ট্রাম্পকে নিয়ে মোহভঙ্গ ইরানিদের একাংশের

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

বহু বছর ধরে গ্রেফতার, গুম এবং বিক্ষোভকারীদের হত্যার ঘটনার কারণে ইরানের কঠোর শাসনের বিরুদ্ধে দেশটির একাংশের মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষোভ

2026-03-15T06:33:18+00:00
2026-03-15T06:33:18+00:00
 
  শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬,
২৭ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ট্রাম্পকে নিয়ে মোহভঙ্গ ইরানিদের একাংশের
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ১৫ মার্চ, ২০২৬, ৬:৩৩ এএম 
ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় মার্কিন দূতাবাসের সামনে কুদস দিবসের বিক্ষোভ সমাবেশ। ইরান ও গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে স্লোগান দিচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা। ছবি : মিডল ইস্ট আই
বহু বছর ধরে গ্রেফতার, গুম এবং বিক্ষোভকারীদের হত্যার ঘটনার কারণে ইরানের কঠোর শাসনের বিরুদ্ধে দেশটির একাংশের মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। এই ক্ষোভ এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে, অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধার করতে আসবে; কেননা এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। 

কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই সেই মনোভাব বদলাতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলায় শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে আবাসিক ভবন, দোকানপাট, জ্বালানি ডিপো এবং এমনকি একটি স্কুলও। ফলে অনেকের মধ্যে এখন প্রশ্ন জাগছে; এই যুদ্ধ আসলে কাদের জন্য।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী আমির দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘ওরাও মিথ্যা বলছে। যেমন আমাদের শাসকরা এতদিন ধরে মিথ্যা বলেছে। এখন মনে হচ্ছে, তোমরা সবাই একে অপরের চেয়েও খারাপ।’

শাসনবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এই তরুণ শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কাছ থেকে বড় কিছু আশা করেছিলেন। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। কিন্তু তার মৃত্যুর পরও শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। দ্রুতই তার ছেলে নতুন নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন, আর ইসরাইল দেশজুড়ে হামলা আরও বিস্তৃত করে। 

আমির বলেন, ‘আমরা খুব উদ্বিগ্ন। একা থাকলে আরও খারাপ লাগে। খামেনির মৃত্যুর পর এক ধরনের অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছি, কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ খুবই বিশৃঙ্খল মনে হচ্ছে। তিনি আমাদের সামনে কখনো বিচার মুখোমুখি হলেন না, হঠাৎ করেই মারা গেলেন।’

গত সপ্তাহে তেহরানের জ্বালানি ডিপোগুলোতে ইসরাইলের হামলার পর তার দৃষ্টিভঙ্গি আরও বদলে যায়। শহরের শাহরান তেল ডিপোতে হামলার পর রাজধানীর আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। পরে বৃষ্টির সঙ্গে বিষাক্ত তেলের আস্তরণ পড়ে গাছপালা, বাড়িঘর ও গাড়ির ওপর। আমির বলেন, ‘এখন সত্যিই মনে হচ্ছে তাদের কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। আমি এখনো আশা করছিলাম হয়তো আমি ভুল ভাবছি, কিন্তু শাহরান হামলার পর যুদ্ধকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করেছি। যদি শাসনব্যবস্থাকেই লক্ষ্য করেন, তা হলে সীমা কোথায় টানবেন? আমরা সাধারণ মানুষ কোথায় দাঁড়াব?’ 

তার মতে, সাধারণ ইরানিরা এই অবকাঠামোর ওপরই নির্ভর করে। এসব ধ্বংস হয়ে গেলে ভবিষ্যতে দেশ পরিচালনা করার সক্ষমতাই নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘সবকিছু ধ্বংসস্তূপ হয়ে গেলে কে আবার এগুলো গড়ে তুলবে?’

আমিরের মনে এখন আরেকটি ভয়ও কাজ করছে : ইরান যেন আরেকটি ইরাকে পরিণত না হয়। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালিয়ে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু পরে দেশটি দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের মধ্যে পড়ে যায়। 

তিনি বলেন, ‘আমার মন খুব ভারী হয়ে আছে। আর কাঁদার শক্তিও নেই। শুধু রাগ— এই শাসকদের ওপর, আর তাদের ওপরও।’

এই সপ্তাহে দ্য গার্ডিয়ানকে কথা বলা আরও কয়েকজন ইরানি জানান, তাদের মনোভাবও বদলে গেছে। বিশেষ করে তেল ডিপোতে হামলা এবং দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ক্ষতির খবর দেখার পর তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে তেহরানের গোলেস্তান প্রাসাদ, যার ইতিহাস প্রায় সাতশ বছরের পুরোনো। এ ছাড়া ইসফাহানের চেহেল সুতুন প্রাসাদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সপ্তদশ শতকের স্থাপনা। 

তেহরানের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এত মূল্যবান ইতিহাস কীভাবে আবার গড়ে তোলা সম্ভব? যারা মারা যাচ্ছে, তাদের কি ফিরিয়ে আনা যাবে? তা হলে কি বার্তা দেওয়া হচ্ছে : শাসনব্যবস্থা যদি মানুষের জীবনকে মূল্য না দেয়, তা হলে বিশ্বেরও তা করা দরকার নেই? আমাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাস মুছে ফেলাই কি লক্ষ্য?’

রাজধানী থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের শহর কারাজের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি চাই এই শাসনব্যবস্থা চলে যাক। আমি ট্রাম্পের কাছে সাহায্যও চেয়েছিলাম।’ কিন্তু তিনি মনে করেছিলেন হামলা হবে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও তাদের স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়াদের ওপর। 

এখন তিনি প্রশ্ন করছেন, ‘কখন পরিকল্পনা বদলে গেল? কেন আমাদের অবকাঠামো লক্ষ্য করা হচ্ছে?’

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের বেশিরভাগ মানুষ এই শাসনের অধীনেই বড় হয়েছেন। সেই বিপ্লব রাজতন্ত্রের পতন ঘটালেও শেষ পর্যন্ত কঠোর ধর্মীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করে। দেশটিতে গণমাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকায় সরকারকে কতটা সমর্থন করে জনগণ; তা নির্ধারণ করা কঠিন। প্রকাশ্যে ভিন্নমত জানালে কারাবাস এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে।

তবু প্রায় দুই দশক ধরে নানা সময়েই ইরানে বিক্ষোভ আন্দোলন হয়েছে। কখনো রাজনৈতিক সংকট, কখনো জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, কখনো অর্থনৈতিক সংকট বা নারীদের অধিকার হরণের প্রতিবাদে এসব আন্দোলন শুরু হয়েছে। ২০০৯ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের পর ‘সবুজ আন্দোলন’ নামে পরিচিত এক বড় বিক্ষোভে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। পরে সরকার কঠোর দমন অভিযান চালায়। ২০২২ সালে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন শুরু হয় মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর। হিজাব ঠিকভাবে না পরার অভিযোগে গ্রেফতারের পর পুলিশ হেফাজতে তার মৃত্যু হয়। সেই ঘটনার প্রতিবাদে দেশজুড়ে বড় আন্দোলন শুরু হয়।

সর্বশেষ বিক্ষোভ শুরু হয় গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে। তেহরানের বাজার এলাকায় মুদ্রার দরপতনের প্রতিবাদে ছোট আকারে ধর্মঘট দিয়ে শুরু হলেও পরে তা দেশজুড়ে বড় আন্দোলনে রূপ নেয়। এরপর নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর দমন অভিযান চালায় এবং হাজার হাজার মানুষ নিহত হন।

জানুয়ারিতে বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা করা এক ইরানি চিকিৎসক বলেন, তিনি এখনও আশা করেন যুদ্ধ হয়তো কোনো বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। 

তার ভাষায়, ‘সবচেয়ে বড় ভয় হলো : যদি যুদ্ধ এখনই থেমে যায়। তা হলে যারা গত মাসে আমাদের মানুষ হত্যা করেছে, তারাই আবার আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসবে।’ তবে শাসনবিরোধী আন্দোলনের অনেকেই এখন ভিন্নভাবে ভাবছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় নবজাতক শিশুসহ সাধারণ মানুষের মৃত্যুর খবর শুনে তাদের মনে হচ্ছে : এখন এক সরকারের বদলে তিনটি সরকার ইরানিদের হত্যা করছে।

তেহরানের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি, বেসামরিক মানুষের মৃত্যু দেখার পর তারা সামরিক হস্তক্ষেপ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে।’ 

তিনি বলেন, এই সপ্তাহেই প্রথমবার তেহরানে তিনি এমন হামলার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, যা কার্পেট বোমা হামলার মতো মনে হয়েছে। শহরের কেন্দ্রের কয়েকটি এলাকায় ধারাবাহিকভাবে একের পর এক হামলা চালানো হয়েছে। তার কথায়, ‘ইরানিরা সত্যিই এখন নিজেদের সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত মনে করছে।’

এফআর


  বিষয়:   ট্রাম্প  মোহভঙ্গ  ইরানি  একাংশের 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: