এক হাত ঘুরে অন্য হাত, এভাবেই সারা দিন দোকানের ক্যাশবাক্স কিংবা পকেটের ভাঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছে টাকা। ধনী থেকে গরিব সবার কাছেই বদল হয় একই কাগুজে নোট। সময়ের ব্যবধানে জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে পড়ে টাকা। বর্তমানে ছেঁড়া-ফাটা, জোড়াতালি মারা মলিন নোটে সয়লাব হয়ে পড়েছে বাজার।
এসব নোট নিয়ে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষসহ ব্যবসায়ী ও পরিবহন কর্মীরা। ছেঁড়া-ফাটা নোট বদলাতে ব্যাংকে গেলেও এক দিনে সব টাকা বদলানো যাচ্ছে না। একই সঙ্গে কাগজ ও কালি সংকটের কারণে নতুন নোট ছাপানো ও সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে। এদিকে সামনে ঈদকে কেন্দ্র করে চাহিদা বেড়েছে নতুন টাকার। তবে এবারও নানা সংকটে তুলনামূলক কম ছাড়া হবে নতুন টাকা।
জানা যায়, দেশে কাগুজে নোটের প্রচলন বেশি। এসব নোটের স্থায়িত্ব সাধারণত ৬ থেকে ৮ মাস হয়ে থাকে। এই সময়ে অধিকাংশ নোট ব্যবহারে অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বর্তমানে বাজারে বিশেষ করে ১০, ২০ ও ১০০ টাকার নোটের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক।
ব্যাংকারদের দাবি, বড় অঙ্কের টাকা উত্তোলনের পরে গ্রাহকের চাহিদামতো নোটগুলো ভালোভাবে সাজিয়ে দিতে পিন মারা হয়। নোটের এক মাথায় পিন মারার ফলে টাকা গুনতেও সুবিধা হয়। আবার পিন মারা বা স্ট্যাপলিং করার জন্য ব্যাংক বিভিন্ন শাখায় বড় মেশিনও রাখে। এই পিন মারার ফলে টাকার বেশি ক্ষতি হয় এবং ব্যাংক নোটের স্থায়িত্ব কমে যায়। এ ছাড়া গ্রাহকদের অতিরিক্ত হাত বদলের কারণে এই কাগুজে নোটের অবস্থা আরও বেহাল হয়ে পড়ে।
কারওয়ান বাজারে সবজি বিক্রি করা তবিবুর রহমান বলেন, নিয়মিত ক্রেতাদের কাছ থেকে দুয়েকটি করে ছেঁড়া নোট নিতে হয়। কিন্তু ব্যাংকে গিয়েও সব একসঙ্গে বদলানো যায় না। কয়েক ধাপে বদলাতে বলেছে। মাঝেমধ্যে বিপদে পড়ে যাই এসব ছেঁড়া-ফাটা নোট নিয়ে।
সাবিহা জাহান নামে এক বেসরকারি চাকরিজীবী জানান, আসলে টাকা কিছুটা পুরোনো হলেও সমস্যা হতো না। কিন্তু বর্তমানে এতটা নিম্নমানের পাই যে টাকাগুলো হাতে ধরতেও খারাপ লাগে। তা ছাড়া এতটা ময়লা হয়ে থাকে যে জীবাণুতে ভরপুর। এক প্রকার বিরক্তকর অবস্থা তৈরি হয়েছে। টাকা তো আর ফেলানো হয় না, তা হলে নতুন নোটের সরবরাহ কেন করা যাচ্ছে না? নতুন নোট হলে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ব্যবহার করতে পারতাম। উন্নত দেশে কখনো এত পুরোনো কাগুজে নোট ব্যবহার করা হয় না।
হাতে অনেক বেশি ছেঁড়া নোট পড়ার কথা জানিয়েছেন গাবতলী লিঙ্ক রোড পরিবহনের এক সুপারভাইজার। তিনি বলেন, অন্য কোথাও না চলা ছেঁড়া নোট অনেক যাত্রী ভাড়া হিসেবে দেন। নিতে না চাইলে যাত্রী খারাপ ব্যবহার করেন। সবসময় আমরা ব্যাংক থেকে নোট বদলানোর সুযোগ পাই না। তাই অনেক সময় লোকসান দিয়ে গুলিস্তানের ফুটপাথের অস্থায়ী টাকার হাটে কম মূল্যে ছেঁড়া টাকা বদলাতে হয়। একই দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন শাহরিয়ার নামে এক চা দোকানি।
একাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও পুরোনো টাকায় ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন প্রতিবেদককে। শুধু মানুষের হাতে নয়, ছেঁড়া নোট পাওয়া যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথেও। যা ভোগান্তিতে ফেলছে মানুষজনকে। কারওয়ান বাজারের ইসলামী বুথে টাকা তোলার কথা জানিয়ে এএইচ ফাহিম নামে এক ব্যক্তি জানান, বিকালে বুথ থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা তুলেছি। সেখানে এক হাজার টাকার একটি নোট ছেঁড়া পেয়েছি। অবাক হয়ে গেলাম যে বুথে কেন ছেঁড়া নোট থাকবে। আবার ব্যাংকে কষ্ট করে গিয়ে এই নোট ফেরত দিতে হবে যদি বাজারে না চালাতে পারি।
এদিকে তফসিলি ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় এসব ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লা ব্যাংক নোট বা টাকা গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া ‘ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লা নোট গ্রহণ করা হয়’ এমন বিজ্ঞপ্তি শাখার দৃশ্যমান স্থানে ও রঙিন অক্ষরে লিখে টানানোর জন্য ব্যাংকগুলোর প্রতি নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
পরিপত্রে বলা হয়, ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় আবশ্যিকভাবে কাউন্টারের সামনে বা জনসাধারণের সহজে দৃষ্টিগোচর হয় এমন স্থানে ২০ ফন্টে রঙিন কালিতে লিখিত বিজ্ঞপ্তি প্রদর্শন করতে হবে। ফলে ময়লা নোট বদলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে ছেঁড়া-ফাটা ও পুরোনো ময়লা নোট বিনিময়ের এই সুযোগ রয়েছে।
সেখানে আগে পুরোনো নোটের বদলে নতুন নোট দেওয়া হলে এবার বেশি পুরোনো নোটের বদলে কম পুরোনো নোট বিনিময় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ছেঁড়া, পোড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত নোটের বিনিময়মূল্য ফেরত দেওয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিমালা ঘোষণা করেছে। এখন থেকে গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে নষ্ট হওয়া নোটের নির্দিষ্ট অংশ অনুযায়ী অর্থ ফেরত পাবেন।
তবে নতুন বিধান অনুযায়ী কোনো নোটের ৯০ শতাংশের বেশি বিদ্যমান থাকলে পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। নোটের ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ থাকলে মূল্যের ৭৫ শতাংশ ফেরত, নোটের ৫১ থেকে ৭৫ শতাংশ থাকলে ৫০ শতাংশ অর্থ ফেরত। কোনো নোটের ৫১ শতাংশের কম থাকলে বিনিময়মূল্য পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া নোট একাধিক খণ্ডে বিভক্ত হলে এবং দুটি প্রান্তের নম্বর মিল থাকলে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ নোট থাকলে ৫০ শতাংশ অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে। পোড়া নোট অখণ্ডিত থাকলে এবং নোটের আয়তন কমপক্ষে ৫১ শতাংশ হলে বা খণ্ডিত নোটের দুই প্রান্তের নম্বর মিল থাকলে ৫০ শতাংশ অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন বা টাকশাল গত বছরের মে মাসে নতুন নকশার নোট ছাপায়। প্রথম ধাপে ২০, ৫০ ও ১০০০ টাকার নতুন নকশার নোট বাজারে ছাড়ে। নতুন নোটে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবির পরিবর্তে যুক্ত হয় ধর্মীয় স্থাপনা, বাঙালি ঐতিহ্যসহ জুলাই বিপ্লবের গ্রাফিতি।
তবে সব ধরনের টাকা ও ধাতব মুদ্রায় শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি থাকায় গত এপ্রিলের শুরুতে হঠাৎ নতুন নোট বাজারে ছাড়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে ঈদুল আজহায় নতুন নোট বাজারে ছাড়া হয়। টাকশালের এক কর্মকর্তা জানান, বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত লাখ লাখ নোট এখনও বিভিন্ন ব্যাংকের ভল্টে পড়ে আছে। এসব নোট চাইলেই হুট করে বাতিল করা যাবে না। নতুন নকশার নোট বাজারে এলে ধীরে ধীরে পুরোনো নোটগুলো তুলে নিতে হবে।
এদিকে কাগুজে নোটের এমন পরিস্থিতিতে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে নতুন টাকার ব্যবসা। চাহিদার তুলনায় ব্যাংকগুলো নতুন নোট দিতে না পারায়, অনেক নোট ব্যবহারে অনুপযোগী হয়ে পড়ায় জমজমাট হয়ে উঠেছে নতুন টাকার ব্যবসা। গুলিস্তান ও মতিঝিল সেনা কল্যাণ ভবনের সামনের ব্যবসায়ীরা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কম দামে ছেঁড়া নোট কিনছেন।
এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন গ্রাহকরা। মতিঝিলে নতুন নোটের এক ব্যবসায়ী বলেন, এখন নতুন নোট বাজারে না থাকায় পুরোনো নোট বেড়েছে। অনেক অচল নোট যেগুলো আছে সেটা আমরা বদলে দিই। আগে এ ধরনের নোট কম এলেও এখন বেশি আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সময়ের আলোকে বলেন, আমরা প্রতিনিয়তই নোট ছাপানোর কাজ করছি। তবে একসঙ্গে ৯ প্রকার নোটের ছাপানোর কাজ করতে গিয়ে মার্কেটের চাহিদা অনুযায়ী কম ছাপানো হচ্ছে। এ ছাড়া মেশিনের ক্যাপাসিটিরও একটা বিষয় আছে।
তবে নোটের কাগজ, কালি ও সিকিউরিটি থ্রেটের কারণে কিছুটা সমস্যা আছে সেটাও সত্য। সবমিলিয়ে বাজারে পুরোনো নোট একটু বেশি হয়ে গেছে। নতুন নোট সরবরাহ স্বাভাবিক হতে এখনও কিছুটা সময় লাগবে। ঈদ উপলক্ষে নতুন নোট সরবরাহের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা সেই জায়গা থেকে সরে এসেছি। ঈদ উপলক্ষে বাজারে অনেক বেশি নোট ছাড়ার জন্য সেই পরিমাণ প্রিন্টেড নোট আমাদের নেই।
তিনি আরও বলেন, নতুন নোট ছাপাতে হলে আগের ভল্ট খালি করতে হয়। সে জন্য আগের ছাপানো শেখ মুজিবুর রহমানের ছবির নোটগুলো বাজারে ছাড়া হবে কি না সেটার সঙ্গে একটা রাজনৈতিক ইস্যু জড়িত। এর আগে সংকটের কারণে আমরা এসব নোট ছাড়তে চেয়েছিলাম।
কিন্তু অনেক বেশি রিপারমিশনের কারণে পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। এখনও সেগুলো নিয়ে চিন্তা করা হয়নি, ওইভাবেই আছে। বর্তমানে নতুন সরকার ও নতুন গভর্নর আছেন তারা সিদ্ধান্ত নেবেন কী করা যায়।
সময়ের আলো/এআর