প্রচণ্ড গরম ও চলমান তাপপ্রবাহে রাজধানীসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ, শিশু ও বয়স্করা। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকসহ গরমজনিত নানা রোগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপপ্রবাহ এখন আর সাময়িক দুর্যোগ নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে। তাই ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি নগর পরিকল্পনা, কর্মপরিবেশ এবং স্বাস্থ্যসেবায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেলায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। কিন্তু জীবিকার তাগিদে নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ইটভাঙা শ্রমিক ও দিনমজুরদের খোলা রোদেই কাজ করতে হয়। প্রচণ্ড গরমে কর্মক্ষমতা যেমন কমছে, তেমনই বাড়ছে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকিও।
হাসপাতালগুলোতেও গরমজনিত অসুস্থতা নিয়ে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি সময়ে তাপমাত্রার পাশাপাশি বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও বেশি থাকায় গরমের তীব্রতা আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। ফলে দিনের পাশাপাশি রাতেও স্বস্তি মিলছে না। মৌসুমি আবহাওয়ার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি এল নিনোর মতো বৈশ্বিক জলবায়ুগত ঘটনাও এ পরিস্থিতি প্রভাবিত করছে বলে মনে করেন আবহাওয়াবিদরা।
তাই আগামী তিন মাসে দেশজুড়ে আরও আট থেকে ১০টি তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তিত বাস্তবতায় ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহের ঘনত্ব ও স্থায়িত্ব আরও বাড়তে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
আবহাওয়াবিদ ড. মো. ওমর ফারুক বলেন, এল নিনোর কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ার প্রবণতা রয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও কিছুটা পড়তে পারে। ফলে চলতি মৌসুমে বিচ্ছিন্নভাবে তীব্র তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের কোনো কোনো স্থানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ার পেছনে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রাজধানীতে সবুজের পরিমাণ কমে গিয়ে কংক্রিটের বিস্তার ঘটেছে। দিনের বেলায় ভবন, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো যে তাপ শোষণ করে, রাতে সেটিই আবার পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়। ফলে রাতেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবে কমে না এবং মানুষের বিশ্রাম ব্যাহত হয়।
নগর এলাকায় এ পরিস্থিতি ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব আরও তীব্র করছে। এ কারণে নগর পরিকল্পনায় সবুজায়ন, পানি শোষণক্ষম অবকাঠামো ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণব্যবস্থা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আছিব আহমেদ বলেন, নগর এলাকায় তাপমাত্রা কমাতে সবুজায়নের কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে পানি শোষণক্ষম অবকাঠামো বৃদ্ধি এবং নগর উন্নয়নে পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় ‘আরবান হিট আইল্যান্ডের’ প্রভাব আরও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহের বর্তমান প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু-সহনশীল অভিযোজন কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন বাংলাদেশের বাস্তবতা। দুর্যোগের ধরন, তীব্রতা ও সময় বদলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের চরম আবহাওয়া আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে। তাই উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে নগর ব্যবস্থাপনা, সব ক্ষেত্রেই জলবায়ু সহনশীল পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। হাসপাতালগুলোতে গরমজনিত অসুস্থ রোগীর চাপ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ, শিশু ও বয়স্কদের জন্য পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতার ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ, বিশুদ্ধ পানি, পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ, শিশু ও বয়স্করা। গরমের কারণে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক এবং শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগ বাড়ছে। তাই শুধু মানুষকে বেশি পানি পান করার পরামর্শ দিলেই হবে না, কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিকদের জন্য ছায়াময় বিশ্রামস্থল, বিশুদ্ধ ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট বিরতির সুযোগ রাখতে হবে। টিনের ঘরে বসবাসকারী নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কমিউনিটি সেন্টার বা অন্য কোনো শীতল স্থানে অস্থায়ী বিশ্রামের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রিকশাচালকদের রোদ ও বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দিতে রিকশায় উপযুক্ত আবরণ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে পানযোগ্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান তিনি।
তার মতে, প্রতিটি ওয়ার্ডে অস্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু করে তাপপ্রবাহ, ডেঙ্গু ও অন্যান্য মৌসুমি রোগ সম্পর্কে পরামর্শ এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া গেলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে টাঙ্গাইল, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর।
রোববার সংস্থাটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, লঘুচাপের বর্ধিতাংশ গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর মোটামুটি সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরের অন্যত্র দুর্বল থেকে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। খুলনা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায়ও একই ধরনের বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সে সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে ভারি বর্ষণ হতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি