চল্লিশে নারীর যত্ন

হৈমন্তী সরকার

ফিচার

নারীর জীবনে চল্লিশোর্ধ্ব সময়টা এক বিশেষ অধ্যায়। সন্তান, পরিবার, কাজ- সব দায়িত্ব সামলে অনেকেই যখন একটু নিজের দিকে তাকানোর সুযোগ

2026-03-04T15:44:45+00:00
2026-03-04T15:44:45+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
ফিচার
চল্লিশে নারীর যত্ন
হৈমন্তী সরকার
প্রকাশ: বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬, ৩:৪৪ পিএম   (ভিজিট : ৯৭)
সংগৃহীত ছবি
নারীর জীবনে চল্লিশোর্ধ্ব সময়টা এক বিশেষ অধ্যায়। সন্তান, পরিবার, কাজ- সব দায়িত্ব সামলে অনেকেই যখন একটু নিজের দিকে তাকানোর সুযোগ পান, তখনই শরীর ও মনে শুরু হয় নানা পরিবর্তন। এই পর্যায়ে শারীরিক ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রেই নানাবিধ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। হরমোনের ওঠা-নামা, শক্তি কমে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা বা হঠাৎ মেজাজ বদলে যাওয়া- এসবই এই সময়ের বাস্তবতা। 

হরমোনজনিত পরিবর্তনের ফলে অনেক নারীর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসে, হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সচেতন থাকলে এবং জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনলে এই বয়সটাকেই সুস্থ ও প্রাণবন্তভাবে উপভোগ করা সম্ভব। তাই এই বয়সে নারীদের জন্য সঠিক যত্ন ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত জরুরি।

চল্লিশের পর নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। এর প্রভাবে ওজন বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে। অনেকের ক্ষেত্রে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, চুল পাতলা হয়ে যাওয়া কিংবা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। আবার কেউ কেউ ঘুমের ব্যাঘাত বা হালকা বিষণ্নতার মতো সমস্যার কথাও জানান। তাই এই সময় শরীরের সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এসব সমস্যা এড়াতে হলে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অপরিহার্য।

খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমে যেতে পারে। দুধ, দই, পনির, ছোট মাছ কাঁটাসহ, তিল ও ডিম নিয়মিত খেলে হাড় মজবুত থাকে। পাশাপাশি প্রতিদিন কিছুটা সময় শরীরে রোদ লাগলে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পূরণ করা সহজ হবে।
আরও পড়ুন

প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার শরীরের পেশি ও শক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে। মাছ, মুরগি, ডিম, ডাল, ছোলা ও সয়াবিন এই বয়সের নারীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী। একই সঙ্গে আঁশযুক্ত খাবার যেমন শাকসবজি, ফলমূল ও লাল চাল হজম শক্তি বাড়ায় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে।

এই বয়সে কোষ্ঠকাঠিন্য বা গ্যাসের সমস্যা বাড়তে পারে, যা আঁশ ও পর্যাপ্ত পানি পান করলে অনেকটাই কমে যায়। প্রতিদিন অন্তত আট থেকে দশ গ্লাস পানি পান করা ভালো অভ্যাস। অনেকেই ওজন কমানোর চিন্তায় খাওয়া কমিয়ে দেন কিন্তু প্রয়োজনীয় পুষ্টি না পেলে শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়ে বরং পরিমিত ও সুষম খাদ্যই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

রক্তস্বল্পতা অনেক নারীর দীর্ঘদিনের সমস্যা। আয়রন ও ফলিক এসিডসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খেলে এ ঝুঁকি কমানো যায়। পালংশাক, বিট, কলিজা, ডাল ও কিশমিশ নিয়মিত খেলে রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি কমে। তবে একই সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি ও লবণ এড়িয়ে চলা জরুরি। বেশি চিনি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায় আর বেশি লবণ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়।

খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা এই বয়সে এক প্রকার ওষুধের মতো কাজ করে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম শরীর সচল রাখে। এতে শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে না, মানসিক চাপও কমে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, নিয়মিত হাঁটা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। 

পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক প্রশান্তি সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাত জেগে কাজ বা মোবাইল ব্যবহার করলে ঘুমের চক্র বিঘ্নিত হয়। চেষ্টা করা উচিত নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং সাত থেকে আট ঘণ্টা বিশ্রাম নেওয়া। মানসিক প্রশান্তির জন্য বই পড়া, প্রার্থনা, গান শোনা বা প্রিয় কাজের সঙ্গে সময় কাটানোও ভালো ফল দেয়।

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা যেমন রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করলে অনেক রোগ আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব। পাশাপাশি ত্বক ও চুলের যত্নেও সচেতন হতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং রাসায়নিক প্রসাধনী কম ব্যবহার করলে ত্বক ভালো থাকে। বাইরে গেলে সানস্ক্রিন ব্যবহার এবং চুলে নিয়মিত পুষ্টিকর তেল বা প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার উপকারী। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে।

চল্লিশোর্ধ্ব বয়স নারীর জীবনের শেষ অধ্যায় নয় বরং এটি নিজের অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও আত্মবিশ্বাসের সময়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক যত্ন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে এই সময়টি আরও সুস্থ, কর্মক্ষম ও সুন্দর করে তোলা সম্ভব। নিজের যত্ন নেওয়া বিলাসিতা নয় বরং প্রয়োজন- এ কথাটা মনে রাখলেই পথটা সহজ হয়ে যায়।

লেখক :
পুষ্টিবিদ, উত্তরা জেনারেল হাসপাতাল

এএডি/


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: