প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানির সংকট মোকাবিলা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে সারা দেশে ব্যাপক খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকদের সেচ সুবিধা বাড়ানো এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষের উপকার করা এবং তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানোই বিএনপির রাজনীতির মূল লক্ষ্য। কৃষক ভালো থাকলে দেশের মানুষও ভালো থাকবে এই বিশ্বাস থেকেই কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জনগণের সমর্থন থাকলে যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা সফল করা সম্ভব এবং প্রত্যাশিত দেশ গড়তে সরকার রাত-দিন কাজ করবে।
সোমবার (১৬ মার্চ) দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়নের সাহাপাড়ায় একটি খাল পুনর্খননের উদ্বোধনকালে তিনি বলেন, জনগণের সমর্থন থাকলে যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা সফল করা সম্ভব এবং প্রত্যাশিত দেশ গড়তে সরকার রাত-দিন কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রী সোমবার দুপুরে দিনাজপুরে কাহারোল উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়নের সাহাপাড়ায় খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন শেষে এক সমাবেশে এসব কথা বলেন।
সাহাপাড়া খালটি পুনর্খননের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে ৫৪টি জেলায় খাল খনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উপলক্ষে এ সমাবেশ হয়।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে বিমানে করে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে গাড়িবহর নিয়ে কাহারোলের সাহাপাড়া খাল এলাকায় উপস্থিত হন। তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে নির্বাচনের সময় ব্যবহৃত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা বাসে করে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে স্থানীয় নেতাকর্মীরা তাকে সংবর্ধনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সাধারণ মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এরপর নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে খাল খননকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাহাপাড়া খালটি খনন করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের রাজনীতি হচ্ছে কৃষকের উপকার করা, মা-বোনদের স্বাবলম্বী করে তোলা। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে এলাকার মানুষ, গ্রামের মানুষ কীভাবে ভালো চিকিৎসা পেতে পারে সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আমাদের সন্তানরা কীভাবে লেখাপড়া করে মানুষ হতে পারে এবং কীভাবে মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, সেটিই আমাদের রাজনীতি। কিন্তু এ কাজগুলো আমি একা পারব না। নির্বাচনে যেমন আপনারা ধানের শীষের সঙ্গে ছিলেন, এখনও আপনাদের সমর্থন ছাড়া দেশ উন্নয়নের কাজ করা সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের সমর্থন থাকলে যেকোনো পরিকল্পনাকে আমরা সফল করতে পারব। সে জন্য আসুন আজ এই খাল খনন কর্মসূচি আমরা উদ্বোধন করেছি, এই খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে আজকে দেশ গড়ার কর্মসূচির কাজ আমরা শুরু করলাম ইনশাআল্লাহ।
প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সাহাপাড়া খাল খনন প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ খালের সুবিধা পাবেন প্রায় ৩৩ হাজার কৃষক। প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। এ এলাকার সাড়ে ৩ লাখ মানুষ খালের পানি বিভিন্নভাবে ব্যবহার করতে পারবে।
তিনি বলেন, পুরো খাল খনন করা গেলে বর্তমানের চেয়ে প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিকটন বেশি ফসল উদ্বোধন হবে। খালের পাশে প্রায় ৭ হাজার গাছ রোপণ করা হবে এবং যাতায়াতের জন্য রাস্তা তৈরি করা হবে।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বলেছিলাম ক্ষমতায় গেলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করে দেব। নির্বাচনের পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই আমরা সেই ব্যবস্থা করেছি। এ ছাড়া ৪ কোটি পরিবারের মায়েদের কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিচ্ছি। ইতিমধ্যে ৩৭ হাজার মায়ের কাছে কার্ড পৌঁছেছে, পর্যায়ক্রমে দিনাজপুরসহ সারা দেশে এটি দেওয়া হবে। আগামী মাস থেকে প্রান্তিক চাষিদের জন্য কৃষক কার্ড দেওয়ার পাইলট প্রজেক্ট শুরু হবে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগে ৫০ ফুটে পানি পাওয়া যেত, এখন ৩০০ ফুট গভীরে যেতে হয়। আমাদের মাটির ওপরের পানির সদ্ব্যবহার করতে হবে। আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। এর ফলে বর্ষার অতিরিক্ত পানি আমরা ধরে রাখতে পারব এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচকাজে ব্যবহার করতে পারব।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে দেশের অর্থনীতির ওপর চাপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশে থাকা ভাইবোনদের নিয়ে আমরা টেনশনে আছি। এত কিছুর পরেও আমরা আপনাদের দেওয়া ওয়াদা বাস্তবায়ন করছি। যারা দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আপনাদের সজাগ থাকতে হবে। অনেকে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে বিভ্রান্ত করতে চায়, তাদের খেয়াল রাখতে হবে।
বক্তব্যের শেষে তিনি উপস্থিত নেতাকর্মী ও জনসাধারণের উদ্দেশে স্লোগান ধরেন করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।
তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, যখন শুনব এই ১২ কিলোমিটার খাল খনন কমপ্লিট হয়ে গেছে, আমি আবার আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে আসব।
তিনি বলেন, অনেকে আছে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে বিভ্রান্ত করতে চায়। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে বিভিন্ন রকম কথাবার্তা বলে কারা দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। পারবেন তো? আপনাদের খেয়াল রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি নির্বাচনের সময়ে একটা কথা বলেছি, বিদেশে অনেকের আত্মীয়স্বজন আছে, তাদের সঙ্গে আপনাদের নিশ্চয়ই কথা হয়। তারা বলে ওদের দেশটা সুন্দর। তো ভাই ওদের দেশটা যদি সুন্দর হয় সেটা জিন-ভূতে এসে দেশ বানায় দিয়ে গেছে। ওদের দেশের মানুষই তো দেশ সুন্দর করেছে। করেছে না?
ওদের দেশ তো জিন এসে দেশ সুন্দর করে নাই। ওই দেশের মানুষই তো ওদের দেশকে গড়ে তুলেছে। তাই তো? ওরা পারলে তা হলে আমরা কেন পারব না? আমরাও ইনশাআল্লাহ পারব।
জেলা বিএনপির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন দুলালের সভাপতিত্বে সমাবেশে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান মিয়া, সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, মঞ্জরুল ইসলাম, সাদেক রিয়াজ, কাহারোল উপজেলার সভাপতি গোলাম মোস্তফা, রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম বক্তব্য দেন।
দীর্ঘদিন পর নিজের স্মৃতিবিজড়িত শহর দিনাজপুরে এক সুধী সমাবেশে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বারবার দিনাজপুরকে তার ‘নানিবাড়ি’ হিসেবে সম্বোধন করেন।
ঘাসিপাড়া ও বালুবাড়ীতে কাটানো দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, কেন জানি দিনাজপুর বললেই আমার চোখে ‘নানি’ কথাটাই ভেসে আসে। এই শহরের অলিগলিতে আমার অনেক স্মৃতি। স্বাভাবিকভাবেই এই মাটির প্রতি আমার একটা আলাদা টান ও দায়িত্ব রয়েছে।
সোমবার গোর-ই শহিদ মাঠে ইফতার-পূর্ব বক্তব্যে তারেক রহমান দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।
তিনি জানান, নির্বাচনের পর সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই তারা নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী কাজ শুরু করেছেন।
বিশেষ করে দেশের পানির সংকট নিরসনে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং আর্সেনিক সমস্যা সমাধানে খাল ও নদী খনন করে প্রাকৃতিক পানির আধার তৈরি করা অপরিহার্য।
নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশের ২০ কোটি মানুষের অর্ধেকই নারী। তাদের পেছনে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি পরিবারের নারীপ্রধানের কাছে একটি করে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, এর মাধ্যমে তারা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও সম্মাননা পাবেন। ইতিমধ্যে এ প্রকল্পের পাইলটটিং দিনাজপুর-৬ আসনসহ দেশের ১৫টি স্থানে শুরু হয়েছে এবং প্রায় ৩৬ হাজার মানুষকে এর আওতায় আনা হয়েছে।
ধর্মীয় গুরুদের সামাজিক মর্যাদার বিষয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মসজিদ-মাদরাসার ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মের গুরুরা অনেক সময় অর্থকষ্টে থাকেন। তাদের জন্য সরকারি সম্মানীর যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
এ ছাড়া কৃষকদের কল্যাণে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্য যেমন লিচু, আম, আলু ও টমেটো সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং এ অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ঈদের পর শিল্পমালিকদের সঙ্গে বসে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন তিনি।
বক্তব্যের শেষে তিনি দেশবাসীর প্রতি ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গত ১৫-১৬ বছরে দেশে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হয়নি। দীর্ঘদিনের এ সমস্যাগুলো এক বা দুই মাসে সমাধান করা সম্ভব নয়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ সরকার সবার সরকার। যারা ভোট দিয়েছেন এবং যারা দেননি সবাই এই রাষ্ট্রের নাগরিক। আপনাদের সহযোগিতা থাকলে আমরা রাত-দিন পরিশ্রম করে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলব।
সবশেষে তিনি আবারও দিনাজপুরের প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে এবং ‘নানিবাড়ি’ থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুতই ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার বক্তব্য শেষ করেন।
ইফতারের আগে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে মোনাজাত করা হয়।
এদিকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন এবং বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ভিক্ষুকদের মাঝে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিতরণ করেছেন তারেক রহমান।
সোমবার বিকালে দিনাজপুর সার্কিট হাউস মাঠে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি সমাজসেবা অধিদফতরের বাস্তবায়নাধীন ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান কর্মসূচির’ আওতায় ভিক্ষুকদের মাঝে ২০টি ছাগল বিতরণ করেন।
এ সময় বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, জাতীয় সংসদের হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়াসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সময়ের আলো/আরবিএন