বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধানের যোগ্যতা নির্ধারণের ছয় মাস না যেতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় পুনরায় তা পরিবর্তনের আলোচনা শুরু করেছে। আগের মতোই জনপ্রতিনিধিদের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পদে দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ দেওয়া নিয়ে প্রস্তাব উঠেছে।
এমপিদের ‘আপত্তির মুখে’ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির প্রবিধানমালা সংশোধন করে সভাপতি পদের শিক্ষাগত যোগ্যতা পরিবর্তনের বিষয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রবীণ ও বর্তমান শিক্ষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, জনপ্রতিনিধিদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ দিলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও ‘অপরাজনৈতিক’ পরিবেশ হারাবে।
মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সভায় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির বিদ্যমান প্রবিধানমালা সংশোধন নিয়ে শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যানদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
মাধ্যমিক শাখার কর্মকর্তা সাইয়েদ এ জেড মোরশেদ আলী বলেন, প্রবিধানমালার কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি উঠেছে। আপত্তিগুলো কীভাবে দূর করা যায় সে বিষয়ে সভায় কথা হয়েছে, তবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এমপিদের আপত্তি
২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট, বেসরকারি স্কুল-কলেজের সভাপতি পদে মনোনয়ন পেতে প্রার্থীদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক নির্ধারণ করা হয়। নতুন প্রবিধানমালায় প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে আলোচনা করে নবম গ্রেডের উপরে সরকারি কর্মকর্তা, নির্দিষ্ট গ্রেডের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের অধ্যাপক, প্রতিষ্ঠাতা এবং চার বছর মেয়াদি স্নাতক ডিগ্রিধারী কর্মকর্তাদের নাম সভাপতি পদে পাঠানোর বিধান সংযোজন করা হয়।
এর ফলে জনপ্রতিনিধি বা সংসদ সদস্যদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়। এমপিদের মধ্যে কেউ কেউ এ বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন। শিক্ষামন্ত্রীর সচিব অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, এমপিরা আবার সভাপতি হওয়ার সুযোগ চাচ্ছেন। এ আপত্তি কীভাবে দূর করা যায়, তা নিয়েই আলোচনা হয়েছে।
প্রবিধানমালা পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা
বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ইউনুস আলী সিদ্দিকী জানান, শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সভায় প্রবিধানমালা সংশোধন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
শিক্ষামন্ত্রীর সচিব অধ্যাপক সোহেল বলেন, এমপিরা চাইছেন জনপ্রতিনিধিদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ রাখা হোক। তবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এমপিদের বক্তব্য
কুমিল্লা-২ আসনের এমপি ও সরকারপন্থি শিক্ষক সংগঠনের নেতা সেলিম ভূইয়াঁ বলেন, আগের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সভাপতি হওয়ার সুযোগ পেতেন, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেটা বন্ধ করেছে। আমরা চাই, এর কারণ খতিয়ে দেখা হোক। শিক্ষাগত যোগ্যতা যেটা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি আমরা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছি। তবে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বে রাখা উচিত।
শিক্ষায় রাজনৈতিক প্রভাবের শঙ্কা
বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ মাজহারুল হান্নান বলেন, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জনপ্রতিনিধিদের সভাপতি করা হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে না। শিক্ষকের মধ্যে দলাদলির সৃষ্টি হয়। তাই শিক্ষার মান অক্ষুণ্ণ রাখতে সরকারি কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সভাপতি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এমপিদের মূল কাজ হলো আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় তাদের থাকার প্রয়োজন নেই। বর্তমান প্রবিধানমালা অনুযায়ী নবম গ্রেডের ওপরের সরকারি কর্মকর্তা অবসরে যাওয়ার পর সভাপতি হওয়ার সুযোগ পান। এমপিদের সেখানে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
নবীন শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক ফোরামের (বাশিফ) সভাপতি মো. হাবিবুল্লাহ রাজু বলেন, শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে হলে শিক্ষাঙ্গণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। আগে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা সভাপতি থাকলে শিক্ষকদের ওপর অশিক্ষিতরা ক্ষমতা প্রয়োগ করত। তাই শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল না করা হোক, সেটিই আমরা চাই।
/ইউএমএইচ