ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে। ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই আশঙ্কা কিছুটা জোরালো হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও কাতারসহ অন্য দেশগুলো থেকে সময়মতো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বন্ধ হওয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায়।
এতে বাংলাদেশের পূর্ব ঘোষিত কয়েকটি জাহাজ আসা অনিশ্চিত হয়ে গেছে। দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দ্বিগুণেরও বেশি দামে দুই কার্গো এলএনজি কিনেছে সরকার। এছাড়া সরকার ইতোমধ্যে সাশ্রয়ী হওয়াসহ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এদিকে, ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর এলিট শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কিওমার্স হায়দারি শুক্রবার ইরানের আধাসরকারি সংবাদমাদ্যম তাসনিম নিউজকে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইউরোপীয় দেশগুলো এবং তাদের মিত্র-সমর্থকদের জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
তবে, এর বাইরে থাকা দেশগুলো— অর্থাৎ যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মিত্র নয়, সেসব দেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলে কোনো বাধা নেই। এই খবরও দেশে জ্বালানি সরবরাহের জন্য সুখবর বলে মনে করছে জ্বালানি বিভাগ।
এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে বলেন, এর ফলে সীমিত পরিসরে হলেও জাহাজ চলাচল শুরু হবে। আর তাহলেই জ্বালানি নিয়ে শঙ্কার মেঘ কেটে যাবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু শনিবার বলেছেন, আমাদের তেলের কোনো অভাব নেই, মানুষ এই ভয়ে স্টক করা শুরু করেছে। শুধু তাই না, আগামী ৯ মার্চ আরও দুটি ভেসেল আসছে। সুতরাং তেলের কোনো সমস্যা নেই।
তিনি বলেন, যুদ্ধ কবে থামবে আমরা কেউই যানি না, সেজন্য আমরা সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে সঞ্চয় করছি। এই খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলমান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব বাজারে ব্রেন্ট ক্রড ওয়েল, পেট্রোল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাৎক্ষণিক সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে দামের চাপ।
দেশের মোট জ্বালানির বড় অংশ আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই বাড়ে আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা প্রতিদিন ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট, কিন্তু সরবরাহ সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিন মাত্র ৮৫০-৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
এ হারে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে উৎপাদনে ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আপৎকালীন জ্বালানি মজুত সক্ষমতা সীমিত হওয়ার কারণে যে কোনো বাহ্যিক ধাক্কাই সরাসরি বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি করে জ্বালানি নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে।
ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (দায়রা) এর গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, দেশের বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশ গ্যাসভিত্তিক।
রফতানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে টেক্সটাইল খাত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। দেড় হাজারের বেশি টেক্সটাইল কারখানা উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহার করে। প্রাকৃতিক গ্যাস বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৬০ শতাংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেড় হাজারের বেশি বস্ত্রকল প্রসেস-হিট ও ক্যাপটিভ জেনারেশনের (তাপ-প্রক্রিয়া ও নিজস্ব বিদ্যুৎ) জন্য গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।
শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধানের সেচ সম্পূর্ণভাবে ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে ব্যবহৃত হয় যথাক্রমে ডিজেল ও গ্যাসচালিত ট্রাক ও বাস। নৌ-পরিবহন পুরোটাই ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। শহর ও গ্রামে রান্নায় এলপিজি ব্যবহৃত হয়। ফলে জ্বালানিতে সংকট সৃষ্টি হলে অন্য সব খাতেই তার বহুমাত্রিক প্রভাব পড়ে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধের শঙ্কার আগেই গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পেরিয়ে আসা ১৫টি পণ্যবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এসব জাহাজে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন জ্বালানি তেল, গ্যাস ও শিল্পের কাঁচামাল রয়েছে, যা দেশের শিল্প ও জ্বালানি খাতকে চাঙা রাখবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ১৫টি জাহাজের মধ্যে ১২টি ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। বাকি তিনটি জাহাজ এই সপ্তাহের মধ্যেই বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী চারটি জাহাজ, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বহনকারী দুটি জাহাজ এবং বাকি নয়টিতে সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল ক্লিংকারসহ অন্যান্য উপকরণ রয়েছে।
মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে এই ভাবনা থেকেই সরকার আগেভাগেই সাশ্রয়ী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সারকারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন যে গ্যাস সরবরাহ করা হতো তাও কমানো হয়েছে। জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং করা হচ্ছে। পাচার ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে একগুচ্ছ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে ২ জাহাজ এলএনজি কেনা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে চলতি সপ্তাহে কয়েকটি জাহাজ আসবে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিও সচল হতে শুরু করেছে। আশা করছি জ্বালানির কোনো সংকট হবে না। মানুষ শুধু শুধু আতঙ্কিত হয়ে মজুত করতে চাইছে।
পেট্রোল পাম্প মালিকদের দাবি, আতঙ্কের কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় গত দুই দিনে অনেক বেশি তেল বিক্রি হয়েছে। এতে করে অনেক পাম্পে মজুত দ্রুত শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি নাজমুল হক বলেন, অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল নিয়েছেন। ফলে বেশ কয়েকটি পাম্পে তেল ফুরিয়ে গেছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেছেন, বিভিন্ন দেশের সাথে আমাদের দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় যেসব কার্গো ১৫ তারিখের মধ্যে আসার কথা সেগুলো ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি বা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে ১৫ থেকে ১৮ তারিখের মধ্যে ১-২টা কার্গো নিয়ে সংকট তৈরি হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমরা সরবরাহকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি কীভাবে বিকল্প উপায়ে এলএনজি আমদানি করা যায়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দেশে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
মন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা থেকে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে। তবে বাস্তবে দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সংকট এড়াতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পরিকল্পনাও প্রস্তুত করে রেখেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন হলে সেসব বিকল্প উৎস ব্যবহার করা হবে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, আগামী ৯ মার্চ দেশে আরও দুটি জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
তবে গুজব বা আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ না করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, প্যানিক হয়ে কেউ যেন প্রয়োজনের বেশি তেল সংগ্রহ না করেন। এতে অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হয়।
মন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সরকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে।
সময়ের আলো/এআর