গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এরপর থেকে সংসদে ও সংসদের বাইরে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে বাজেট নিয়ে। বিরোধী দল যেমন সমালোচনা করে বাজেটে বেশ কিছু পরিবর্তনের দাবি তোলে, তেমনি অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকেও বাজেটে জনগুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে পরিবর্তনের প্রস্তাব পেশ করা হয়।
সব পক্ষের প্রস্তাব ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত বাজেটের কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এনে বাজেট চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বড় বাজেটে খুব যে বেশি পরিবর্তন আসছে তা নয়, পরিবর্তনগুলো ছোট ছোট। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে জাতীয় সংসদে বাজেট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শেষ হয়েছে গতকাল। আজ অর্থমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাজেটের ওপর বক্তব্য দেবেন। এরপর জাতীয় সংসদে পাস হবে অর্থবিল। আর আগামীকাল চূড়ান্ত বাজেট পাস হবে। এ ছাড়া আগামী ১ জুলাই থেকে যাত্রা শুরু হবে ২০২৬-২৭ নতুন অর্থবছরের।
নতুন বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজেটে ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট ছিল এটি।
এ বাজেটের সামগ্রিক দর্শনেই বলা আছে- খরচ কমানো। মূলত সেই বিবেচনারই প্রতিফলন ঘটানো হচ্ছে। অবকাঠামোর বদলে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-মানবসম্পদে জোর দেওয়া হয়েছে কিন্তু বড় কর-কাঠামো বা ব্যয়-নীতিতে তেমন একটা রদবদল হয়নি।
তারপরও মোটা দাগে প্রস্তাবিত বাজেট থেকে চূড়ান্ত বাজেটে যেসব প্রস্তাব বাদ-শিথিল বা পরিবর্তন আসছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হচ্ছে- প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়েছিল নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক।
চূড়ান্ত বাজেটে এই বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বাজেট পেশের পর বিগত কয়েক দিন এ বিষয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হওয়ায় সরকার আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। চূড়ান্ত বাজেটে বাড়তি ন্যূনতম কর ফেরতের জন্য নতুন সময়সীমা দেওয়া হচ্ছে। আগে এটা আটকে থাকত, এখন ১২০ দিনের মধ্যে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিত্যপণ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীতে শুল্ক-কর আরও কমানোর সম্ভাবনা আছে। আমদানি শুল্ক কমছে ৬৯ পণ্যে এবং ১১৩ পণ্যে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
করমুক্ত আয়সীমাও বাড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যবিত্তের চাপ কমাতে আয়কর স্লাবের সীমা বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হতে পারে। এ ছাড়া ভূমি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে জমির মালিকদের ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স কমে ৫ শতাংশ হতে পারে।
প্রতিবন্ধী ভাতা ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০০ টাকা হতে পারে এবং মেট্রোতে প্রবীণ ও ছাত্রদের জন্য ২৫ শতাংশ ভাড়া ছাড়ের বিধান থাকবে। এভাবে ২০২৬-২৭ বাজেট পাসের আগে অর্থমন্ত্রী সংসদে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বড় কাঠামোগত বদল না হলেও জনসমালোচনার মুখে কয়েকটা বিষয় শিথিল হচ্ছে। এ ছাড়া ১ কোটি কৃষককে কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি ও সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের ওপর ‘স্পেসিফিক ভ্যাট’ থেকে পিছুটান
জানা গেছে, খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের ওপর ‘স্পেসিফিক ভ্যাট’ নামে প্যাকেজ আকারে যে নতুন ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা ছিল, তা থেকে সরে আসতে পারে সরকার। মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে প্রস্তুতির ঘাটতি ও ব্যবসায়ীদের হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলেন, মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় রিটেইল পর্যায়ে নতুন করে যে স্পেসিফিক ভ্যাট আরোপের কথা ছিল, তা এ বছর বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা কম। ভ্যাটের আওতা বিস্তৃত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য যে প্রস্তুতি দরকার, তা এখনও সম্পন্ন হয়নি। ফলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা, হয়রানি ও ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তা আপাতত বাস্তবায়ন না-ও হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে আরও স্টাডি করে তারপর বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
মূলত ৫০ লাখ টাকার নিচে বার্ষিক বিক্রি বা টার্নওভার রয়েছে- এমন ব্যবসায়ীদের এলাকাভেদে বিভিন্ন ভাগে এই স্পেসিফিক ট্যাক্স আরোপের পরিকল্পনা ছিল এনবিআরের। তাদের খুব সহজে ভ্যাট নিবন্ধন দেওয়া এবং ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাব থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা কর্তন করার পরিকল্পনা করেছিল এনবিআর।
এ লক্ষ্যে একটি নতুন বিধিমালা জারি করারও কথা ছিল। এই ভ্যাট হওয়ার কথা ছিলো প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
গত ২৪ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনা চলাকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মুদি দোকান, প্রসাধনসামগ্রীর দোকানসহ ১৬টি খুচরা ও সেবামূলক খাতকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ‘স্পেসিফিক ট্যাক্স’-এর আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই স্পেসিফিক ট্যাক্স এক ধরনের প্যাকেজ ভ্যাট, যা আগে চালু থাকলেও পরে বাতিল করা হয়েছিল।
সরকারের এই পরিকল্পনা বাতিলের দাবি জানিয়ে গত শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। সংগঠনের নেতারা বলেন, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে মাঠপর্যায়ে ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ভ্যাট কর্মকর্তাদের দ্বারা ব্যাপক হয়রানির শিকার হবেন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) ব্যবসা খাতে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দেবে। মূলত বিভিন্ন মহলের দাবির প্রেক্ষিতে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছে সরকার।
যেসব পণ্যের শুল্ক-কর বাড়ানোর প্রস্তাব ছিল তাতেও তেমন পরিবর্তন নেই
এদিকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত যে বাজেট পেশ করেছেন তাতে বেশ কিছু পণ্য ও সেবার ওপর শুল্ক-কর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিলেন। যেমন-আমদানিকৃত পাঙাশ ফিলেট, সিগারেট, নিকোটিন পাউচ, হিটেড টোব্যাকো, ২০০-১৬০০ সিসি পেট্রোল/ডিজেলচালিত গাড়ি, আমদানিকৃত ওয়াশিং মেশিন, জিপসাম বোর্ড ও শিট, পিভিসি রেজিনভিত্তিক পণ্য, পিইটি রেজিনভিত্তিক পণ্য, কোল্ড-রোল্ড কয়েল ও শিট, কপারের তার ও কপার টিউব ও পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার ইত্যাদি। চূড়ান্ত বাজেটে এসব ক্ষেত্রেও তেমন কোনো পরিবর্তন আসছে না।
যা বলছেন অর্থনীতিবিদরা
এদিকে প্রস্তাবিত বাজেট ও চূড়ান্ত বাজেটে খুব বেশি পরিবর্তন আনার সুযোগ নেই উল্লেখ করে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, সরকার চাইলেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট থেকে চূড়ান্ত বাজেটে বেশি পরিবর্তন আনতে পারবে না। এর কারণ হচ্ছে- এই বাজেটে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
এই বিশাল রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বাজেটে বেশি কাটছাঁট করার সুযোগ নেই অর্থমন্ত্রীর। তারপরও দেশের সাধারণ মানুষের সুবিধা-অসুবিধার কথা বিবেচনা করে এবং সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুরোধের প্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী বাজেট চূড়ান্ত করার আগে কিছু কিছু জায়গায় পরিবর্তান আনেন। এবারও হয়তো সেরকম কিছু পরিবর্তন আমরা দেখতে পাব।
আরেক অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন এ ব্যাপারে সময়ের আলোকে বলেন, আমরা যতটা জানতে পারছি বাজেট পাসের আগে অর্থমন্ত্রী মূলত দুই-তিনটি জায়গাতে পরিবর্তন আনবেন। এর মধ্যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিন বাধ্যতামূলক করার নিয়ম থেকে হয়তো সরে আসবে সরকার। এতে সাধারণ মানুষ খুশি হবে।
কারণ এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে অনেককেই বিড়ম্বনায় পড়তে হবে, বিশেষ করে অল্প শিক্ষিত বা একেবারে সাধারণ মানুষ যাদের টিন নম্বর নেই, বা টিন নম্বর খোলার দরকার পড়ে না যাদের। এ ছাড়া করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ালেও সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সহায়ক হবে। তবে আমার প্রত্যাশা থাকবে সরকার ছোট পরিসরে কালো টাকা সাদা করার জন্য যে বিধান রেখেছে, সেটি যেন পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেয়।
সময়ের আলো/জেডি