যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত তেল অবরোধে জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় শুক্রবার কিউবার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড আবারও ধসে পড়েছে। এটি চলতি সপ্তাহে দ্বিতীয় এবং এ বছরে চতুর্থবারের মতো দেশব্যাপী বিদ্যুৎ বিপর্যয়। জ্বালানি সংকটে দ্বীপদেশটির বহু পুরোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
জ্বালানিমন্ত্রী ভিসেন্তে দে লা ও লেভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, আমরা ইতোমধ্যে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করেছি। প্রতিদিনের অসংখ্য প্রতিকূলতার মধ্যেও এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা চলছে।
বিদ্যুৎ গ্রিড ভেঙে পড়ার আগেও কিউবার বড় বড় অঞ্চল, বিশেষ করে সান্তিয়াগো দে কিউবা, তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ছিল। সোমবারের দেশব্যাপী বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে ১ কোটি মানুষের পুরো দ্বীপটি অন্ধকারে ডুবে যায়। কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার রাতের মধ্যে দেশের অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু করতে সক্ষম হয়েছিল।
মধ্য হাভানার বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী ইয়াইলিন ফিস গার্সিয়া অন্ধকারে ডুবে থাকা নিজের ক্যাফে ও পিজ্জার দোকানের বাইরে পাঁচ মাস বয়সী সন্তানকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি ও তার পরিবার 'লা ক্রিওলা' নামে ক্যাফেটি চালু করেছেন। দোকান খোলার পর এই নিয়ে দ্বিতীয়বার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ধসে পড়ল।
তিনি বলেন, সব খাবার নষ্ট হয়ে যায়, এতে আমাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
তবে তার মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপও হতে পারত। রাজধানীর উপকণ্ঠে তাদের এলাকায় গত এক মাস ধরে প্রতিদিন মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ক্যারিবীয় দ্বীপদেশ কিউবার ওপর তেল অবরোধ আরোপ করেন। ভেনেজুয়েলা ছিল কিউবার প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে মেক্সিকোও কিউবায় তেল রফতানি বন্ধ করে দেয়।
হাভানার বাসিন্দা গ্যাব্রিয়েল রিকো বলেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে এখন তিনি সব সময় একটি টর্চলাইট হাতের কাছে রাখেন।
তিনি বলেন, আমরা অবরোধ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু এই অবরোধই আমাদের এমন দুর্ভোগে ফেলেছে, আমাদের সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে।
দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট জনমনে ক্ষোভ বাড়িয়ে তুলেছে। সোমবারের দেশব্যাপী বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর হাভানার বিভিন্ন এলাকায় মানুষ হাঁড়ি-পাতিল পিটিয়ে বিক্ষোভ করেন।
তবে এসব বিক্ষোভ ২০২১ সালের জুলাইয়ের গণআন্দোলনের তুলনায় অনেক ছোট। ওই সময় হাজার হাজার কিউবান রাস্তায় নেমে কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।
কিউবা সরকারের দাবি, কয়েক দশক ধরে চলা মার্কিন বাণিজ্য অবরোধের কারণেই দেশের অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের দাবি, বিদ্যুৎ সংকটের জন্য কিউবার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির দুর্বল ব্যবস্থাপনাই দায়ী।
যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যেই বলেছে, তাদের লক্ষ্য কিউবার সরকারে পরিবর্তন আনা। এ জন্য তারা গণতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজন এবং রাজনৈতিক কারণে আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে।
মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিতর্কে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বিদ্যুৎ সংকটের জন্য পুরোপুরি হাভানাকে দায়ী করে বলেন, আপনাদের নীতি পরিবর্তন করুন এবং জনগণের ঘরে আবার আলো ফিরিয়ে আনুন।
তবে বিতর্কে অংশ নেওয়া অধিকাংশ দেশই ওয়াশিংটনের প্রতি কিউবার ওপর আরোপিত অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। তাদের মতে, এসব নিষেধাজ্ঞাই দ্বীপদেশটির অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেস পারিয়্যা বলেন, জ্বালানি অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরো কিউবান জনগণের মানবাধিকার পদ্ধতিগতভাবে লঙ্ঘন করছে এবং এটি এক ধরনের 'সমষ্টিগত শাস্তি'।
শুক্রবারের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, জ্বালানি অবরোধের প্রভাবে এটি ছিল আরেকটি অত্যন্ত কঠিন সপ্তাহ। দুইবার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ধসে পড়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর মতো প্রায় কোনো জ্বালানি নেই, আর উৎপাদন ইউনিটগুলোর বেশ কয়েকটি এখনো অচল।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ