অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৬ শেষ হচ্ছে আজ রোববার। শুরু থেকেই মেলায় প্রত্যাশিত পাঠকসমাগম দেখা যায়নি। শেষের দিকে এসেও সেই চিত্রে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। শেষ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দর্শনার্থীর উপস্থিতি কিছুটা বাড়লেও সামগ্রিকভাবে বিক্রির চিত্রে তেমন স্বস্তি ফেরেনি। ফলে অনেক প্রকাশকের কণ্ঠেই শোনা যাচ্ছে হতাশার সুর।
বইমেলায় ঘুরে দেখা যায়, শনিবার (১৪ মার্চ) পালিত হয়েছে ষষ্ঠ ও শেষ শিশুপ্রহর। এদিন সকাল থেকেই শিশুদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে মেলার পুরো প্রাঙ্গণ, যেন এক আনন্দঘন উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়। তবে শুক্রবার রাতের অপ্রত্যাশিত বৃষ্টির ফলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অনেক স্টলের ভেজা বই রোদে শুকাতে দেখা যায়।
অন্যদিকে কিছু স্টলের সামনে কাদা জমে থাকতে দেখা যায়, যা দর্শনার্থীদের চলাচল সমস্যা সৃষ্টি করে। এদিকে বিকাল থেকে মোটামুটি পাঠক সমাগম থাকলেও তেমন বিক্রি হচ্ছে না বলে দাবি অনেক প্রকাশকদের।
প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেলার শেষ দিকে কিছুটা দর্শনার্থীর উপস্থিতি বাড়লেও তা বিক্রিতে তেমন ইতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। অনেকেই স্টল ঘুরে দেখছেন, ছবি তুলছেন কিংবা সময় কাটাচ্ছেন তবে বই কেনার প্রবণতা তুলনামূলক কম বলেই মনে করছেন প্রকাশকরা।
এ ছাড়া শুক্রবার রাতের বৃষ্টির কারণে অনেক স্টলে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, কোথাও ভেজা বই রোদে শুকাতে হয়েছে, আবার কোথাও কাদা জমে দর্শনার্থীদের চলাচল ব্যাহত হয়েছে। সব মিলিয়ে মেলার শেষ পর্যায়ে এসে পরিবেশ কিছুটা প্রাণবন্ত হলেও বিক্রির হিসাবে সেই প্রাণচাঞ্চল্যের প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে জানান তারা।
সন্দীপন প্রকাশনীর প্রোডাকশন ম্যানেজার মো. রিফাত সময়ের আলোকে বলেন, ‘অন্যান্য বছরে ১৫-১৬ লাখ টাকার বিক্রি হয় অনায়াসে; কিন্তু এই বছর বইমেলায় মোট বিক্রি হয়েছে মাত্র ৮০ হাজার টাকা। মেলায় অধিকাংশ মানুষ আসে ঘুরতে, ছবি তুলতে, ইফতার পার্টি করতে। কয়জন মানুষের হাতে বই আছে দেখেন? গত শুক্রবার রাতে যে বৃষ্টি হয়েছে এতে আমাদের প্রায় ৪০-৫০ হাজার টাকার বই ভিজে গেছে।’
শিশুগ্রন্থ কুটির প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী মো. তুষার সময়ের আলোকে বলেন, ‘শুক্রবার ছুটির দিনে সর্বোচ্চ মানুষ হয়েছিল এই বছরের মেলায়। তবে সন্ধ্যার পর বৃষ্টি সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। আমাদের কিছু বই ভিজে গিয়েছে। স্টলের সামনেই এগুলো শুকাতে দিয়েছি। এই বছর শুরু থেকেই লস। শেষ সময়ে বৃষ্টি এসে আরো লস করে দিল।’
দুই সন্তান নিয়ে মেলায় ঘুরতে এসেছেন অভিভাবক শারমিন সুলতানা। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, ‘এই বছরের মেলা তো কালকেই (আজ) শেষ হচ্ছে। তাই দুই সন্তানকে নিয়ে সকালেই মেলায় এসেছি। তাদের কিছু ছড়া ও গল্পের বই কিনে দিয়েছি।’
মেলায় সন্তানকে নিয়ে আসা আরেক অভিভাবক ফারহানা হক সময়ের আলোকে বলেন, ‘সন্তানকে বইমেলায় নিয়ে আসা আনন্দের, কিন্তু এবারের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি সুখকর ছিল না। শুক্রবার রাতের বৃষ্টির পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অনেক স্টলের সামনে কাদা জমে ছিল, চলাফেরায় সমস্যা হচ্ছিল। সঙ্গে বইয়ের দাম অনেকটাই বেশি। শিশুদের জন্য আলাদা কোনো আয়োজন বা কার্যক্রমও খুব সীমিত ছিল। সব মিলিয়ে আনন্দের সঙ্গে আক্ষেপও রয়েছে— যে পরিসরে মেলাটি শিশুর জন্য হওয়া উচিত, সেটি এবারে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।’
এদিকে শনিবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১৭তম দিন। মেলার সময়সূচি ছিল সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলায় ছিল শিশুপ্রহর। তথ্যকেন্দ্রে মেলার নতুন বই জমা পড়েছে ১৫৭টি।
মূলমঞ্চ
বেলা ১১টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় কবিতা আবৃত্তি। কবিতা পাঠে অংশ নেন প্রায় ৩০ জন কবি ও আবৃত্তিশিল্পী এবং ২টি আবৃত্তি সংগঠন (এনামুল হক জুয়েলের পরিচালনায় জাতীয় আবৃত্তি পরিষদ এবং মো. রবিউল আলম রবির পরিচালনায় শিশুনন্দন)।
বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় জন্মশতবর্ষ : মুসলিম সাহিত্য সমাজ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোরশেদ শফিউল হাসান। আলোচনায় অংশ নেন মমতাজ জাহান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
লেখক বলছি
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন কবি জাকির আবু জাফর, কথাসাহিত্যিক— অনুবাদক শাকির সবুর, প্রবন্ধিক রাজীব সরকার এবং গবেষক খান মাহবুব।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান : বিকাল ৪টায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন অলোক কুমার সেন, দেবিকা রানী পাল, সিনথিয়া, শারমিন সুলতানা। এ ছাড়া ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদ’ এবং জহির আলীমের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন আবদুল আলীম ফাউন্ডেশনের পরিবেশনা।
গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৬ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি পরিচালিত চিত্তরঞ্জন সাহা, মুনীর চৌধুরী, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, সরদার জয়েনউদ্দীন এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কারপ্রাপ্তদের নামের
তালিকা :
চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার : ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিকসংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কথাপ্রকাশকে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ প্রদান করা হলো।
মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার : ২০২৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য (প্রকাশয়তি : কালি-কলম আর কাগজের অড রিসার্চ : ফাউন্টেন পেন আমিন বাবু), প্রথমা প্রকাশন (শিলালিপি : বাংলার আরবি-ফারসি প্রত্নলেখমালা— মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক) এবং দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিকে) মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ প্রদান করা হলো।
রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার : ২০২৫ সালে গুণমান বিচারে সর্বাধিক-সংখ্যক শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেডকে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ প্রদান করা হলো।
সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৬ উপলক্ষে ২০২৪ বা ২০২৫ সালে মেলায় যে সব প্রতিষ্ঠান প্রথম অংশগ্রহণ করেছে তাদের মধ্য থেকে গুণগতমান বিচারে সর্বাধিক-সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সহজ প্রকাশকে সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ প্রদান করা হলো।
শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৬ উপলক্ষে নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১. ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশন্স (স্টল নম্বর-৫০৩-৫০৪), ২. মাত্রা প্রকাশ (স্টল নম্বর ৮৭৩-৮৭৪) ও ৩. বেঙ্গলবুকসকে (স্টল নম্বর ৬১৭-৬২১) শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ প্রদান করা হলো।
আজকের আয়োজন : আজ রোববার অমর একুশে গ্রন্থমেলার সমাপনী দিন। মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বেলা ৩টায় সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৬’-এর সদস্য সচিব ড. মো. সেলিম রেজা।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি। শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করবেন সংস্কৃতি-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান।
অনুষ্ঠানে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার, সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হবে। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
এফআর