সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই এগোচ্ছে ১৭ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

আদিল সরকার

জাতীয়

রাজধানীর উত্তরায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ৭ হাজার ৫৪৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণের লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন

2026-06-29T01:40:19+00:00
2026-06-29T01:46:40+00:00
 
  সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬,
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
জাতীয়
সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই এগোচ্ছে ১৭ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প
আদিল সরকার
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ১:৪০ এএম  আপডেট: ২৯.০৬.২০২৬ ১:৪৬ এএম
রাজউক উত্তরা এপার্টমেন্ট প্রকল্প। সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর উত্তরায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ৭ হাজার ৫৪৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণের লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এ খাতে ব্যয় হবে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। তবে প্রকল্পটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) কার্যপত্রেই অতিরিক্ত ব্যয়, অযৌক্তিক প্রস্তাব এবং পরিকল্পনাগত দুর্বলতার চিত্রসহ নানা অসংগতি উঠে এসেছে। ফলে প্রকল্পটির ব্যয়, প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত পরিকল্পনা অনুবিভাগের কার্যপত্র অনুযায়ী, ‘রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প (ব্লক-বি ও সি)’ বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৮২৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। পুরো অর্থই রাজউকের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করার প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের কথা।

তবে এত বড় প্রকল্পের জন্য নতুন করে কোনো ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়নি বলে প্রকল্পটির পিইসি কার্যপত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে পাওয়া যায়। অর্থ বিভাগের ১৮ জুলাই ২০২৪ সালের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে কার্যপত্রে বলা হয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন নির্দেশিকা ২০২২ অনুযায়ী নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাধ্যতামূলক। 

কিন্তু ডিপিপি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আলোচ্য প্রকল্পের জন্য নতুন কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়নি। শুধু আগের ‘উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনসাধারণের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ’ প্রকল্পের সমীক্ষার ধারাবাহিকতায় এটি প্রস্তাব করা হয়েছে। কার্যপত্রে সুপারিশ করা হয়েছে, এই বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে তৃতীয় পক্ষ দিয়ে নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা সমীচীন।

এ ছাড়া নির্মাণ ব্যয় ‘অধিক’ বলেও মন্তব্য করেছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয় ধরা হয়েছে আবাসিক ভবন নির্মাণে। কার্যপত্র অনুযায়ী, ৯ লাখ ২৭ হাজার ৪১৮ দশমিক শূন্য ৮ বর্গমিটার আবাসিক ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ২৭৯ কোটি ৫০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ৮৯ হাজার ২৭৫ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণ, এই ব্যয় ‘অধিক’ বলে প্রতীয়মান হয়। তাই গণপূর্ত অধিদফতরের ২০২২ সালের (সংশোধিত) রেট শিডিউল অনুযায়ী ব্যয় পুনর্নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

একইভাবে ১ লাখ ৮৬ হাজার ১২৭ দশমিক ৭০ বর্গমিটার অভ্যন্তরীণ রাস্তা নির্মাণে ৯৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকার ব্যয় ধরা হয়েছে। এতে প্রতি বর্গমিটারে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ৩১৮ টাকা, যা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। পরে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের রেট শিডিউল অনুযায়ী ব্যয় নির্ধারণ করা উচিত বলে জানানো হয়েছে কার্যপত্রে। এ ছাড়া কার্যপত্রে প্রকল্পের বহু খাতে ব্যয় অযৌক্তিক উল্লেখ করে তা কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রকল্পটিতে বিদেশ সফরের জন্যও রাখা হয়েছে বরাদ্দ। অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে বৈদেশিক সফর বন্ধ থাকলেও প্রকল্পে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ও সমজাতীয় প্রকল্প পরিদর্শনের জন্য ছয় কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। পিইসি কার্যপত্রে এই বরাদ্দ সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। 

এদিকে প্রকল্প পরিচালকসহ বিভিন্ন পদে ৩৪৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অতিরিক্ত দায়িত্বে বা সরাসরি নিয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের মত, এত বিপুল জনবলের প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং অর্থ বিভাগের জনবল কমিটির সুপারিশ ছাড়া এ ধরনের জনবল অনুমোদন দেওয়া সমীচীন নয়।

এ ছাড়া আগের প্রকল্পের অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, একই এলাকায় আগে বাস্তবায়িত ‘উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনসাধারণের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় ‘এ’ ব্লকে ৬ হাজার ৬৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ‘বি’ ও ‘সি’ ব্লক মালয়েশিয়ার সহায়তায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ শর্ত পূরণ না হওয়ায় বাতিল হয়। পরিকল্পনা কমিশন আগের প্রকল্পের আউটপুট ও ফলাফল মূল্যায়নের পরই নতুন প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়ে আলোচনা করার সুপারিশ করেছে।


সব মিলিয়ে পিইসি কার্যপত্রে ধারাবাহিকভাবে ব্যয় কমানো, নতুন ফিজিবিলিটি স্টাডি করা, বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় অঙ্গ বাদ দেওয়া, জনবল পুনর্বিবেচনা এবং নির্মাণ ব্যয় পুনর্নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ পরিকল্পনা কমিশনের প্রাথমিক মূল্যায়নেই প্রকল্পটির একাধিক আর্থিক ও কারিগরি দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে। ফলে ১৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে কতটা সংশোধিত হয়, অযৌক্তিক ব্যয় কতটা কমে এবং পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ কতটা বাস্তবায়িত হয় সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের। 

তবে নানা শঙ্কার মাঝে প্রকল্পটির মাধ্যমে নতুন আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসনের সুযোগ বাড়াকে ইতিবাচক দেখছেন অনেকে। 

প্রকল্পটির বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটিতে ফিজিবিলিটি স্টাডি না করা ও বিভিন্ন খাতের বাড়তি ব্যয়সহ নানা বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সেগুলো সংশোধন করে ডিপিপিতে যুক্ত করতে বলা হয়েছে। পরবর্তীতে সেগুলো বিবেচনা করে একনেক অনুমোদন দেবে কি না সেটা সংশ্লিষ্টদের বিষয়। 

এদিকে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রকল্পটি সংশোধন করা হবে কি না সেই বিষয়ে জানতে রাজউকের পরিকল্পনা উইংয়ের নগর পরিকল্পনাবিদ (পরিকল্পনা প্রণয়ন শাখা) মাহফুজা আক্তারকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কোনো রেসপন্স করেননি। এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদেরও কল করা হলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 



  বিষয়:   যাচাই ছাড়া  ১৭ হাজার কোটি  প্রকল্প  রাজউক 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: