জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে শিল্প খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পুরো বিশ্বে বেশ বড়সড় ধাক্কা লেগেছে জ্বালানি তেলে। যার প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি বাংলাদেশও। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের

2026-03-15T07:07:36+00:00
2026-03-15T07:07:36+00:00
 
  সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬,
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
জাতীয়
জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে শিল্প খাত
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ১৫ মার্চ, ২০২৬, ৭:০৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পুরো বিশ্বে বেশ বড়সড় ধাক্কা লেগেছে জ্বালানি তেলে। যার প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি বাংলাদেশও। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার থেকে উৎপাদন কারখানা সব ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়েছে এই জ্বালানি সংকট। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে দেশের শিল্প খাতে। 

দেশে জ্বালানি সরবরাহে সংকট কিংবা দীর্ঘসূত্রতায় শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে পড়ার পাশাপাশি সমস্যা তৈরি হয়েছে পণ্য পরিবহন ও বিপণনেও। 

এমন পরিস্থিতিতে শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা খুব জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে খাদ্যসামগ্রী, ভোজ্য তেল, ওষুধ, সার এবং কৃষি-সম্পর্কিত উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর নীতি নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন অব্যাহত রাখতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন তারা পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছেন না, আর পেট্রোল পাম্প থেকে জ্বালানি আনতেও অনেক সময় লাগছে। শিল্প খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। 

একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সংকটের সময় শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হয় এবং বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতিও বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পিত ও অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, চলমান তেল সংকট দেশের গার্মেন্টস শিল্পের কার্যক্রমে স্পষ্ট প্রভাব ফেলছে। অনেক কারখানা মালিক জানিয়েছেন, জেনারেটর পরিচালনা এবং পণ্য পরিবহনের জন্য যে পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন, তা সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে অনেক কারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও উৎপাদন ধীরগতিতে চলছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। 

এ ছাড়া জ্বালানি ঘাটতির কারণে শুধু উৎপাদনই নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিয়মিতভাবে কাজে নিয়োজিত করা যাচ্ছে না। কারণ উৎপাদন লাইন স্বাভাবিকভাবে চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত তেল না থাকায় প্রস্তুত পণ্য নির্ধারিত সময়ে বাজার বা গন্তব্যে পাঠানোও কঠিন হয়ে পড়ছে। 

এ পরিস্থিতিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শিল্প খাত-বিশেষ করে রফতানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পের জন্য জ্বালানি তেলের বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে দ্রুত ও নিয়মিত সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে উৎপাদন ও বিতরণ কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। 

তার মতে, গার্মেন্টস শিল্প দেশের অর্থনীতি, রফতানি আয় ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাই এই খাতের কার্যক্রম সচল রাখা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, কারখানা শ্রমিকরা পাঁচ থেকে ছয় দিনের ছুটিতে চলে যাবেন। ১৭ মার্চ থেকে এই সমস্যাটা চলে যাবে। ইন্ডাস্ট্রি যেন তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে পারে সে জন্য অবশ্যই চাহিদা মতো ফুয়েল সাপ্লাই দিতে হবে। কারখানা মালিকরা এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত। কারখানায় যদি কাজ করতে না পারে তা হলে শ্রমিকদের বেতন দেবে কীভাবে? এ জন্য অবশ্যই এই খাতে নজর দেওয়া উচিত। 

তিনি বলেন, ‘আমাদের ডিজেলে টোটাল যে কনজাম্পশন তাতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল খুবই কম। এটা সরকারের মানসিকতা যে, আমি দিচ্ছি না দেব না। তাদের চাহিদা তো কম, তা হলে দেবে না কেন? এটার কারণে বিরাট ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমি দেশের নীতি-নির্ধারকদের একটি কথা বোঝাবার চেষ্টা করছি, আমাদের দেশে ডিজেল কনজাম্পশন এক্সট্রিমলি হাই। এখন একটা ফুয়েলের ওপরে থাকা উচিত না। আমাদের অন্য ফুয়েলে শিফট করা উচিত। আমরা করেছি, কিছুটা সিএনজিতে গেছে। এটি আরও করা উচিত।’ 

এ ছাড়া দেশের অন্যতম বৃহৎ পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, এই পরিস্থিতিতে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য এবং উৎপাদনশীল শিল্প খাতে যাতে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। 

তিনি বলেন, এর আগেও বাজারে ভোজ্য তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। কারণ জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে পণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণ— সব ক্ষেত্রেই সমস্যা দেখা দেয়, যা শেষ পর্যন্ত বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই এসব বিষয় সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি মত দেন। 

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শিল্প উৎপাদন থেমে গেলে অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়। এতে কর্মসংস্থান কমে, রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। তাই শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। বন্দর, সংরক্ষণাগার এবং পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন করা সম্ভব। 

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্য করা ছাড়া স্থায়ী সমাধান নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি শিল্প খাতে প্রসার ঘটানো জরুরি। শিল্পের মালিক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি— দুই ধরনের পরিকল্পনা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে অগ্রাধিকারভিত্তিক সরবরাহ, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতি ও বাজার— উভয় ক্ষেত্রেই স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।

এফআর


  বিষয়:   জ্বালানি  সংকট  ধুঁকছে  শিল্প খাত 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: