার মানুষগুলোকে জীবিত অবস্থায়ই কোনো দেশ নিতে চায় না, মরে গেলে তো মানুষ মূল্যহীন হয়ে যায়, তখন তাদের কেইবা নেবে? তাই মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও ঠিকানা হারানো মানুষগুলো বুঝতে পারে না- শরীরটা ঠিক কোন দেশে লুটাবে, কোনটা আসলে তার দেশ, কে নেবে তার লাশের ভার; জীবনের ভার না নেওয়ার দায় নিয়ে!
সময়ের আলো/মহু