রোববার শেষ হচ্ছে এ বছরের অমর একুশে গ্রন্থমেলা। মেলার শুরু থেকেই পাঠকসমাগম কম থাকায় অনেক প্রকাশকের মধ্যে ছিল হতাশা। তবে শেষ সময়ে এসে চিত্র বদলেছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শুক্রবার সকাল থেকেই মেলা প্রাঙ্গণে বেড়েছে বইপ্রেমী পাঠক-ক্রেতার ভিড়, শেষ লগ্নে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছিল বইমেলা। তবে সন্ধ্যার বৃষ্টির বাগড়া যেন মেলার রঙ কিছুটা ফিকে করে দিয়েছে।
শুক্রবার সরজমিনে দেখা যায়, শুক্রবার শিশুপ্রহরের আয়োজন থাকায় সকাল থেকেই বইমেলায় ছিল শিশুদের সরব উপস্থিতি। এ বছর শিশুদের সিসিমপুরে আয়োজন না থাকলেও মেলায় তাদের আকর্ষণের বিষয় ছিল পুতুল নাচ, বায়োস্কোপ এবং চিত্রাঙ্কন। রঙিন পুতুল নাচ আর গল্পের পরিবেশনায় মুগ্ধ ছিল শিশুরা। অভিভাবকদের সঙ্গে ছোট ছোট শিশুদের বই হাতে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। অনেকেই শিশুদের জন্য গল্প, ছড়া ও ছবি-সমৃদ্ধ বই কিনতে স্টলগুলোতে ভিড় করেছেন।
এদিকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলার পরিবেশও পরিবর্তন হতে থাকে। বিকাল থেকে বাড়তে থাকে পাঠক-ক্রেতার উপস্থিতি। তবে ইফতারের পর হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হওয়ায় মেলার প্রাঙ্গণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। পাঠক-দর্শকরা অনেকেই ভিজে যান। প্রকাশক ও বিক্রেতারা হুড়োহুড়ি করে স্টলের বই-জিনিস বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন, কিন্তু অনেক স্টলের বই ভিজে যায়। কিছুক্ষণ আগেই প্রাণচাঞ্চল্যপূর্ণ ছিল মেলা, হঠাৎ এই বৃষ্টির আঘাতে যেন সব কিছু থমকে দাঁড়ায়।
প্রকাশকদের মতে, এই বছরের বইমেলায় গতকালই সর্বোচ্চ পাঠক-ক্রেতার ভিড় হয়েছে। শুরুতে বিক্রি আশানুরূপ না হলেও শেষ সময়ে ছুটির দিনে পাঠক সমাগম ও বিক্রি কিছুটা বেড়ে প্রকাশকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে সন্ধ্যার পর বৃষ্টির কারণে পাঠক শূন্য হয়ে পড়ে পুরো প্রাঙ্গণ। এদিকে আগে থেকে বৃষ্টির জন্য প্রস্তুত না থাকায় অনেক বই ভিজে যায়। এতে প্রকাশকদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে বলে দাবি তাদের। এই ক্ষতির জন্য বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষকেও দায়ী করছেন অনেকে।
আরও পড়ুন
জ্ঞানকোষ প্রকাশনী বিক্রয়কর্মী আব্দুল্লাহ আল মাসুদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘শুক্রবার সকাল থেকে বইমেলায় পাঠকের উপস্থিতি সন্তোষজনক। মোটামুটি বিক্রিও হচ্ছিল তবে সন্ধ্যার পর হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হওয়ায় আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। তাই অনেক বই ভিজে গেছে।’
কেন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী মো. আকাশ সময়ের আলোকে বলেন, ‘ছুটির দিনে মেলায় একটু প্রাণ ফিরে এসেছে, কিন্তু শেষ সময়ের হঠাৎ বৃষ্টিতে সব প্রস্তুতি পানিতে ভেসে গেছে। বাংলা একাডেমি আগে থেকে বৃষ্টির জন্য কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।’
ঐতিহ্য প্রকাশনীর প্রকাশক আমজাদ হোসেন খান কাজল সময়ের আলোকে বলেন, ‘এই বছরের মেলা একদমই জমেনি। অন্যান্য বছর ছুটির দিনে যে মানুষ হয় এবছর তেমন হয়নি। তার ওপরে সন্ধ্যার পর হঠাৎ বৃষ্টি। এই বছর মেলায় অংশগ্রহণ করা পুরোটাই লস।’
এদিকে বৃষ্টির কারণে বিপাকে পড়েছেন পাঠকরাও। নিশাত জাহান নামে এক পাঠক সময়ের আলোকে বলেন, ‘মেলা দেখতে এসেছিলাম, হঠাৎ বৃষ্টি চলে আসায় আমার কাছে ছাতা ছিল না তাই একটু আশ্রয়ের জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে।’
রুবিনা খাতুন নামে এক অভিভাবক তার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মেলায় ঘুরতে এসেছেন। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, ‘আমার বাচ্চাসহ আমি ইফতারের পর মেলায় এসেছিলাম। কিন্তু এখন পুরোপুরি ভিজে গেছি। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে ছোট বাচ্চা নিয়ে কোথাও আশ্রয়ের জায়গাও পায়নি।’
শুক্রবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১৬তম দিন এবং মেলার সময়সূচি ছিল বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। গতকাল তথ্যকেন্দ্রে মেলার নতুন বই জমা পড়েছে ২৭৭টি।
আইনমন্ত্রীর লেখা ‘শুধু মাধবীর জন্য’র মোড়ক উন্মোচন : শুক্রবার অমর একুশে গ্রন্থমেলায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের লেখা মুক্ত গদ্যের বই ‘শুধু মাধবীর জন্য’ এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। শুক্রবার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অন্যপ্রকাশ-এর স্টলে আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে বইটি লেখার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে উপস্থিত দর্শক ও পাঠকদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, মাধবীকে লেখা লেখকের চিঠিগুলোতে সুখ, দুঃখ, রাজনীতি এবং একাকিত্বের নানা অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে।
বইটির প্রধান চরিত্র ‘মাধবী’ আসলে কে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মাধবী কে এটা অনেক বড় প্রশ্ন। এই প্রশ্নের জবাব যদি আগেই দিয়ে দিই, তা হলে পাঠক বইটি পড়ার আগ্রহ হারাতে পারেন। তাই বিষয়টি আপাতত অপ্রকাশিতই থাকুক।’
তিনি আরও বলেন, ‘বইটিতে মানুষের অন্তর্গত একাকিত্বের অনুভূতি তুলে ধরা হয়েছে। চারপাশে অনেক মানুষ থাকা সত্ত্বেও মানুষ অনেক সময় নিজের ভেতরে একা থাকে এবং মনের অনেক কথাই সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে না। সেই অনুভূতিরই প্রকাশ ঘটেছে ‘মাধবী’র কাছে লেখা চিঠিগুলোতে।’
আইনমন্ত্রী জানান, বইটিতে সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা, ক্ষোভের পাশাপাশি রাজনীতি, রাষ্ট্র, সমাজনীতি ও দর্শনের বিভিন্ন দিকও উঠে এসেছে। তিনি মাধবীকে মোট ২৫৩টি চিঠি লিখেছেন, যার মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ১২৫টি চিঠি প্রকাশ করা হয়েছে। পাঠকদের সাড়া বিবেচনা করে পরবর্তীতে দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, পাঠকদের আগ্রহই একজন লেখকের অনুপ্রেরণার প্রধান উৎস। পাঠক যদি কোনো লেখাকে গ্রহণ করেন, তা হলে লেখক আরও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে লিখতে পারেন এবং নতুনভাবে অনুপ্রাণিত হন। এ কারণে তিনি পাঠকদের বইটি পড়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত জানাতে অনুরোধ করেন।
অনুষ্ঠানে অন্য প্রকাশের স্বত্বাধিকারী, লেখকের সহধর্মিণী, শুভানুধ্যায়ী, বিশিষ্টজন এবং মেলায় আগত দর্শক ও পাঠকরা উপস্থিত ছিলেন। মোড়ক উন্মোচন শেষে আইনমন্ত্রী ‘শুধু মাধবীর জন্য’ বইটি ক্রয়কারী পাঠকদের জন্য অটোগ্রাফ প্রদান করেন এবং তাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতার পুরস্কার প্রদান : সকাল সাড়ে ১০টায় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন বাংলা একাডেমির সচিব ড. মো. সেলিম রেজা। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ড. মামুন আহমেদ। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা : ক-শাখায় ১ম হয়েছেন মো. আফফান আল হাসনাইন, ২য় হয়েছেন আনহিতা রেদোয়ান আভা, ৩য় হয়েছেন মো. রিসালাত শাহ। খ-শাখায় ১ম হয়েছেন চারুলতা রহমান জারা, ২য় হয়েছেন বায়ান রাশদান, ৩য় হয়েছেন দ্যুলোক দ্যুতিমান। গ-শাখায় ১ম হয়েছেন শ্রেয়া রায়, ২য় হয়েছেন স্বস্তি চৌধুরী, ৩য় হয়েছেন আদিত্য সাহা।
শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতা : ক-শাখায় ১ম হয়েছেন পূর্ণতা আদিত্য, ২য় হয়েছেন সাহানা ইসলাম সাইফা এবং ৩য় হয়েছেন আরওয়া রহমান তাজরি। খ-শাখায় ১ম হয়েছেন তাসবিহা আয়ান তানহা, ২য় হয়েছেন বেহজারিন হাসান তারফি এবং ৩য় হয়েছেন কারিমা হোসাইন দিয়া এবং গ-শাখায় ১ম হয়েছেন সিমরিন শাহীন রূপকথা, ২য় হয়েছেন রাজ্যশ্রী সাহা এবং ৩য় হয়েছেন সমৃদ্ধি সূচনা স্বর্গ।
শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতা : ক- শাখায় ১ম হয়েছেন শ্রীজা মণ্ডল, ২য় হয়েছেন মাগফিরাহ মাবরুরা তৈষী এবং ৩য় হয়েছেন হিয়াঞ্জলি তরফদার। খ-শাখায় ১ম হয়েছেন তাসবিহা আয়ান তানহা, ২য় হয়েছেন সার্থক সাহা এবং ৩য় হয়েছেন বিদ্যাস্তুতি সিংহ। গ-শাখায় ১ম হয়েছেন রোদসী নূর সিদ্দিকী, ২য় হয়েছেন তানজিম বিন তাজ প্রত্যয় এবং ৩য় হয়েছেন নাবিলা আক্তার রায়না।
মূলমঞ্চ : বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : বদরুদ্দীন উমর শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফিরোজ আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেন সুমন রহমান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
লেখক বলছি : লেখক বলছি অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন নাসির আলী মামুন এবং মোহন রায়হান।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান : বিকাল ৪:০০টায় ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতিয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)-এর পরিবেশনা। অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন এবিএম সোহেল রশিদ, মিজানুর রহমান, এনামুল হক জুয়েল। সংগীত পরিবেশন করেন আলম আরা মিনু, হাসান চৌধুরী, জাকির হোসেন আখের, পিয়াল হাসান, ফরহাদ হোসেন নিয়ন, অধ্যক্ষ আশরাফ শাহিন, মনির হোসেন, হাবিবুর রহমান রেখা সুফিয়ানা, মৌসুমী ইকবাল, জ্যোৎস্না, মিতা মল্লিক, রাফিজা আলম লাকি এবং নাতে রাসুল পরিবেশন করেন শাহিনুর আবেদিন। অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন সংগীত পরিচালক জাবেদ আহমেদ কিছলু ও অভিনেতা এ বি এম সোহেল রশিদ। অনুষ্ঠানে সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন জাসাস-এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক চিত্রনায়ক হেলাল খান ও সদস্য জাকির হোসেন রোকন।
আজকের আয়োজন : শনিবার মেলা শুরু হবে সকাল ১১:০০টায় এবং চলবে রাত ৯:০০টা পর্যন্ত। মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর। বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবর্ষ : মুসলিম সাহিত্য সমাজ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মোরশেদ শফিউল হাসান। আলোচনায় অংশ নেবেন মমতাজ জাহান। সভাপতিত্ব করবেন আবুল আহসান চৌধুরী। বিকাল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এএডি/