শহিদ মারুফের শেষ আর্তনাদ ‘মামা আমাকে বাঁচাও’

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

‘মারুফ আমাকে বলে মামা আমাকে বাঁচাও। আমি দেখতে পাই মারুফের তলপেটের ডান পাশে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। একটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে করে মারুফকে

2026-03-12T04:10:46+00:00
2026-03-12T04:10:46+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি
শহিদ মারুফের শেষ আর্তনাদ ‘মামা আমাকে বাঁচাও’
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬, ৪:১০ এএম 
শহিদ মারুফ। সংগৃহীত ছবি
‘মারুফ আমাকে বলে মামা আমাকে বাঁচাও। আমি দেখতে পাই মারুফের তলপেটের ডান পাশে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। একটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে করে মারুফকে বাড্ডা এএমজেড হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যেতে বলে। আমরা তাকে নিয়ে সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকা মেডিকেলের উদ্দেশে রওনা করি। 

কথাগুলো চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহিদ মারুফের মামা ৩১ বছর বয়সি মো. ফয়সালের। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে দেওয়া জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন তিনি।

জবানবন্দিতে ফয়সাল বলেন, ১৬ জুলাই ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আমি ও আমার ভাগনে মারুফ হোসেন যোগ দিই। ১৭ জুলাই আফতাব নগর গেটে আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। ১৮ জুলাই আফতাব নগর ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলাকালে পুলিশ, বিজিবি এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর হামলা চালায়। এই হামলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অনেক আন্দোলনকারী আহত ও নিহত হন। ওই এলাকায় বিকেল ৫টার পর থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত র‌্যাবের হেলিকপ্টার থেকেও আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি ছোড়া হয়।

তিনি বলেন, ১৯ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাড্ডা পোস্ট অফিস রোডের মাথায় ইউলুপের নিচে আমি আন্দোলনে যোগ দিই। আনুমানিক ১১টার দিকে মারুফ আমাকে ফোন করে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে যেতে বলে। আমি সেখানে যাই। গিয়ে দেখি একজন ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছেন। আমি, মারুফ এবং আরও কয়েকজন মিলে তাকে নিকটস্থ একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই। এরপর আমি এবং মারুফ জুমার নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে যার যার বাসায় চলে যাই।

পরে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে মারুফ আমাকে ফোন করে বাসা থেকে বের হয়ে আন্দোলনে যোগ দিতে বলে। সে জানায়, সে আন্দোলনে চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে গিয়ে মারুফ আবার আমাকে ফোন করে সেখানে যেতে বলে। আমি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে গিয়ে দেখি মারুফ ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বিপরীতে থানা রোডের মাথায় অবস্থান করছে। আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। সেখানে আমার বন্ধু রাজিবও ছিল।

এ সময় রামপুরা ব্রিজের দিক থেকে একটি গুলির শব্দ শুনতে পাই। ব্রিজের দিকে পুলিশ, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা সশস্ত্র অবস্থায় ছিল। গুলির শব্দ পেয়ে আমি দৌড়ে উত্তর দিকে আনুমানিক ৫০ হাত দূরে চলে যাই।
 তখন আমার বন্ধু রাজিব আমাকে ফোন করে জানায়, মারুফ গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

আমি দ্রুত মারুফের কাছে যাই। মারুফ আমাকে বলে, মামা আমাকে বাঁচাও। আমি দেখতে পাই তার তলপেটের ডান পাশে গুলি লেগেছে। একটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে বাড্ডা এএমজেড হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। আমরা সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকা মেডিকেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। পথে রামপুরা ব্রিজের ওপর পুলিশ, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের গতিরোধ করে। আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত জেনে আমাকে বন্দুক তাক করে একজন বিজিবি সদস্য বলে, একজন তো শেষ, তোকেও শেষ করে দেব। অনেক অনুরোধ করার পর প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর তারা আমাদের যেতে দেয়।

ফয়সাল বলেন, আনুমানিক সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটের দিকে ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, ১৫ থেকে ২০ মিনিট আগেই মারুফ মারা গেছে। পরে আমি মারুফের বাবাকে ফোন করে মৃত্যুর সংবাদ জানাই। তিনি আনুমানিক রাত ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেলে আসেন। হাসপাতাল থেকে মরদেহ নিতে চাইলে আমাদের জানানো হয়, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ছাড়া মরদেহ দেওয়া যাবে না। আমি, মারুফের বাবা এবং আরও ৬ থেকে ৭ জন ওইদিন রাত ১২টার দিকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিতে বাড্ডা থানায় যাই। কিন্তু বাড্ডা থানার ওসি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দিতে অস্বীকৃতি জানান। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিতে এসেছি জানতে পেরে স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর হামলা চালায়।

পরবর্তীতে কয়েকবার বাড্ডা থানায় গিয়েও আমরা পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাইনি। তারা জানায়, ঘটনাস্থল তাদের থানার আওতাধীন নয় এবং রামপুরা থানা থেকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিতে বলে। পরে ২১ জুলাই দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে আমরা রামপুরা থানা থেকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাই। ওইদিন আনুমানিক বেলা ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেল থেকে মরদেহ নিয়ে বিকাল আনুমানিক ৫টার দিকে বাড্ডা কবরস্থানে মারুফের দাফন সম্পন্ন করি।

তিনি অভিযোগ করেন, আমাদের যৌক্তিক আন্দোলন দমন করার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদেরসহ অন্যান্য প্রভাবশালী মন্ত্রীর নির্দেশে অতি উৎসাহী পুলিশ, বিজিবি এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা আমার ভাগনে মারুফকে হত্যা করেছে।

তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারি বিজিবির কমান্ডার লে. কর্নেল রেদোয়ান, রাফাত, এডিসি রাশেদ, রামপুরা থানার ওসি মশিউর এবং আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাবুল আমার ভাগনে মারুফসহ ঘটনাস্থলে সংঘটিত অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। আমি এই আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   ট্রাইব্যুনাল  ফয়সাল  জবানবন্দি  শহিদ  মারুফ  আর্তনাদ  বাঁচাও 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: