কাবাবের নাম শুনলেই অনেকের জিভে জল চলে আসে। কয়লার আগুনে ধীরে ধীরে সেঁকা মাংসের দারুণ সুঘ্রাণ, সঙ্গে নান, পরোটা কিংবা তাজা সালাদ, এমন খাবার পছন্দ করেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। গরু, খাসি, মুরগি, মাছ থেকে শুরু করে নানা ধরনের সবজি দিয়েও তৈরি করা যায় সুস্বাদু কাবাব। দেশভেদে এর স্বাদ, মসলা ও রান্নার ধরনে ভিন্নতা থাকলেও জনপ্রিয়তায় কাবাব বিশ্বজুড়ে সমানভাবে সমাদৃত।
প্রতি বছরের জুলাই মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার পালিত হয় ‘বিশ্ব কাবাব দিবস। কাবাবপ্রেমীদের কাছে দিনটি বিশেষ আনন্দের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রেস্তোরাঁগুলো এ উপলক্ষে বিশেষ মেনু, নতুন কাবাবের স্বাদ কিংবা আকর্ষণীয় ছাড়ের আয়োজন করে। একই সঙ্গে দিনটি কাবাবের দীর্ঘ ইতিহাস, বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য এবং বিশ্বজুড়ে এর সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে স্মরণ করারও একটি উপলক্ষ।
হাজার বছরের ঐতিহ্য
ইতিহাসবিদদের মতে, কাবাবের জন্ম হাজার বছর আগে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার যাযাবর জনগোষ্ঠীর হাত ধরে। শিকার করা পশুর মাংস ছোট ছোট টুকরো করে ধাতব শিক বা কাঠির সঙ্গে গেঁথে আগুনে সেঁকে খাওয়ার প্রচলন ছিল তাদের মধ্যে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে কাবাবের যাত্রা শুরু।
মুঘল আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে কাবাবের জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়। রাজকীয় রান্নাঘরে দই, ঘি, বাদাম ও বিভিন্ন সুগন্ধি মসলা ব্যবহার করে কাবাবকে আরও সমৃদ্ধ করা হয়। পরে এই খাবার রাজদরবারের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের কাছেও সমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কেন বিশ্ব কাবাব দিবস পালন করা হয়
বিশ্ব কাবাব দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এই খাবারের ইতিহাস, বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে উদযাপন করা। কাবাব শুধু একটি খাবার নয়, এটি বহু দেশের খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে কাবাব উপভোগ করার আনন্দও এই দিবসের অন্যতম আকর্ষণ।
বিশ্বজুড়ে কাবাবের বৈচিত্র্য
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের কাবাব জনপ্রিয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শিক কাবাব, শামি কাবাব, চাপলি কাবাব, ডোনার কাবাব, আদানা কাবাব, কোফতা কাবাব, চিকেন টিক্কা, বটি কাবাব এবং রেশমি কাবাব।
প্রতিটি কাবাবেরই রয়েছে নিজস্ব মসলার মিশ্রণ, আলাদা রান্নার কৌশল এবং পরিবেশনের স্বতন্ত্র ধরন, যা প্রতিটি অঞ্চলের খাদ্যঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
বাংলাদেশেও সমান জনপ্রিয়
বাংলাদেশে কাবাবের জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে রয়েছে অসংখ্য কাবাবের দোকান ও রেস্তোরাঁ। ঈদ, বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা বন্ধুদের আড্ডা, প্রায় সব আয়োজনেই কাবাবের উপস্থিতি থাকে বিশেষভাবে।
পুরান ঢাকার বিখ্যাত কাবাবের পাশাপাশি বিফ শিক কাবাব, বটি কাবাব, চিকেন কাবাব ও রেশমি কাবাব দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়। আধুনিক সময়ে বারবিকিউ গ্রিল কিংবা ওভেন ব্যবহার করে অনেকেই ঘরেই রেস্তোরাঁর স্বাদের কাবাব তৈরি করছেন।
সুস্বাদু কাবাব তৈরির কিছু সহজ কৌশল
ঘরে কাবাব বানাতে চাইলে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করলে স্বাদ আরও বেড়ে যায়। মাংস সমান আকারে কেটে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর দই, আদা, রসুন, লেবুর রস ও পছন্দের মসলা দিয়ে কয়েক ঘণ্টা মেরিনেট করলে মাংস আরও নরম ও সুস্বাদু হয়। মাঝারি আঁচে ধীরে ধীরে সেঁকতে হবে এবং বারবার উল্টে দিতে হবে, যাতে সব দিক সমানভাবে রান্না হয়। পরিবেশনের আগে সামান্য লেবুর রস ও ধনেপাতা ছড়িয়ে দিলে স্বাদ আরও বাড়ে।
হাজার বছরের ইতিহাস, বৈচিত্র্যময় স্বাদ এবং বিভিন্ন দেশের খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কারণে কাবাব আজ বিশ্বজুড়ে সমান জনপ্রিয়। তাই বিশ্ব কাবাব দিবস শুধু সুস্বাদু খাবার উপভোগের দিন নয়, বরং শতাব্দীজুড়ে গড়ে ওঠা এক সমৃদ্ধ খাদ্যঐতিহ্যকে স্মরণ ও উদযাপনেরও বিশেষ উপলক্ষ।
সময়ের আলো/এসএকে