ভোটের প্রচারে গিয়ে খাল খননের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারেক রহমান। ঘোষণা দিয়েছিলেন, নির্বাচিত হলে বাবা জিয়াউর রহমানের পরম্পরা রক্ষা করে খাল খনন কর্মসূচির ফের চালু করতে চান। ভোটে জিতে সেই খাল খননের গোড়াপত্তন করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উত্তরের জেলা দিনাজপুর থেকে আজ খাল কাটা শুরু করবেন।
আগামী পাঁচ বছর দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। সরকারের এমন উদ্যোগকে পরিবেশবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইতিবাচক চোখে দেখছেন। তারা প্রাধিকার ও নদীর সংযোগ ঠিক করে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন। শুধু দলীয় পরিচয়ে কেউ যাতে খাল দখল করতে না পারে সেই বিষয়ে সরকারকে জোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। পাশপাশি জীবনের সঙ্গে জীবিকার সংযোগের পথ খোঁজারও পরামর্শ তাদের।
ক্ষমতায় বসার এক মাসের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, ইমাম-পুরোহিতদের সম্মানির পর আরেক প্রতিশ্রুতি খাল খননের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। আজ সোমবার এই কর্মসূচির উদ্বোধন করতে দিনাজপুর যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জেলার কাহারোল উপজেলার বলরামপুর সাহাপাড়া নামকস্থানে ১২ কিলোমিটার খাল পুনর্খনন কাজের মাধ্যমে একযোগে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানা গেছে, সোমবার সকাল সোয়া ১০টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। এরপর দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার বলরামপুরে। সেখানে বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ‘সাহাপাড়া খাল’ খননের মাধ্যমে ‘খাল খনন কর্মসূচি ২০২৬’ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুপুর সাড়ে ১২টায় সেখানেই আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী। বেলা সাড়ে ৩টায় দিনাজপুর পৌরসভার উপশহরে শেখ ফরিদ মডেল কবরস্থানে প্রধানমন্ত্রী তার নানা-নানি ও খালার কবর জিয়ারত করবেন। বিকাল ৫টায় দিনাজপুর সার্কিট হাউস চত্বরে আয়োজিত সুধী সমাবেশ ও ইফতার মাহফিলে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনর্খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানায়। প্রথম পর্যায়ে ৫৪টি জেলায় এ কর্মসূচি শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট জেলায় মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ ও সংসদ সদস্যরা এ কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার মৃতপ্রায় ও ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলো পুনর্খনন করা হবে, যাতে সেচব্যবস্থা উন্নত হয় এবং বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কমানো যায়। এ ছাড়া মাছ চাষ, হাঁস পালনসহ খালনির্ভর অর্থনীতি শক্তিশালী করা যায়। খাল পুনরুদ্ধার হলে কৃষিজমিতে সেচ সুবিধায় উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, বন্যা ও জলাবদ্ধতা কমবে এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সময়ের আলোকে বলেন, পরিকল্পনামাফিক এই কর্মসূচি করতে পারলে অবশ্যই তা ইতিবাচক। নদীর সঙ্গে সংযোগ ও প্রাধিকার ঠিক করে কাজ করতে হবে। এই কর্মযজ্ঞে স্থানীয় নদীকর্মী ও পরিবেশবিদকে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমি মনে করি বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল, বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে পারে এমন এলাকা, বরেন্দ্র এলাকা এবং জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় খনন কর্মসূচি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুরু হতে পারে।
এই পরিবেশবিদ বলেন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক না রাখলে পরিণতি কত ভয়ংকর হতে পারে, তা যশোরের ভবদহে দেখে অনুমান করা যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিক্ষেত্র বিল ডাকাতিয়া। এসব জায়গায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খনন কাজ চলতে পারে। অর্থাৎ পরিবেশগত নিরূপণ ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে খাল খনন করতে পারলে সুফল পাওয়া সম্ভব।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান সময়ের আলোকে বলেন, খাল খননের পাশপাশি জীবন জীবিকার সংযোগ, খাল দখলকারীদের শাস্তি ও দূষণরোধ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু দলীয় পরিচয়ে কেউ যাতে খাল দখল করতে না পারে সেই বিষয়ে সরকারকে জোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
কেন খাল পুনরুদ্ধার : বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় নদী ও খালের একটি প্রাকৃতিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। নদী থেকে খাল, খাল থেকে বিল বা নিম্নাঞ্চল এই ধারাবাহিক প্রবাহের মাধ্যমে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পানি চলাচল করে এসেছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক দশকে দেশের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ জলাভূমি ও খাল বিলীন হয়ে গেছে। রাজধানী ঢাকায় একসময় প্রবহমান ৫৪টি খালের অনেকগুলোই এখন দখল ও ভরাটের শিকার।
প্রায় ১২০ কিলোমিটার খাল রাস্তা বা ভবনের নিচে চাপা পড়ে গেছে। চট্টগ্রামেও একই চিত্র। একসময় সেখানে ১০৪টি খাল থাকলেও বর্তমানে মাত্র কয়েক ডজন খালের অস্তিত্ব টিকে আছে। এই বাস্তবতা কেবল পরিবেশগত বিপর্যয়ই সৃষ্টি করেনি; বরং সামান্য বৃষ্টিতেই শহরগুলোকে ডুবিয়ে দিচ্ছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে খাল পুনরুদ্ধার করা গেলে তা বাংলাদেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করতে খাল খনন কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান সরকার। স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেই পথ ধরেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছেন তার ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এটি শুধু উন্নয়ন নয়, প্রতিশ্রুতি পালনের প্রতীকও : অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিকাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকার হিসেবে খাল খনন কর্মসূচি সরকারের মেয়াদের একদম শুরুতেই বাস্তবায়ন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। এটি শুধু উন্নয়ন নয়, প্রতিশ্রুতি পালনের প্রতীকও। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করছে বাস্তব প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলার ওপর।
এই ক্ষেত্রে দুটি মূল চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা যায় : অধিকাংশ খাল স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালীদের দখলে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের ব্যারাজ নির্মাণ। খাল খনন করে শুধু পলি তুললেই হবে না, যদি নাব্যতা ও পানি প্রবাহের উৎস নিশ্চিত না করা যায়, তবে বছরের বেশিরভাগ সময় এসব খাল শুকনাই থাকবে।
তিনি বলেন, তবুও, এটি একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হতে পারে। সফল হলে এর মাধ্যমে বাড়তি পানি সংরক্ষণ ও ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ হবে, শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা বাড়বে। এর ফলে কৃষি, মৎস্য চাষ এবং কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। পাশাপাশি পানি ধরে রাখতে পারলে পরিবেশের ভারসাম্যও ভালো থাকবে। আশা করা যায়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আন্তরিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই কর্মসূচি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করবে।
সময়ের আলো/কেএইচও