প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের পর এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সাধারণত কোনো বৈদেশিক সংঘাতের শুরুতে মার্কিন নাগরিকরা যেভাবে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়ান, এবার তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপ বলছে, অতীতের প্রায় প্রতিটি যুদ্ধের তুলনায় ইরানের ওপর এই হামলার প্রতি সাধারণ আমেরিকানদের সমর্থন অনেক কম।
রয়টার্স/ইপসোস এবং ফক্স নিউজের মতো বিভিন্ন সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, এই হামলার পক্ষে সমর্থন মাত্র ২৭ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে দোদুল্যমান। জনমতের এই বিশাল ব্যবধান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সাধারণ মানুষ এখনো হামলার বিস্তারিত ফলাফল এবং এর পরবর্তী প্রভাব সম্পর্কে বোঝার চেষ্টা করছে। তবে সমর্থনের এই সর্বোচ্চ হারও (৫০%) ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অনেক কম।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অতীতে আমেরিকা যখনই কোনো যুদ্ধে জড়িয়েছে, শুরুতেই বিপুল জনসমর্থন পেয়েছে। ১৯৪১ সালে পার্ল হারবার হামলার পর জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণায় ৯৭ শতাংশ আমেরিকানের সমর্থন ছিল। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে ছিল ৯২ শতাংশ মানুষ। ১৯৯১ সালে পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্তে ৮২ শতাংশ এবং ১৯৮৯ সালে পানামা অভিযানে ৮০ শতাংশ মানুষের সমর্থন ছিল।
এমনকি ২০০৩ সালের বিতর্কিত ইরাক যুদ্ধের শুরুতেও ৭৬ শতাংশ মানুষ একে সমর্থন করেছিলেন। ১৯৫০ সালে কোরিয়া যুদ্ধের শুরুতে সমর্থন ছিল ৭৫ শতাংশ। এর তুলনায় কসোভো (১৯৯৯) এবং গ্রেনাডা (১৯৮৩) অভিযানে সমর্থন কিছুটা কম থাকলেও তা যথাক্রমে ৫৮ শতাংশ এবং ৫৩ শতাংশ ছিল। এমনকি ২০১১ সালের লিবিয়া হস্তক্ষেপেও ৪৭ শতাংশ মানুষের সমর্থন ছিল। অথচ ২০২৬ সালের এই ইরান যুদ্ধের শুরুতে গড় সমর্থন মাত্র ৪১ শতাংশ, যা যেকোনো বড় সংঘাতের শুরুর তুলনায় অনেক নগণ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জনসমর্থন কম হওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ব পরিকল্পনার অভাব।
শিকাগোর লয়োলা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সারা ম্যাক্সির মতে, ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের আগে প্রায় এক বছর ধরে প্রচারণা চালিয়ে জনগণকে এর গুরুত্ব বোঝানো হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান অভিযানের আগে তেমন কোনো সুস্পষ্ট যোগাযোগ কৌশল দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, হার্ভার্ডের অধ্যাপক ম্যাথিউ বামের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন চরমভাবে বিভক্ত। আগে সংকটের সময় বিরোধী দলের সমর্থকরাও প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়াত, যাকে বলা হয় ‘র্যালি অ্যারাউন্ড দ্য ফ্ল্যাগ’ ইফেক্ট। কিন্তু বর্তমান মেরুকরণের যুগে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের কোনো পদক্ষেপে সায় দিতে নারাজ। এমনকি ট্রাম্পের নিজের সমর্থকদের একাংশও তাকে ভোট দিয়েছিল মূলত যুদ্ধ থেকে দেশকে দূরে রাখার জন্য, নতুন কোনো যুদ্ধে জড়ানোর জন্য নয়।
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এবং হতাহতের সংখ্যা বাড়লে জনসমর্থন দ্রুত কমতে থাকে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের শুরুতে ৬০ শতাংশ মানুষ একে ভুল মনে না করলেও ১৯৬৯ সাল নাগাদ অধিকাংশ আমেরিকানই এর বিরোধিতা শুরু করেন।
ইরাক যুদ্ধের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, শুরুর উচ্চ সমর্থন শেষ দিকে এসে ৪৩ শতাংশে নেমে গিয়েছিল। বর্তমানে ইরান হামলার ক্ষেত্রে শুরুতেই যে অনীহা দেখা যাচ্ছে, তা মার্কিন বৈদেশিক নীতির ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
অধ্যাপক বামের ভাষায়, সেই দিনগুলো এখন অতীত, যখন বলা হতো রাজনীতি দেশের জলসীমার ভেতরেই সীমাবদ্ধ।অর্থাৎ, বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যের যে চিরাচরিত রূপ আমেরিকায় দেখা যেত, ইরান হামলার ঘটনায় তা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছে।
সময়ের আলো/আরবিএন