অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে বসানোর প্রবণতা আবারও বাড়ছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও এই ধারা অব্যাহত থাকায় প্রশাসনের নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
পদোন্নতির প্রত্যাশায় থাকা কর্মকর্তারা বলছেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে সচিব পদগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্য ‘ব্লক’ হয়ে যাচ্ছে, ফলে যোগ্য অনেক কর্মকর্তার পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষ করে প্রশাসনে আগামী এক বা দুই বছরের মধ্যে যারা সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি পেতে চান নতুন করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ওইসব ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চুক্তিতে থাকা ১০১ কর্মকর্তার চুক্তি বাতিল করে বিভিন্ন ধাপে নতুন ৭৯ জনকে চুক্তিতে নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছিল অন্তবর্তী সরকার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র ও ভূমি মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক সচিব ও সিনিয়র সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অবসরে যাওয়া অনেক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে চুক্তিতে নিয়োগে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়া কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৩ জন সচিবকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের পাশাপাশি বেশ কয়েকজনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সচিব ও সচিব পদমর্যাদার গ্রেড-১ পদসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ছিলেন ৭৯ জন কর্মকর্তা। সম্প্রতি বেশ কয়েকজনের চুক্তি বাতিল হওয়ায় এ সংখ্যা ৬৬-তে নেমে এসেছে। বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে সাবেক কর্মকর্তা এবিএম আব্দুস সাত্তার এবং স্বরাষ্ট্র সচিব পদে মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।
সবশেষ গত ৩ মার্চ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও কৃষি মন্ত্রণালয়ে এক বছরের চুক্তিতে চারজনকে সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, আব্দুল খালেককে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মো. শহীদুল হাসানকে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং আর রফিকুল আই চৌধুরীকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ১ মার্চ মুনশি আলাউদ্দিন আল আজাদকে এক বছরের চুক্তিতে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নিয়োগ দেয় সরকার। চুক্তিতে নিয়োগ এই কর্মকর্তারা প্রশাসন থেকে বিদায় নিয়েছেন ১৭ থেকে ২০ বছর আগে এবং তাদের বয়স ৬৫ থেকে ৭৫ বছর।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন, বিএনপি দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তবর্তী সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া একাধিক সচিবের নিয়োগ বাতিল করে। এমনকি এক দিনে ৯ সচিবের চুক্তি বাতিল করা হয়। চুক্তি বাতিল করা সচিবরা হলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মোখলেস উর রহমান, এস এম আকমল হোসেন, কাইয়ুম আরা বেগম, বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক শরীফা খান, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মো. সাইদুর রহমান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী, জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক (সিনিয়র সচিব) সিদ্দিক জোবায়ের, ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউসুফ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মমতাজ আহমেদ।
জনপ্রশাসন কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা ছিল সচিবের এ শূন্য পদগুলো পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হবে। একই সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া অন্যদেরও পর্যায়ক্রমে সরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু তা না করে চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা মন্ত্রিপরিষদ, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্রসহ গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন।
অন্যদিকে বিএনপি সরকার এখনও সচিব পর্যায়ে কোনো নিয়মিত কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়নি। কর্মকর্তাদের অনেকেই বলছেন যে, যারা চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন তারা মূলধারার জনপ্রশাসন থেকে দীর্ঘ ১০ থেকে ২০ বছর বিচ্ছিন্ন ছিলেন, ফলে তারা প্রশাসনের বর্তমান গতিশীলতার সঙ্গে অপরিচিত।
প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অন্তবর্তী সরকার আমলের চুক্তি বাতিল করে নতুন করে ফের ঢালাওভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়া হলে প্রশাসনে কিছুটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পদ ছাড়া ঢালাও পদোন্নতির কারণে জনপ্রশাসনে যেখানে নিয়মিত কর্মকর্তারা পদ পাচ্ছেন না সেখানে কয়েক বছর আগে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে সংকট আরও বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন পদোন্নতি প্রত্যাশী কর্মকর্তারা। এ ছাড়া নিয়মিত কর্মকর্তা থাকার পরও চুক্তিতে সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ায় বছরে তাদের বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের অতিরিক্ত কোটি কোটি টাকা ব্যয় হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যেখানে বলা হয়েছিল মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা হবে। তবে প্রশাসনে বড় পদে আবারও চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য আসায় একে ইশতেহারের পরিপন্থি বলে মনে করছেন অনেকে।
তারা বলছেন, সবার আশা থাকে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ সচিব হওয়া। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বন্ধ হবে এমনটা আশা করেছিলেন তারা। কিন্তু সচিব পর্যায়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাড়তে থাকায় অনেকেরই সচিব পদে পদোন্নতি কেবল স্বপ্নই থেকে গেছে। বিএনপি সরকার গঠন করার পরও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কাউকে চুক্তিতে নিয়োগের ফলে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এ শীর্ষ পদে যাওয়ার সুযোগ কমে যায়। এ নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। অন্যদিকে চুক্তিতে কোনো কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া মানে তার বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাবদ সরকারের বাড়তি ব্যয় হয়। বর্তমানে একজন সচিবের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা ও সিনিয়র সচিবের ৮২ হাজার টাকা। এর বাইরে বাড়ি ভাড়া, ভাতা ও সার্বক্ষণিক গাড়ির সুবিধা রয়েছে। ফলে চুক্তিতে থাকা একজন সচিবের পেছনে শুধু বেতন ও বাড়ি ভাড়া বাবদ সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় বছরে ৩০ লাখ টাকার বেশি। তাই নতুন করে আর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ চান না প্রশাসনের অধিকাংশ কর্মকর্তা।
তারা বলেন, একটি সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হলে নিচের দিকে তিন থেকে চারজন কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চিত হন। এতে প্রশাসনে হতাশার সৃষ্টি হয়ে কাজে স্থবিরতা নেমে আসে।
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সচিব পদে চুক্তিতে যাদের নিয়োগ দিয়েছিলেন তারা বিগত সরকারের সময়ে বঞ্চিত ছিলেন। তাদের কেউ কেউ ১০ বছর আগেই সচিব হতে পারতেন। তবে ঢালাওভাবে এসব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও নিয়মনীতির ঘাটতি ছিল।
তিনি বলেন, সরকার যদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে চায়, তা হলে একটা ফর্মুলা তৈরি করে সে অনুযায়ী দিতে পারে। নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে দলীয় বা পছন্দের লোকের পরিবর্তে ওই পদের জন্য কতটা যোগ্য সেটিই বিবেচনা করা জরুরি। ভালো কর্মকর্তা এবং বর্তমান সরকারের প্রতি সমর্থন, সততা-দক্ষতা, সিদ্ধান্ত দেওয়ার সক্ষমতা আছে এমন ব্যক্তিদের নিয়ে আসা উচিত। যোগ্য কর্মকর্তা নয় অথচ বিভিন্নজনের পরিচয়ে কাউকে নিয়ে আসা কোনোভাবেই ঠিক হবে না।
সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া আমলাদের ফিরিয়ে আনায় নিয়মিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব তৈরি হয়। এর ফলে প্রশাসনে দক্ষ অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের জটলা তৈরি হয়। পদোন্নতিতে জট সৃষ্টি হয়। প্রাপ্য পদোন্নতি না পেলে কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ায় প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, জনস্বার্থে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতি মহামান্য রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারভুক্ত একটি বিশেষ ব্যবস্থা। রাষ্ট্রপতি ১০ শতাংশ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারেন। তাই দীর্ঘদিন থেকেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টি চলে আসছে। তবে এটি বন্ধ হলে প্রশাসনের কাজ আরও গতিশীল হবে।