ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা-পাল্টাহামলার আগুনের শিখা যেন আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির উত্তাপ যেন কমছেই না। যদিও এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব এখনও বাংলাদেশে তেমনভাবে পড়েনি, তবু পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের কারণে বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন বাজারে ইতিমধ্যে তার আভাস মিলেছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে পরিবহন ভাড়া বাড়ার কথা বলে ব্যবসায়ীরা মুরগির দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে হুহু করে বাড়ছে মুরগির দাম। প্রতিনিয়ত এ মূল্যবৃদ্ধিতে হাঁসফাঁস করছেন সাধারণ ক্রেতারা। অন্যদিকে মাছ, গরু-খাসির মাংস ও সবজির বাজার এখনও তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও, বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এসব পণ্যের দামও বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে এ পরিস্থিতি পুঁজি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে- এমন আশঙ্কা করছেন সচেতন নাগরিকরা।
রাজধানীর বড় পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, অন্যান্য পণ্যের তুলনায় বর্তমানে মুরগির দামই সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। শনিবার ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৩০ টাকায়, যা আগের দিনের তুলনায় ১০ টাকা বেশি। সপ্তাহের ব্যবধানে এই মুরগির দাম বেড়েছে প্রায় ৬০ টাকা। একই অবস্থা সোনালি মুরগির ক্ষেত্রেও। বর্তমানে সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৩৩০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ২৭০ থেকে ২৮০ টাকার মধ্যে।
মুরগির দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে বিক্রেতারা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ার কথা জানান। বাজারের ‘মামা-ভাগ্নে’ দোকানের এক কর্মচারী বলেন, প্রতিদিনই মুরগির দাম প্রায় ১০ টাকা করে বাড়ছে। পরিবহন খরচ বাড়ায় বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে ব্রয়লার মুরগির দাম আড়াইশ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এখনও অন্যান্য পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়নি। বাজারে ফার্মের ডিম ডজনপ্রতি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের দামও আগের মতোই রয়েছে বলে জানান বিক্রেতারা। সবুজ হাসান নামে এক মাছ বিক্রেতা বলেন, মাছের দাম এখনও তেমন বাড়েনি। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়লে কয়েক দিনের মধ্যে দাম বাড়তে পারে। গরু ও খাসির মাংসের দামও তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকায় এবং গরুর মাংস কিছু দিন আগে বাড়িয়ে বর্তমানে ৭৮০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে রমজান উপলক্ষে সবজির দাম কিছুটা বেশি থাকলেও রোজার শুরুর সময়ের তুলনায় তা কিছুটা কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এখনও সবজির দাম বাড়ানো হয়নি বলে জানান ব্যবসায়ীরা, তবে পরিস্থিতি অবনতির দিকে গেলে দাম বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
ফলের বাজারও এখনও আগের মতোই ঊর্ধ্বমুখী। তবে অনেক ফল আগে থেকেই মজুদ থাকায় নতুন করে দাম বাড়াননি বিক্রেতারা। জোবায়ের নামে এক ফল ব্যবসায়ী বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কোনো প্রভাব এখনও ফলের বাজারে পড়েনি। অন্যান্য দিনের মতোই একই দামে ফল বিক্রি করা হচ্ছে। খেজুরের দামও নতুন করে বাড়ানো হয়নি বলে জানান তিনি।
কিছু পণ্যের দাম বাড়লেও বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের দাম এখনও বড় ধরনের বৃদ্ধি পায়নি। তবে বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সামনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে নিয়মিত বাজার মনিটরিং জোরদারের দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা।
ক্রেতা সুস্মিতা কর বলেন, কোনো ইস্যু তৈরি হলেই আমাদের বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এখন ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের অজুহাতে কিছু পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। সামনে আরও অনেক পণ্যের দাম বাড়াতে পারে সিন্ডিকেট। অন্তত কৃত্রিম সংকট ঠেকানো গেলে আমরা দামের ঊর্ধ্বগতি থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পেতে পারি। সংকটাপন্ন পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস-প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, অনেক পণ্যেরই স্টক থাকার কারণে আমাদের এখনি সংকট তৈরি হবে না।
ঈদের পর যদি যুদ্ধের এই অবস্থা চলমান থাকে তা হলে সংকট হতে পারে। তবে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে বাজারে পড়ে গেছে। অসাধু চক্র তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ভাড়া বাড়ার কথা বলে অনেক পণ্যেই দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন বাজারে একদমই মনিটরিং নেই। আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে বাজার মনিটরিংয়ের বিষয়ে বলছি কিন্তু নতুন সরকার এই বিষয়ে খুব একটা কড়া নির্দেশনা দেয়নি এখনও। এ ছাড়া এখন কাপড় ও কসমেটিকসের বাজারের দিকে সবার মনোযোগ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার প্রায়োরিটির নিচে রয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
সময়ের আলো/কেএইচও