হতাশার সুরেই পর্দা নামল অমর একুশে গ্রন্থমেলার

ফাইয়াজ উদ্দিন স্মরণ

জাতীয়

নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে শেষ হলো এবারের সংক্ষিপ্ত অমর একুশে গ্রন্থমেলা। মাত্র ১৮ দিনের এই আয়োজনের পর্দা নামে গতকাল রাত

2026-03-16T05:54:20+00:00
2026-03-16T05:54:20+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
হতাশার সুরেই পর্দা নামল অমর একুশে গ্রন্থমেলার
ফাইয়াজ উদ্দিন স্মরণ
প্রকাশ: সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬, ৫:৫৪ এএম 
অমর একুশে গ্রন্থমেলার শেষ দিনে পছন্দের বই দেখছেন তরুণীরা। ছবি : সময়ের আলো
নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে শেষ হলো এবারের সংক্ষিপ্ত অমর একুশে গ্রন্থমেলা। মাত্র ১৮ দিনের এই আয়োজনের পর্দা নামে গতকাল রাত ৯টায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মেলাজুড়ে প্রত্যাশিত পাঠক সমাগম ছিল না। শেষ সময়ে কিছুটা ভিড় দেখা গেলেও আশানুরূপ বিক্রি না হওয়ায় হতাশা নিয়েই শেষ হয়েছে এবারের বইমেলা।

শনিবার মেলায় শেষ দিনে কথা হয় বেশ কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে। সময়ের আলোকে তারা জানান, মেলার সময়সূচি নিয়ে শুরু থেকেই তাদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছিল। 

অধিকাংশ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানেরই দাবি, এবারের মেলায় তাদের বিনিয়োগের অর্ধেকটুকুও উঠে আসেনি। তাদের মতে, রমজানের রোজা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, ঈদের আগাম আবহ, সীমিত সময়ের আয়োজন-সব মিলিয়ে গত বছরের তুলনায় এবারের বই বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলা প্রচলিত সময়সূচি অনুযায়ী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়নি। ফলে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের সেই মাসব্যাপী আয়োজন সংকুচিত হয়ে মাত্র ১৮ দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। 
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়ের এই সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতাও মেলায় প্রত্যাশিত পাঠক সমাগম ও বই বিক্রির গতিকে প্রভাবিত করেছে।

হতাশার সুরে জয়ন্তী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মো. সাব্বির সময়ের আলোকে বলেন, এই বছর আমাদের স্টল ডেকোরেশনের জন্য যে টাকা খরচ হয়েছে সেই টাকাই উঠবে না। বাংলা একাডেমি মূলত তার দিকটি বিবেচনা করে রোজায় মেলার আয়োজন করেছে। দুই ইউনিটের একটি স্টল ডেকোরেশন করতে গেলে প্রায় এক লাখ টাকা লেগে যায়।

তা ছাড়া কমপক্ষে দুজন বিক্রয়কর্মী প্রয়োজন হয়। তাদের অন্তত ২০ হাজার টাকা দিতে হয়। কিন্তু এবারের বইমেলায় তো পাঠকই নেই। আমরা চেয়েছিলাম ঈদের পর মেলাটা হোক। কিন্তু এখন হওয়ায় রোজা ইদ ইত্যাদি নানা কারণে মেলা গেছে দর্শক-পাঠক শূন্য।

চিলেকোঠা প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী তাজিন আহমেদ তামান্না সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের এমনও দিন গিয়েছে কোনো ধরনের বিক্রি হয়নি। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর বইমেলায় তিন ভাগের এক ভাগও বিক্রি হয়নি। রোজায় বইমেলা করা একদমই ঠিক হয়নি। 

তিনি আরও বলেন, আগামী বছর স্টল বরাদ্দ পেতে যেন অসুবিধা না হয় এ জন্যই অনেক স্টলের লস হবে জেনেও মেলায় অংশগ্রহণ করেছে। তা ছাড়া এই মেলার মাধ্যমে প্রচারণারও একটা ব্যাপার আছে। তবে এই বছর বইমেলার প্রায় সব প্রকাশনাকেই ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।

বায়ান্ন প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী আসিফ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, এবারের মেলায় বিক্রি গত বছরের ছয় ভাগের এক ভাগও না। স্টলের বিক্রয়কর্মীদের বেতনও প্রকাশনীর নিজ পকেট থেকে দিতে হবে। ছুটির দিনে কিছুটা মানুষের উপস্থিতি থাকলেও প্রকৃত পাঠক-ক্রেতার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। অধিকাংশই ছিলেন দর্শনার্থী, পাঠক-ক্রেতা কোথায়? 
মেলার শেষ দিনে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে এসেছেন রোকসানা আক্তার । 

সময়ের আলোকে তিনি বলেন, আজ (গতকাল) মেলার শেষ দিনে মেয়েটা বায়না ধরেছে মেলায় ঘুরতে আসবে। এর আগেও আরো দুদিন এসেছি। এ বছরের মেলায় তেমন পাঠক ছিল না। এক দিক দিয়ে মেলার পরিবেশটা ভালোই ছিল- কেননা পছন্দ মতো ঘুরে ঘুরে বই কিনতে পেরেছি, যা অন্যান্য বছর সম্ভব হয় না‌। তবে আশাকরি আগামী বছর মেলাটা আরও বড় পরিসরে জমজমাট হবে‌‌। 

অন্যদিকে গত শনিবার বিকাল তিনটায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এ সময় সদস্য সচিব ড. মো. সেলিম রেজা এবারের বইমেলার সার্বিক কার্যক্রম ও আয়োজনের ওপর একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। 

অনুষ্ঠানের শেষপর্বে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, লেখক ও সংশ্লিষ্টদের মাঝে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। গতকাল তথ্যকেন্দ্রে মেলার নতুন বই জমা পড়েছে ২৩৬টি। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় সর্বমোট নতুন বই এসেছে (২৬ ফেব্রুয়ারি-১৫ মার্চ) ২০০৭টি।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, সবার আন্তরিক সহযোগিতায় অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৬ সফল করা সম্ভব হয়েছে। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের সামষ্টিক উদযাপনে আগামীর বইমেলা নতুনরূপে প্রত্যাশা জাগাবে আমরা এই আশা ব্যক্ত করতে পারি। 

ড. মো. সেলিম রেজা বলেন, বইমেলায় বাংলা একাডেমিসহ সব প্রতিষ্ঠানের বই ২৫ শতাংশ কমিশনে বিক্রি হয়েছে। বাংলা একাডেমি ১৪ মার্চ পর্যন্ত ১৭ দিনে ১৭,০৪,৬২৯ (সতেরো লাখ চার হাজার ছয়শত উনত্রিশ) টাকার বই বিক্রি করেছে। বইমেলায় অংশগ্রহণকারী সর্বমোট ৫৮৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪টি মিডিয়া ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ৫৭০টি। 

২৬৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ১৭ দিনে তাদের মোট বিক্রির পরিমাণ ৮ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে গড় হিসাবে ৫৭০টি প্রতিষ্ঠানের বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ কোটি টাকা।

মো. মফিদুর রহমান বলেন, এবারের বইমেলা ছিল পূর্বের মেলাগুলোর তুলনায় অধিক পরিচ্ছন্ন। মেলায় প্রকৃত পাঠকদের উপস্থিতি ছিল বেশি। ভবিষ্যতে শিশুদের জন্য ভালো মানের বই এবং আনন্দদায়ক আয়োজনের ব্যবস্থা বৃদ্ধি করার কথা আমাদের ভাবতে হবে।

নিতাই রায় চৌধুরী এমপি বলেন, আমরা এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ চাই যেখানে বৈচিত্রের মাঝেও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে। একটি উন্নত জাতি গঠনের জন্য বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য আমাদের সন্তানদের আবার বইয়ের জগতে নিয়ে যেতে হবে। সারা দেশে জেলা ও উপজেলায় পাঠাগার ও জ্ঞান প্রসারের জন্য আমাদের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। 

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, যে বই পাঠককে মনের ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলে, ন্যায়-অন্যায় বোধ জাগ্রত করে এবং রাষ্ট্র গঠনে ও উন্নত চিন্তাচেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে সেটিই মানসম্পন্ন বই। একটি জাতির কল্যাণ ও ভবিষ্যৎ পাঠাভ্যাস দ্বারা নির্ণিত হয়। কাজেই পাঠকদের হাতে ভালো ও মানসম্পন্ন বই তুলে দেওয়ার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। 

গুণিজন স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৬ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি পরিচালিত চিত্তরঞ্জন সাহা, মুনীর চৌধুরী, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, সরদার জয়েনউদ্দীন এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হয়। 

চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার : ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিক সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কথাপ্রকাশকে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ প্রদান করা হয়। 

মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার : ২০২৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য (প্রকাশয়তি : কালিকলম আর কাগজের অড রিসার্চ : ফাউন্টেন পেন আমিন বাবু), প্রথমা প্রকাশন (শিলালিপি : বাংলার আরবিফারসি প্রত্নলেখমালা মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক) এবং দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডকে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ প্রদান করা হয়।

রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার : ২০২৫ সালে গুণমান বিচারে সর্বাধিক-সংখ্যক শিশুতোষ গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেডকে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ প্রদান করা হয়।

সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৬ উপলক্ষে ২০২৪ বা ২০২৫ সালে মেলায় যেসব প্রতিষ্ঠান প্রথম অংশগ্রহণ করেছে তাদের মধ্য থেকে গুণগতমান বিচারে সর্বাধিক-সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সহজ প্রকাশকে সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ প্রদান করা হয়। 

শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৬ উপলক্ষে নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১. ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশন্স (স্টল নম্বর ৫০৩৫০৪), ২. মাত্রা প্রকাশ (স্টল নম্বর ৮৭৩৮৭৪) ও ৩. বেঙ্গল বুকসকে (স্টল নম্বর ৬১৭৬২১) শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ প্রদান করা হয়।

সময়ের আলো/কেএইচও  


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: