কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইন চেষ্টার শিকার হয়ে দুই দেশের শূন্যরেখায় আটকে পড়া নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১২ জন ব্যক্তি চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছেন। দীর্ঘ দিন খোলা আকাশের নিচে অবস্থান, প্রচণ্ড গরম, মশার কামড় ও প্রায় দুই সপ্তাহ গোসল করতে না পারায় তারা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এদের মধ্যে আড়াই বছরের এক শিশুসহ চার শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক।
শনিবার (১৩ জুন) সকালে এ বিষয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই তা শেষ হয়। ফলে তীব্র মানবিক সংকটের মধ্যে এখনো শূন্যরেখাতেই দিন কাটছে এই ১২ জনের।
স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসকদের সূত্রে জানা গেছে, আটকে পড়া চার শিশুর সবাই তীব্র জ্বরে আক্রান্ত। এর মধ্যে আড়াই বছরের শিশু সামাদের শারীরিক অবস্থা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। এছাড়া বড়দের মধ্যে ঠান্ডা, কাশি ও চরম শারীরিক দুর্বলতার উপসর্গ দেখা দিয়েছে।
মানবিক দিক বিবেচনা করে স্থানীয় বাসিন্দারা বিজিবির নজরদারির মধ্যেই তাদের জন্য শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং স্থানীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থা করেছেন।
স্থানীয় চিকিৎসক শহিদুল ইসলাম জানান, আটকে পড়াদের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি চার শিশুর মধ্যে আড়াই বছরের একটি শিশু উচ্চ জ্বরে ভুগছে। বাকি তিন শিশুও সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত। বড়দের অবস্থাও ভালো নয়। দীর্ঘ ১২-১৫ দিন গোসল না করায় এবং খোলা পাটক্ষেতে মানবেতর অবস্থায় থাকায় তাদের এই পরিস্থিতি হয়েছে। আমি সাময়িকভাবে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি ওষুধ দিয়ে এসেছি।
সীমান্তের এই জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে আরও তিনটি পৃথক পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে বিএসএফের বিরুদ্ধে।
শুক্রবার দিবাগত রাতে চর বিলগাতুয়া সীমান্ত দিয়ে ৪ জন এবং জয়পুর সীমান্ত দিয়ে আরও ৮ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করা হয়।
রোববার (১৪ জুন) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে চল্লিশপাড়া সীমান্ত দিয়ে শাহাবুদ্দিন (৫৫) নামে এক ব্যক্তিকে অবৈধভাবে পুশইনের চেষ্টা চালালে বিজিবি তা প্রতিহত করে এবং তাকে ভারতের অভ্যন্তরে ফেরত পাঠায়।
বিজিবি জানিয়েছে, গত শুক্রবার (১২ জুন) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বিএসএফ প্রথম দফায় এই ১২ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালায়। বিজিবির কড়া নজরদারি ও টহলের কারণে বিএসএফের এসব ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে।
সীমান্তের উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে শনিবার (১৩ জুন) সকাল সাড়ে ৯টায় বিলগাতুয়া সীমান্তের ১৫০/৩-এস পিলার সংলগ্ন এলাকায় বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে এক পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিজিবির পক্ষে কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবির উপ-অধিনায়ক নূরুল হুদার নেতৃত্বে এবং বিএসএফের পক্ষে রানীনগর কোম্পানির কমান্ডার এসি সুনিল কুমার যাদবের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের প্রতিনিধি দল অংশ নেয়।
বৈঠকে বিএসএফ দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে পুশইনের অভিযোগ অস্বীকার করে এবং শূন্যরেখায় অবস্থানরত ব্যক্তিদের নিজেদের হেফাজতে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এ অবস্থায় বিজিবি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানালে বিএসএফ বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য সময় চেয়ে নেয়।
পুশইনের শিকার ব্যক্তিরা নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক বলে দাবি করেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার উজির আলী (৫০), তার স্ত্রী জয়নুর বেগম (৩৫), ছেলে শিহাদ (১৭), ইনজামুল (৮) ও আড়াই বছরের শিশু সামাদ। বাকিরা সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আরও দুটি পরিবারের সদস্য।
কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি জানান, বিএসএফ পুশইনের অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টি তদন্তের জন্য সময় চেয়েছে। বর্তমানে ওই ১২ জন ব্যক্তি শূন্যরেখার প্রায় ৫০ মিটার ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছেন।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/জোই